ভোক্তারা যাবে কোথায়?

ফরহাদ হোসেন: বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় হওয়ার পাশাপাশি বেড়েছে ভোক্তা সংখ্যা, বেড়েছে ভোক্তা ব্যয়। বলা হয়ে থাকে, ভোক্তা ব্যয়ের উপর ভর করেই মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ ছাড়িয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতায় প্রবৃদ্ধিকে এগিয়ে নিতে এই ভোক্তা ব্যয়ই ভরসা। যাদের উপর এত ভরসা তারা কেমন আছে? আদৌ কি তাদের কথা কেউ ভাবে? বিশ্বের উন্নত দেশগুলো ভোক্তাদের অধিকার রক্ষায় অত্যন্ত তৎপর। যুক্তরাষ্ট্রে বিশুদ্ধ পণ্য নিশ্চিত করতে ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন নামে আলাদা একটি দপ্তরই আছে। এই দপ্তরের অনুমোদন পাওয়া নাকি ভাগ্যের ব্যাপার। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, বাংলাদেশের একটি ওষুধ কোম্পানি এই দপ্তরের অনুমোদন পেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ওষুধ রপ্তানি করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠান, তাহলে নিশ্চয়ই আমাদের ভোক্তাদের জন্যও একই ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। পৃথিবীতে বোধ হয় সবচেয়ে অসহায় বাংলাদেশের ভোক্তারা। রমজান মাসে ভোক্তা অধিকারের কথা চিন্তা করে কিছু অভিযান চললেও সারা বছর এর কোনো খবর থাকে না। পণ্যে ভেজাল মেশানো, ওজনে কম দেওয়া ও বিক্রেতাদের অনৈতিক লাভ এখন ভোক্তাদের নিত্যসঙ্গী। বাজারে গিয়ে কষ্টের টাকায় শ্রেষ্ঠ বাজার নিশ্চিত করতে পারেন না তারা। এ নিয়ে প্রতিবাদ করতে গেলেও কোনো লাভ হয় না। উল্টো বিক্রেতারা একজোট হয়ে ক্রেতাদের নাজেহাল করে। সম্প্রতি এমন কিছু ঘটনার খবরও এসেছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে। এসব চিন্তা করেই অনেকটা অসহায় ভোক্তা অনিচ্ছা সত্ত্বেও কষ্টের টাকায় শ্রেষ্ঠ বাজার না নিয়েই আপন নীড়ে ফিরে যান।
ভোক্তাদের অধিকার রক্ষার্থে সরকার ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর গঠন করেছে। এখানে অভিযোগ করতে হলে পণ্যের নমুনা এবং পণ্য কেনার প্রমাণ হিসেবে বিক্রয় রসিদ জমা দিতে হয়। প্রতিদিন আমরা যেসব পণ্য বাজার থেকে কিনি, সেখানে সবগুলোর ক্ষেত্রে কি রসিদ নেওয়ার সুযোগ আছে? রাজধানীতে তাও কিছুটা সুযোগ থাকলেও দেশের অন্য অঞ্চলগুলোতে রসিদ নেওয়ার চর্চাই গড়ে ওঠেনি। আবার রাজধানীতে চাইলেও অনেক সময় বিক্রয় রসিদ পাওয়া যায় না। এই যেমন, অনেক ওষুধের দোকানে বললেও বিক্রয় রসিদ দেয় না। যদি জোর করেন, তাহলে বলবে রসিদ লাগলে অন্য দোকান থেকে ওষুধ কিনে নেন। এক্ষেত্রে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের (যদিও আইনটি ২০১৯ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়ন স্থগিত আছে) অংশ হিসেবে সব দোকানে ইসিআর (ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্টার) মেশিন বসাতে পারলে ভোক্তারা অন্তত বিক্রয় রসিদ নিশ্চিত করতে পারবেন।
ওষুধ কেনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ধরনের প্রতারণার শিকার হতে হয় ট্যাবলেট কিনতে গিয়ে। বেশির ভাগ ফার্মেসিতেই ট্যাবলেটের দাম বেশি নেওয়া হয় বলে অভিযোগ আছে। প্রয়োজনে আমরা এক পাতা, দুই পাতা কিংবা সর্বনি¤œ দুই কি একটি পর্যন্ত ট্যাবলেট কিনে থাকি। এক্ষেত্রে ট্যাবলেটের গায়ে দাম লেখা না থাকায় বিক্রেতা ইচ্ছেমতো দাম নেন বলে অভিযোগ আছে। ট্যাবেলেটের প্যাকেটের গায়ে দাম থাকলেও তা দেখে প্রতিটি ট্যাবলেটের দাম হিসাব করার সময় ক্রেতার হাতে নেই। এক্ষেত্রে উচিত অন্তত ট্যাবলেটের পাতার গায়ে মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখের পাশাপাশি দামটাও মুদ্রিত থাকা। বিষয়টি ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর ভেবে দেখবে বলে আশা করছি।
