ভালো কোম্পানির অন্তর্ভুক্তি পুঁজিবাজারকে স্থিতিশীল করতে পারে

আসমাউল হক শান্ত: পুঁজিবাজারে সূচকের উত্থান-পতন ও শেয়ারের মূল্য হ্রাস-বৃদ্ধি নিত্য স্বাভাবিক ঘটনা। এটাকে পুঁজিবাজারের ধর্ম বললে ভুল হবে না। তবে সূচকের উত্থান-পতন ও শেয়ারের মূল্য হ্রাস-বৃদ্ধির ক্ষেত্রে যখন ব্যত্যয় ঘটে তখন পুঁজিবাজার তার স্বাভাবিক গতি হারিয়ে ফেলে। শুরু হয় সূচকের দীর্ঘ পতন, তৈরি হয় পুঁজিবাজারে অস্থিরতা। এর আগে যতবার বাজার অস্থিতিশীল হয়েছে, তা দুই বা এক দিনের কোনো ঘটনার ফল ছিল না। প্রতিবার অস্থিতিশীলতা তৈরি হওয়ার অন্তত দুই-তিন মাস আগে থেকে কিছু ইস্যু বাজারের সামনে আসা শুরু করে। অবশ্য এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

সাধারণত যেসব ইস্যু কাজে লাগিয়ে বাজার অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করা হয়, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো রাজনৈতিক অস্থিরতা, মুদ্রানীতি ঘোষণা, ইপিএস প্রকাশের আসন্ন সময় ও ডিভিডেন্ড ঘোষণা, দুর্বল মৌলভিত্তিক শেয়ারের অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধি, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সীমাবদ্ধতা প্রভৃতি।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনো সময়ই দেশ রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল ছিল না। ফলে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। যদি রাজনৈতিক ইস্যুগুলো প্রতিনিয়ত অর্থনীতির দিকে ঠেলে দিই তাহলে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া কোনোদিন সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। এর আগে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পুঁজিবাজার অনেকবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে গত কয়েক বছরে নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রত্যক্ষ ভূমিকায় পুঁজিবাজার অস্থিতিশীলতা থেকে রক্ষা পেয়েছিল। বিশেষ করে গত ২০১৪-১৫ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রত্যক্ষ ভূমিকার কারণে বাজার স্থিতিশীল ছিল, অবশ্য এজন্য সিকিউরিটিজ একচেঞ্জ অ্যান্ড কমিশন প্রশংসার দাবি রাখে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাজার পতন রোধে সংস্থাটির কোনো ভূমিকা দৃশ্যমান নয়। যেমন ভূমিকা ২০১৪-১৫-তে রেখেছিল, এবার সেই ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া সময়ের দাবি। পাশাপাশি সাধারণ বিনিয়োগকারীদেরও উচিতÑযে সময়টাতে পুঁজিবাজার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে, সে সময়টাকে ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবিলা করা।

সাধারণত জানুয়ারি ও জুন মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রানীতি ঘোষণা করে। মুদ্রানীতি পুঁজিবাজারের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণত পুঁজিবাজারবান্ধব মুদ্রানীতি ঘোষণার চেষ্টা করে। পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে এবারের মুদ্রানীতিও পুঁজিবাজারবান্ধব। যদিও স্বার্থন্বেষী মহল মুদ্রানীতি নিয়ে গুজব ছড়িয়ে পুঁজিবাজারকে অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারা করছে। বিশেষ করে ঋণ আমানতের অনুপাত (এডিআর) কমানো নিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীর মধ্যে গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে বেশিরভাগ পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ মত দিয়েছেন, এডিআরের সঙ্গে পুঁজিবাজারের তেমন প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই। এ অবস্থায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত সাধারণ বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে এডিআর সম্পর্কে সঠিক ও সুস্পষ্ট বক্তব্য তুলে ধরা। নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে মুদ্রানীতি ঘোষণার সময়টা মাসের শুরুতে বা মাঝামাঝি নিয়ে আসা যায় কি না, তা স্থির করা।

