ভ্যাট না দিয়েই ব্যবসা করছে সানোফি এভেন্টিস

মানা হচ্ছে না এনবিআরের নির্দেশ

রহমত রহমান: কাঁচামাল আমদানির আড়ালে বিপুল পরিমাণ মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট ফাঁকি দিচ্ছে বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানি সানোফি এভেন্টিস বাংলাদেশ লিমিটেড। এছাড়া বিক্রির বিপরীতে কখনোই ব্যবসায়ী পর্যায়ে ভ্যাট প্রদান করেনি প্রতিষ্ঠানটি। এর মাধ্যমে প্রায় ৪২ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি উদ্ঘাটন করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ভ্যাট ফাঁকির ঘটনা প্রমাণিত হওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানটি পাঁচ বছর ধরে তা পরিশোধে গড়িমসি করছে বলেও অভিযোগও রয়েছে।
সূত্র জানায়, সানোফি বাণিজ্যিক আমদানিকারক হিসেবে বিদেশ থেকে ওষুধের কাঁচামাল আমদানি করে। প্রতিষ্ঠানটি এনবিআরের আওতাধীন বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ)-মূল্য সংযোজন কর (মূসক) শাখায় কেমিক্যাল ক্যাটেগরিতে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যবসায়ী পর্যায়ে সঠিকভাবে ভ্যাট পরিশোধ না করার অভিযোগ পায় এনবিআর। অভিযোগের ভিত্তিতে সানোফির কাছে কাঁচামাল আমদানির তথ্য চায় এলটিইউ। সানোফি ২০১০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত আমদানি করা ফিনিস ওষুধের স্থানীয় পর্যায়ে সরবরাহের তথ্য দেয়, যার মোট বিক্রয়মূল্য প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। একই সঙ্গে মাসভিত্তিক সরবরাহের তথ্য ও ওষুধগুলোর ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর থেকে ব্যবসায়ী পর্যায়ে সরবরাহ মূল্য নির্ধারণের সনদপত্র দাখিল করে।
এসব পর্যালোচনা প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটি ওষুধগুলো বিদেশ থেকে ফিনিসড অবস্থায় আমদানি করে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর থেকে অনুমোদিত মূল্যের ভিত্তিতে সরবরাহ করেছে, যা প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক আমদানিকারক কার্যক্রম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি যে পণ্য দেখিয়েছে, বাংলাদেশি মুদ্রায় তার বিনিময় মূল্য উল্লেখ নেই। সেই মূল্যকে বিনিময় মূল্য হিসাব করে দেখা যায়, ওষুধ প্রশাসন অনুমোদিত মূল্যগুলো আমদানি মূল্যের ১৩ দশমিক ৩৩ শতাংশের চেয়েও অনেক বেশি। বলা হয়, ওষুধ প্রশাসনের সনদ অনুযায়ী প্রতি ভায়াল ফেভিরাব সল্যুশন ফর ইনজেকশনের সিঅ্যান্ডএফ মূল্য ১৬ দশমিক ২০ ডলার। এর বিপরীতে ওষুধ প্রশাসন অনুমোদিত বিক্রয়মূল্য প্রায় এক হাজার ৭৫৯ টাকা।
২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে এনবিআরের জারি করা ভ্যাট অব্যাহতিসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ওষুধগুলোর ব্যবসায়ী পর্যায়ে কখনোই ভ্যাট অব্যাহতি নেই। সানোফি এসব ওষুধের ভিত্তিমূল্য ঘোষণা করেনি। ভ্যাট প্রদান ও মূল্য অনুমোদন নেয়নি। এসব ওষুধ বিক্রির ক্ষেত্রে কখনোই ব্যবসায়ী পর্যায়ে ভ্যাট প্রদান করেনি। এছাড়া ওষুধগুলোর বিক্রয়মূল্যে বিদ্যমান এটিভি সংযোজন মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি। প্রতিষ্ঠানটি ভ্যাট আইন অমান্য করে ব্যবসায়ী পর্যায়ে প্রযোজ্য ভ্যাট পরিশোধ না করে পণ্য সরবরাহ করেছে। এনবিআরের আদেশ অনুযায়ী, স্থানীয় বিক্রির ক্ষেত্রে মূল্য সংযোজনের হার এটিভি হারের কম বা বেশি হলে মূল্য ঘোষণা বাধ্যতামূলক। সে অনুযায়ী অনুমোদিত মূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট প্রযোজ্য। এক্ষেত্রে রেয়াত গ্রহণ করা যাবে না।
