মত-বিশ্লেষণ

মজুতদার অসাধু ব্যবসায়ীদের বয়কট করতে হবে

এসএম নাজের হোসাইন: রমজান, ঈদ ও পূজাপার্বণ সামনে রেখে মুনাফাখোর, মজুতদার, সিন্ডিকেট, খাদ্যে ভেজালকারী ও অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির জন্য নাগরিক জীবন অতিষ্ঠ। একশ্রেণির নীতি-আদর্শহীন, অতি মুনাফালোভী ও অসাধু ব্যবসায়ীরা কোটিপতি হওয়ার বাসনায় তাদের ইচ্ছামতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্যের মূল্য সংকট সৃষ্টি করে ও দাম বাড়িয়ে দিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা অচল করে দিয়েছেন। এর ফলে সাধারণ মানুষের জন্য জীবনজীবিকা নির্বাহ করা কঠিন ও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ওই ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে দাম বাড়ান। তারপর ওই পণ্যের আন্তর্জাতিক দাম কমলেও তারা আর কমান না। সরকার গুটিকয়েক অসৎ ব্যবসায়ীর স্বার্থ সংরক্ষণে যাবতীয় রীতিনীতি প্রণয়ন করায় সাধারণ জনগণের স্বার্থ বারবার উপেক্ষিত হয়। ফলে ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম ইচ্ছামতো বাড়ান, কমান এবং সরবরাহসহ বাজার নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে জনগণকে জিম্মি করে কোটি কোটি টাকা নিজেদের পকেটস্থ করেন। এ ছাড়া সিএনজি অটোরিকশা ও বাসভাড়া থেকে আরম্ভ করে নগরীর সেলুন, ফটোস্টেটের দোকান, ফার্মেসি, রিকশাওয়ালাসহ সবাই নিজেরা তাদের ইচ্ছামতো মূল্য নির্ধারণ করছে। সেক্ষেত্রে সরকারি কোনো সমন্বয়সাধন তো দূরের কথা, সরকারসংশ্লিষ্টরা এর খবরই রাখছেন না। উপরন্তু তাদের এ কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দিতে, সরকারের ভর্তুকি লাভের আশায় এবং কর ফাঁকির কুমতলবে এসব ব্যবসায়ী রমজানে সুদৃশ্য মোড়কে ন্যায্য মূল্যের দোকান খুলে সাধারণ জনগণের সঙ্গে ছলনা করছেন। কিন্তু পাইকারি ও খুচরা বাজারের মাঝে সমন্বয় করলে এবং মজুতদারি ও একচেটিয়া আমদানির দৌরাত্ম্য কমাতে পারলে দ্রব্যমূল্য অনেকাংশে কমত। রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য যখনই আলোচনা হবে, তখন পাইকারি বিক্রেতারা খুচরা বিক্রেতাদের দোষারোপ করবেন, অন্যদিকে খুচরা বিক্রেতারা পাইকারি বিক্রেতাদের দোষারোপ করবেন। পবিত্র রজমান, ঈদ ও পূজাকে সামনে রেখে একশ্রেণির মজুতদার ও সিন্ডিকেট চক্র প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজনের নাকের ডগায় তাদের বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে চিনি, সয়াবিন, পেঁয়াজ ও ছোলার সংকট সৃষ্টি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এ চক্রটি আবার নতুন করে চাল সংকটের পাঁয়তারা করছে। এসব মজুতদার, অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেটকারীদের সঙ্গে প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারীর সংস্থার কিছু লোকের অবৈধ আঁতাতের কারণে তারা জনগণের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। তাদের অনেকেই আবার সাধু সাজার জন্য পবিত্র উমরাহ পালন করে হাজি, বিভিন্ন সভা-সেমিনারে মোটা অঙ্কের দান-খয়রাত করে সাদা মনের মানুষসহ নানা গুণীজনের বেশ ধারণ করেন। অনেকে আবার সমাজসেবক হয়ে সমাজদরদি হয়ে ওঠেন। তাদের এ অপতৎপরতার কারণে পুরো সমাজ কলুষিত হচ্ছে। সে কারণে দেখা যায়, চিনি, সয়াবিন ও চাল কেলেঙ্কারির নায়কদের নিয়ে প্রশাসন মনিটরিং কমিটি গঠন করছে। তারা সেখানে সরকারি নীতিনির্ধারণী মহলকে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে ভুল পথে পরিচালিত করে থাকেন। প্রকারান্তরে জনগণের ভোগান্তি বাড়তেই থাকে। সে কারণে আজকে ব্যবসায়ী বললেই মানুষ আতঙ্কিত হয়ে ওঠে?
এদিকে হাইকোর্ট এক রিট আবেদনে গত ১২ মে বলেছেন, খাদ্যে ভেজালের কারণে দেশ বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে হাইকোর্ট বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্স অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের মান পরীক্ষায় নি¤œমান প্রমাণিত হওয়ায় ৫২টি প্রতিষ্ঠানের খাদ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন। হাইকোর্ট আরও পর্যবেক্ষণ দেন খাদ্যে ভেজাল এবং নিন্মমানের পণ্য ও খাবারের কারণে এ দেশ বসবাসের জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধ ঘোষণার আহ্বান জানিয়েছেন।