পুঁজিবাজারের কোম্পানিগুলো সাধারণত তিন মাস অন্তর আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে। কোম্পনিগুলো ভালো-মন্দ উভয় রকমের ইপিএস প্রকাশ করে, যা বাজারের জন্য ভালো। কারণ নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করায় বিনিয়োগকারীরা কোম্পানির অবস্থান সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পান। সমস্যা হলো, কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের সময় থাকে পুরো মাস। কিন্তু সিংহভাগ কোম্পানি আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে মাসের শেষ সম্পাহে। এতে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অন্যদিকে ডিভিডেন্ডও কোম্পানিগুলো একই সময়ে প্রায় একই সঙ্গে ঘোষণা করে, যা সাময়িক সময়ের জন্য হলেও বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ অবস্থায় কোম্পানির ইপিএসগুলো যাতে একই সপ্তাহের মধ্যে প্রকাশ না করে মাসজুড়ে আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে  সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পারে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

পুঁজিবাজার অস্থিতিশীল হওয়ার অন্যতম কারণ দুর্বল মৌলভিত্তির শেয়ারের অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধি। কয়েক মাস ধরে এ ধরনের শেয়ারের দর বেড়ে চলেছে। এখন পর্যন্ত থামেনি। সাম্প্রতিক বাজারে এমন বেশ কিছু কোম্পানি আছে যেগুলোর দৌরাত্ম্য, যেমনÑইপিএস ঋণাত্মক, উৎপাদন বন্ধ, নামেমাত্র নিট অ্যাসেট, লো পেইডআপ, ক্যাশ ফ্লো প্রায় না থাকা প্রভৃতি খুবই বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ধরনের কোম্পনিগুলোর বেশির ভাগই ‘জেড’ ক্যাটেগরির। তাছাড়া এ ধরনের কোম্পনিগুলো এতই দুর্বল, টানা কয়েক বছর কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি। ইদানীং এ ধরনের কোম্পানির দর তিন গুণ বা চার গুণ বা এর চেয়েও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কিছু স্বার্থান্বেষী মহলের ফাঁদে পা দিয়ে এ ধরনের শেয়ারে বিনিয়োগ করছে। ফলস্বরূপ তাদের বিনিয়োগ যেমন ঝুঁকিতে পড়ছে, তেমনি বাজারের স্বাভাবিক গতিও হারাতে চলেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসব কোম্পানির বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ  না নেওয়ায় কোম্পনিগুলো দিনের পর দিন বিনিয়োগকারীদের লোকসানের দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং বাজারের ভারসাম্যও নষ্ট হচ্ছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত এসব কোম্পানিকে হয় আলাদা মার্কেটে নিতে হবে (ওটিসির মতো) অথবা আইনের আওতায় এনে অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির লাগাম টানা। আরেকটা বিষয় পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার লক্ষ রাখা দরকারÑকোনো দুর্বল কোম্পানি প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে মূল বাজারে যেন প্রবেশ করতে না পারে। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গত দুই-এক বছর এমন কিছু কোম্পানি অনুমোদন পেয়েছে, যেগুলোর বেশিরভাগ এখন ‘জেড’ ক্যাটেগরিতে অবস্থান করছে। এ ধরনের কোম্পানিগুলো আইপিও ছাড়ার আগে ভালো মুনাফা দেখালেও বাজারে আসার এক বছরের মাথায় কীভাবে লোকসান প্রদর্শন করে থাকে, তা খতিয়ে দেখা দরকার। বাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষার্থে ও পুঁজিবাজার এগিয়ে নিতে ভালো ভালো সরকারি, বহুজাতিক ও দেশীয় কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে পুঁজিবাজারকে স্থিতিশীল রাখা অত্যাবশ্যক।

 

ফ্রিল্যান্স লেখক

[email protected]