সে অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির ২০১০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত আমদানি করা ওষুধের স্থানীয় পর্যায়ে মোট বিক্রয়মূল্য প্রায় ৩১৯ কোটি টাকা। এর ওপর ১৫ শতাংশ হারে ব্যবসায়ী পর্যায়ে সুদসহ ভ্যাট প্রায় ৩১ কোটি ২৯ লাখ টাকা। চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত সুদ প্রায় সাড়ে ৯ কোটি টাকাসহ মোট ভ্যাট ফাঁকির পরিমাণ প্রায় ৪২ কোটি টাকা।
সূত্র জানায়, ভ্যাট পরিশোধে ২০১৪ সালে সানোফিকে প্রাথমিক দাবিনামা-সংবলিত কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করা হয়। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বলা হয়, ওষুধ প্রশাসনের অনুমোদন অনুযায়ী স্থানীয় ব্যবসায়ী পর্যায়ে ভ্যাট উল্লেখ না থাকায় তা বিক্রির সময় ক্রেতাদের কাছ থেকে আদায় করা হয়নি। তাই ভ্যাট পরিশোধ করা হয়নি। ওষুধ প্রশাসনের নির্দেশনার বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। শুনানি শেষে প্রতিষ্ঠানটির যুক্তি নাকচ করে দেওয়া হয়। পরে ২০১৫ সালের ১১ জানুয়ারি চূড়ান্ত দাবিনামা জারি হয়। প্রতিষ্ঠানটি ভ্যাট পরিশোধ না করে উচ্চ আদালতে যায়। আদালত তা নিষ্পত্তি করতে ২০১৫ সালের ২২ নভেম্বর এনবিআরকে নির্দেশ দেন। পরে সানোফি দায় স্বীকার করে তা নিষ্পত্তির জন্য এনবিআরে আবেদন করে। এ নিয়ে এনবিআর সানোফির সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করে। বৈঠকে সানোফিকে প্রায় অর্ধেকের কম ভ্যাট পরিশোধ করতে বলা হয়। সিদ্ধান্তের পরও প্রতিষ্ঠানটি তা পরিশোধে গড়িমসি করছে বলে এনবিআর কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন।
এলটিইউ সূত্র জানায়, সানোফির বিরুদ্ধে ভ্যাট উত্তর কমিশনারেট ২০০২ সালে প্রায় ৪৭ লাখ টাকার ভ্যাট অনিয়ম ও প্রায় ৩৯ হাজার টাকার ভ্যাট ফাঁকির মামলা করে, যা উচ্চ আদালতে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এছাড়া ২০১০ সালে প্রায় ৬৭ লাখ টাকা ও ২০১২ সালে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি ভ্যাট ফাঁকির মামলা করে এলটিইউ, যা উচ্চ আদালতে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। পাঁচটি মামলায় প্রায় ৩৮ কোটি টাকা ফাঁকি দিয়েছে, যা উচ্চ আদালতে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এছাড়া ২০০৮-১০ অর্থবছরের অডিটে প্রায় সাড়ে ৪৩ কোটি টাকা, ২০১০-১২ পর্যন্ত প্রায় দুই কোটি টাকা ও ২০১২-১৩ অর্থবছরে প্রায় সাড়ে ২৫ কোটি টাকাসহ মোট প্রায় ৭১ কোটি টাকার ফাঁকি উদ্ঘাটন করে।
এ বিষয়ে এলটিইউ’র কমিশনার মো. মতিউর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, সানোফি থেকে এ ভ্যাট আদায়ের বহু চেষ্টা করা হয়েছে; কিন্তু সরকারের টাকা যাতে আটকে রাখা যায়, না পরিশোধ করা যায়Ñসানোফির ভাবটা এমন। সিদ্ধান্তের পরও তাদের টাকা দিতে অনীহা রয়েছে। শুধু এ ভ্যাট নয়, পরবর্তীকালে অডিট করে বহু ফাঁকি বের করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে সানোফি এভেন্টিস বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মইন উদ্দিন মজুমদার শেয়ার বিজকে বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানার কথা, তবে আমার জানা নেই। আমাদের কমিউনিকেশন বলতে পারবে।’
পরে সানোফি এভেন্টিসের হেড অব কমিউনিকেশন ফারহানা তোফায়েলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, ‘এপ্রিল মাসে এনবিআরের সঙ্গে আমাদের সর্বশেষ বৈঠক হয়েছে। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমাদের ডিমান্ড নোটিস দেওয়ার কথা। কিন্তু এখনও তা আমরা পাইনি। আধাসরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমরা যে ভ্যাট দেব না, তা কোনোভাবে হতেই পারে না।’
উল্লেখ্য, সানোফি ১৯৫৮ সাল থেকে বাংলাদেশে ওষুধ বাজারজাত করে আসছে। সানোফিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রায় ৪৬ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।