বেশি দাম নেওয়ার কথা যখন এল তখন বলতে হয়, বিক্রেতারা একটি পণ্য বা সেবা বিক্রি করে কত লাভ করবেন তা কি নির্ধারণ করে দেওয়া আছে? অবাধ প্রতিযোগিতার অর্থনীতিতে এটা সম্ভব নয়। তবে ধরে নেয়া হয়, বিক্রেতারা একটি যৌক্তিক পর্যায়ে লাভ করবেন, যাতে সমাজে কোনো ধরনের বৈষম্য তৈরি না হয়। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। বিক্রেতাদের লাভ এখন লোভে পরিণত হয়েছে বলে একাধিকবার বলে আসছেন অর্থনীতি বিশ্লেষক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ। তিনি বলে থাকেন, বাজারব্যবস্থায় সরকারের কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ না থাকার সুযোগ নিচ্ছে বিক্রেতারা। এর প্রমাণ মিলে আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে ঢাকার বিক্রি হওয়া কয়েটি পণ্যের দামের পার্থক্য দেখলে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি), বাংলাদেশের অর্থনীতির স্বাধীন পর্যালোচনায় সম্প্রতি এই পার্থক্য তুলে ধরেছে।
এতে এপ্রিলে মাসে বিশ্ববাজার ও ঢাকা মহানগর এলাকার বাজারে বিক্রি হওয়া ছয়টি পণ্যের দামের পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে। ঢাকার বাজারে বিশ্ববাজারের চেয়ে অন্তত আড়াইগুণের (২.৬) বেশি দামে বিক্রি হয়েছে প্রতি কেজি চিনি। আন্তর্জাতিক বাজারে গরুর মাংস ৩৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হলেও ঢাকায় বিক্রি হয়েছে ৪৮০ টাকায়। সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ৫৪ শতাংশেরও বেশি দামে বিক্রি হয়েছে। বিশ্ববাজারে কমবেশি ৭০ টাকা লিটার হলেও ঢাকার বাজারে এই দর ছিল ১১০ টাকা। পাম অয়েল বিক্রি হয়েছে ৩৪ শতাংশ বেশি দামে। আন্তর্জাতিক বাজারে চিকন ও মোট চালের দাম কেজি প্রতি ৩০ টাকা হলেও ঢাকার বাজারে এপ্রিল মাসে চিকন চালের দাম ছিল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা কেজি আর মোট চাল ৪০ টাকা কেজি। শুধু ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে চেয়ে বেশি দামে। ঢাকায় ১৫০ টাকা কেজি বিক্রি হলেও বিশ্ববাজারে এই সময়ে দাম ছিল ১৯০ টাকা কেজি।
ভোক্তাদের সুবিধার জন্য সিটি করপোরেশন নিয়ন্ত্রিত প্রতিটি বাজারেই মূল্য তালিকা দেওয়া থাকে। প্রতিদিন এই তালিকায় মূল্য লিখে দিয়ে যায় করপোরেশনের কর্মীরা। তবে তালিকার দাম অনুযায়ী কখনোই পণ্য বিক্রি করেন না বিক্রেতারা। এই যেমন, গরুর মাংস রমজানে মাসে ৪৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রির কথা থাকলেও কোনো বিক্রেতাই তা মানেনি। ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চলাকালীন হয়তো মূল্যতালিকা অনুযায়ী পণ্য বিক্রি হয়। অন্য সময় ওই তালিকার থোড়াই কেয়ার করেন বিক্রেতারা। এ নিয়ে ভোক্তারাও তেমন কিছু বলতে পারেন না। বললেই, বিক্রেতাদের সহজ উত্তর সরকার লেখার কাজ লিখে দিছে, আমরা তো ওই দামে পণ্য কিনতেই পারিনি, বিক্রি করব কীভাবে? তাদের কথার সত্যতা কতটুকু তা বিক্রেতা সেজে পাইকারি বাজার থেকে পণ্য কিনলে হয়তো বোঝা যাবে।
ক্রেতা তথা ভোক্তারা যে দিনের পর দিন সব দিন প্রতারিত হচ্ছেন, তার প্রমাণ পাওয়া যায় রমজানে চলা ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান থেকে। প্রতিদিনই এই আদালত কোনো না কোনো বাজারে, হোটেলে কিংবা নামি দামি ফাস্টফুডের দোকানকে জরিমানা করছে। পণ্য বা খাবারে ভেজাল দেওয়া, ওজনে কম দেওয়া, মূল্যতালিকা অনুযায়ী পণ্য বিক্রি না করা, বিএসটিআই এর নিয়ম না মানাসহ বিভিন্ন কারণে জরিমানা করা হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বড় বড় সুপার শপগুলোতে পর্যন্ত অনিয়ম পাওয়া যাচ্ছে। বাদ যাচ্ছে না নামি দামি ব্র্যান্ডের ফাস্টফুডের দোকানগুলো। মধ্যম আয়ে অনেক ভোক্তাই কষ্ট করে হলেও এসব জায়গায় যেতেন বিশুদ্ধ পণ্য ও খাবারের আশায়। এখন সেটাও যে ঝুঁকিপূর্ণ, তা ভ্রাম্যমাণ আদালতগুলোর অভিযান প্রমাণ করে দিল। তাহলে ভোক্তার যাবে কোথায়?

গণমাধ্যমকর্মী
[email protected]mail.com