তারা একদিকে যেমন পণ্যদ্রব্যের মূল্য বেশি নিয়ে সাধারণ মানুষের পকেট কাটছেন, অন্যদিকে দুধ ও মাছে ফরমালিন, ইউরিয়া, ফলমূলে কার্বাইডসহ বিভিন্ন কেমিক্যাল দ্রব্য মিশিয়ে কৃত্রিমভাবে পাকানোর পর তাজা রাখার জন্য সালফার নামে অন্য একটি কেমিক্যাল দিচ্ছেন। শাকসবজি তাজা রাখার জন্য ব্যবহার করছেন হরেক রকমের কেমিক্যাল। তারা নষ্ট ছোলা ভালো ছোলার সঙ্গে এবং পচা চাল ভালো চালের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রি করছেন। বিভিন্ন গুঁড়ো মশলায় ইটের গুঁড়োসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর দ্রব্য মিশিয়ে বিক্রি করছেন। সরিষার তেলে মেশাচ্ছেন সাইট্রিক এসিড। একই সঙ্গে শিঙাড়া-সমুচা তৈরিতে সয়াবিনের সঙ্গে পোড়া মবিল ব্যবহারের খবর আমরা সবাই জানি। তারা হোটেল, রেস্তোরাঁ ও সুপার শপে অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন জায়গায় খাবার ও খাদ্যপণ্য বিক্রি করছেন।
এদিকে এত খাদ্যে ভেজাল দেওয়ার পরও তারা বিভিন্ন দেশ থেকে নিন্মমানের গুঁড়োদুধ এনে অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানি বলে মিথ্যা প্রতারণা করে বাজারজাত করছেন। দুধ উৎপাদনে অনেক অগ্রগতি হলেও বিদেশ থেকে গুঁড়ো দুধ আমদানি করতে একটি মহল সব সময় সক্রিয়। সম্প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউশনের অধীন ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরি (এনএফএসএল) এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত জাতীয় নিরাপদ খাদ্য গবেষণাগারের উদ্যোগে গরুর দুধ, গরুর খাবার, দুগ্ধজাত দই ও প্যাকেটজাত দুধের ওপর জরিপ চালানো হয়। আর বাজারে প্রচলিত সব ব্র্যান্ডের স্থানীয় ও আমদানি করা প্যাকেটজাত দুধের নমুনা সংগ্রহ করা হয় বিভিন্ন সুপার স্টোর থেকে, যা সংগ্রহ থেকে শুরু করে গবেষণাগারে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিয়ম মানা হয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, বাজারে প্রচলিত সব ব্র্যান্ডের স্থানীয় ও আমদানি করা প্যাকেটজাত দুধের নমুনা সংগ্রহ করা হয় বিভিন্ন সুপার স্টোর থেকে। সেসব নমুনায় বিভিন্ন অণুজীব বিশেষ করে দইয়ে সিসা ও অ্যান্টিবায়োটিকের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। আবার অনেকে বিদেশ থেকে নিন্মমানের ও মেয়াদোত্তীর্ণ গুঁড়োদুধ আমদানি ও বাজারজাত করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে সম্পদের পাহাড় গড়ছেন, দেশকে পরিণত করছেন ভেজালের স্বর্গরাজ্যে। এসব কেমিক্যাল মেশানো ফলমূল, শাকসবজি, তেল এবং নিন্মমানের ও মেয়াদোত্তীর্ণ গুঁড়োদুধ ও শিশুখাদ্য খাওয়ায় ক্যানসার, কিডনি-লিভারের জটিল রোগ, মেধাহীন, বিকলাঙ্গ, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী হয়ে জন্মগ্রহণ, জন্ডিস, স্থূল স্বাস্থ্যসহ সারাজীবনের জন্য পঙ্গুত্ববরণ করার আশঙ্কা রয়েছে। এমনকি মহিলারা বন্ধ্যাত্বের শিকারও হচ্ছে।
আর এসব খাদ্যদস্যুদের ভিত এতই শক্ত যে সরকারি প্রশাসনযন্ত্র মনে হয় তাদের কাছে অসহায়। তারা টাকার জোরে সরকারি আমলা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বিভিন্ন মিডিয়াকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেন। বিজ্ঞাপন ও আর্থিক সুবিধার কারণে তাদের অপকর্মের খবর মিডিয়াতে আসে না। কোনো কারণে ধরা পড়লেও আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে ঠিকই বেরিয়ে যায়। বরং এই খাদ্যদস্যুদের কোটিপতি হওয়ার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এর আগে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে একই কায়দায় গুঁড়োদুধে ময়দা মিশ্রিত করার হোতাসহ চিনি, সয়াবিন ও চাল কেলেঙ্কারির হোতাদের কোনো শাস্তি হয়নি। তারা পর্দার আড়ালে থেকে রেহাই পেয়ে যান। আর সাধারণ ভোক্তাদের ভেজাল, নিন্মমানের গুঁড়োদুধ, জাঙ্কফুড ও শিশুখাদ্য নীরবে হজম করতে হচ্ছে। প্রকারান্তরে বাংলাদেশকে ভেজাল ও নিন্মমানের খাদ্যের বাজার ও পরীক্ষাগারে পরিণত করে কোটি কোটি টাকা তারা হাতিয়ে নিচ্ছে। নিন্মমধ্যবিত্ত ভোক্তারা যা রোজগার করছেন, তার সিংহভাগই ওষুধ ও চিকিৎসার খরচ জোগাতে চলে যাচ্ছে।
তাই আসুন, অবিলম্বে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর গুদামজাতকারী, খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল মিশ্রণকারী, বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিতে জড়িত অসৎ ব্যবসায়ী ও তাদের সহযোগী সরকারি প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকসহ অন্য দোসরদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হই এবং তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করি।

ভাইস প্রেসিডেন্ট
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)
[email protected]

সর্বশেষ..