এসএমই

ভাসমান ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবনযুদ্ধের কথা…

ভাসমান কিংবা অস্থায়ী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সম্পর্কে মানুষের আগ্রহ কম। কেউ জানতে চায় না তাদের সুখ-দুঃখের কথা। সমাজের আর দশটা মানুষের মতো তাদেরও আছে সুন্দর আগামীর স্বপ্ন, আছে জীবনের সুখ-দুঃখের অনেক গল্প। তাদের জীবনপাতার গল্পগুলো লেখা হয় জীবনসংগ্রামের কাহিনি দিয়ে। নীরবে-নিভৃতে তারা চালিয়ে যান জীবনসংগ্রাম। কিশোরগঞ্জ শহর ঘুরে এমন কয়েকজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী তথা হকারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল তাদের জীবনযুদ্ধের কথা।
শহরের গৌরাঙ্গ বাজার ব্রিজের পাশে বসে মসলা ও শরবত তৈরির উপকরণাদি বিক্রি করেন ৪৫ বছর বয়সী সোহেল তালুকদার। পাশাপাশি বিভিন্ন হাট-বাজারে ২৩ বছর ধরে তিনি এ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। সোহেলের বাড়ি শহরের বত্রিশ মণিপুর এলাকায়। তার দুই মেয়ে ও এক ছেলে। বড় মেয়ে পঞ্চম শ্রেণি, ছেলে তৃতীয় শ্রেণি ও ছোট মেয়ে প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। সোহেল বলেন, স্বপ্ন দেখি সন্তানরা পড়ালেখা করে চাকরি করবে, এজন্যই তো এ শ্রম। এখানে বসে মসলা ও শরবতের নানা উপকরণ বিক্রি করে দিনপ্রতি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা লাভ থাকে। এ দিয়েই কষ্ট করে চালিয়ে নিচ্ছি সংসার। বৃষ্টির দিনগুলোয় ব্যবসা চলে না। তাছাড়া মোবাইল কোর্টের কারণে অনেক সময় বিস্তর সমস্যায় পড়তে হয়।
১৭ বয়সী হিমেল রহমান। তিন বছর যাবৎ ভ্যানগাড়িতে করে টি-শার্ট ও শর্টস বিক্রি করছে গৌরাঙ্গ বাজার ব্রিজের পাশে। জানা যায়, তার বাড়ি শহরের তারাপাশা এলাকায়। বাবা গত হয়েছেন বছর চারেক হবে। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছে। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে। সংসারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি সে। হাসতে ভালোবাসে হিমেল। এবারের শীতে ব্যবসা নাকি খুব মন্দা গেছে তার। তবুও হাসিমাখা মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই যে, তার এই ছোট্ট কাঁধে করে পরিবারের দায়িত্ব বয়ে বেড়াতে হচ্ছে।
হিমেলের সঙ্গে কথা বলার সময় এগিয়ে এলেন আরেক ব্যবসায়ী ৪৫ বছর বয়সী ওমর ফারুক। সম্পর্কে হিমেলের চাচা। ফারুকও গেঞ্জি ও শীতবস্ত্র বিক্রেতা। তিনি বলেন, ‘১০ বছর বয়স থেকেই পরিবারের দায়িত্ব আমার কাঁধে। ওই বয়সে নেমে পড়ি জীবনসংগ্রামে। আমাদের পরিবারে ৯ জন সদস্য। তিনজন পড়াশোনা করছে। কর্মক্ষম ব্যক্তি একমাত্র আমি।’ লাভ কেমন হয় এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ৫ বছর ধরে ব্যবসা নেই বললেই চলে। কপাল ভালো হলে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা লাভ হয়।
একটু সামনে এগোতেই আরশাদ আলী নামের আরেক ব্যবসায়ীর সঙ্গে দেখা হলো। তিনিও ব্রিজের পাশে গেঞ্জি ও শীতবস্ত্র বিক্রি করেন। বয়স ৪২ হলেও চেহারায় বয়সের ছাপ আরও বেশি। সাংবাদিক পরিচয় জেনে নিজ থেকেই কথা বলতে এগিয়ে এলেন তিনি। বললেন, আমার চার মেয়ে। দুজনের বিয়ে দিয়েছি। এক মেয়ে মাদরাসায় পড়ছে। তার স্বপ্ন, দুই মেয়েকে পড়াশোনা করিয়ে ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দেওয়া। বাকিটা জীবন যেন দু’মুঠো ডাল-ভাত খেয়ে কাটাতে পারেন এটুকুই তার চাওয়া।
ব্রিজের পাশে ফুটপাতে বসে তালা ও ছাতা মেরামত করেন শাহিন হোসেন। বয়স ৩৫ হবে। বাবার কাছ থেকে কাজটি শিখেছেন তিনি। প্রতিদিন ২০০ থেকে ২৫০ টাকা আয় হয়। এ দিয়েই চলে তার সংসার। কথা বলে জানা গেল, ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে খুব একটা স্বপ্ন বা চিন্তা নেই তার। তৃতীয় শ্রেণি পড়ুয়া একমাত্র মেয়েকে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়াই তার লক্ষ্য।
পুরান থানা মোড়ে গিয়ে চোখে পড়ে হাতে ঠেলা ভ্যানে করে ডিম ও বড়া বিক্রি করছে এক তরুণ। বয়স আনুমানিক ২০ বছর। নাম জিজ্ঞেস করলে মৃদু স্বরে বলে ‘আলামিন’। কথা শুরু হয় তার সঙ্গে। তার বাড়ি নিকলী দামপাড়া। পরিবারে কর্মক্ষম সে-ই। আলামিন জানায়, আধাবেলা রিকশা চালাই। সন্ধ্যার পর ডিম ও বড়া বিক্রি করি। তিন বোন, দুই ভাই আর
বাবা-মা নিয়ে তার সংসার। দুই বোনের বিয়ে হয়েছে। এক বোন মাদরাসায় পড়ে। আরেক ভাই অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে। অভাবের সংসারে ভাইটির পড়ালেখা কতদূর এগিয়ে নেওয়া যাবে তা নিয়ে চিন্তিত আলামিন। সেই কবে স্বপ্ন দেখা ছেড়ে দিয়েছে আলামিন! পরিবার-পরিজন নিয়ে কোনোরকম খেয়েপরে বাঁচতে পারলেই চলে তার।
শুধু সোহেল, হিমেল, ওমর ফারুক, মো. আরশাদ আলী, শাহিন ও আলামিনই নয়। তাদের মতো অনেক ভাসমান কিংবা অস্থায়ী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমাজের বিভিন্ন স্থানে রয়েছেন। তারা ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে রাজপথ, ফুটপাত কিংবা গলিতে জীবন ও জীবিকার তাগিদে নেমে পড়েন। আমাদের প্রয়োজনীয় নানা পণ্য বিক্রি করেন। সমাজের প্রায় সব শ্রেণির মানুষ তুলনামূলক সস্তায় তাদের কাছে থেকে এসব পণ্য কেনে। এসব পণ্য বিক্রি করে আমাদের চাহিদা মেটাতে পারলেও নিজেদের জীবন-চাহিদা মেটাতে পারে কি তারা? পারলেও কতটা? এর সদুত্তর পাওয়া যাবে কী?

সাজন আহম্মেদ পাপন, কিশোরগঞ্জজাহেদুল ইসলাম সমাপ্ত, লালমনিরহাট

সর্বশেষ..