মধুপল্লি ও মধুমেলা

মধুপল্লি! হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন, সাগরদাঁড়িতে আমাদের আধুনিক কবিতার নির্মাতা, মেঘনাদবধ কাব্যের স্রষ্টা মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়ি। যশোরের কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামে জšে§ছিলেন কবি। তার স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখতে সরকারি উদ্যোগে তার বাড়িটি সংরক্ষণ করা হয়েছে; নাম দেওয়া হয়েছে ‘মধুপল্লি’। জানুয়ারিতে সাগরদাঁড়ির রাস্তাঘাট থাকে জনারণ্য। সারা দেশ থেকে ভ্রমণবিলাসী মানুষ এখানে আসে মহাকবির জš§ভূমি দর্শনে। জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে বসে বিশাল মেলার আসর। নাম ‘মধুমেলা’। কয়েক দিন ধরে চলে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ভ্রমণপিয়াসীরা সময় পেলে যেতে পারেন মধুমেলায়।

নানা প্রাচীন স্থাপনা আর কবির স্মৃতিতে সমৃদ্ধ মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়ি। কুটিরের আদলে তৈরি প্রধান ফটক পেরিয়ে প্রবেশ করতে হয় মধুপল্লিতে। প্রথমে চোখে পড়ে কবির আবক্ষ মূর্তি। ভেতরে কবির বসতবাড়ি, বর্তমানে জাদুঘর। ১৯৬৫ সালে ২৬ অক্টোবর সরকার বাড়িটি পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে।

দর্শনীয় যা কিছু

মধুসূদনের পরিবারের ব্যবহার্য কিছু আসবাব ও নানা স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে এ বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মধুসূদন জাদুঘর। চারপাশ প্রাচীরে ঘেরা, ভেতরে বাড়ির পশ্চিম পাশে আছে দিঘি। দিঘির ঘাটে কবি স্নান করতেন, যা সংরক্ষণ করা হয়েছে।

ভেতরে গেলে দেখতে পাবেন কবির জš§গৃহ। গোটা বাড়িটি অধিগ্রহণ করেছে প্রতœতত্ত্ব বিভাগ। এ বাড়ির পশ্চিম পাশে আরও একটি বাড়ি আছে। এটি কবির ভাইঝি কবি মানকুমারী বসুর, বাংলা সাহিত্যের প্রথম আধুনিক মহিলা কবি। এখানের একটি ঘরকে ব্যবহার করা হচ্ছে মধুসূদন একাডেমির অফিস ও মধুসূদন মিউজিয়াম হিসেবে। মিউজিয়ামটির ভেতরে রয়েছে মধুসূদনবিষয়ক বিভিন্ন দুষ্প্রাপ্য দলিল, চিঠিপত্র, পাণ্ডুুলিপি, হাতে আঁকা ছবি ও অন্য তথ্যনির্দেশ।

১৮৩০ সালে সাগরদাঁড়ি ছেড়ে কলকাতার খিদিরপুর চলে যান মধুসূদন। কলকাতায় থাকলেও কবির মন পড়ে থাকত সাগড়দাঁড়িতে। মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে একবার স্ত্রী, পুত্র ও কন্যাকে নিয়ে নদীপথে বজরায় করে বেড়াতে আসেন সাগরদাঁড়িতে। জানা যায়, ১৮৬২ সালে কবি যখন সপরিবারে সাগরদাঁড়িতে এসেছিলেন, তখন ধর্মান্তরিত হওয়ার কারণে জ্ঞাতিরা তাকে বাড়িতে উঠতে দেননি। তিনি কপোতাক্ষ নদের তীরে একটি কাঠবাদাম গাছের তলায় তাঁবু খাটিয়ে ১৪ দিন অবস্থান করেন। বিফল মনে কপোতাক্ষের তীর ধরে হেঁটে বিদায় ঘাট হতে কলকাতার উদ্দেশে বজরায় উঠেছিলেন। এরপর তিনি আর দেশে ফেরেননি।

কপোতাক্ষ নদের তীরে কবির স্মৃতিবিজড়িত কাঠবাদাম গাছের গোড়া শান বাঁধানো। বয়সের ভারে মৃতপ্রায় বাদাম গাছ ও বিদায় ঘাট পর্যটকদের আকর্ষণ করে আজও। এখানে দাঁড়িয়ে উপভোগ করতে পারেন কপোতাক্ষ নদের অপার সৌন্দর্য।

কখন যাবেন

এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বরÑপ্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা ও অক্টোবর থেকে মার্চÑপ্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে মধুপল্লি। শুক্রবার সাড়ে ১২টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত বিরতি। মধুপল্লির সাপ্তাহিক ছুটি রোববার। এছাড়া অন্য সরকারি ছুটির দিনেও বন্ধ থাকে।

মধুপল্লিতে প্রবেশমূল্য দেশি পর্যটক ১০ টাকা, বিদেশি ১০০ টাকা। এছাড়া পার্কিংমূল্য বাস ১০০, মাইক্রো, জিপ ও গাড়ি ৫০ টাকা এবং মোটরসাইকেল ১০ টাকা।

যেভাবে যাবেন

যশোর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে সাগরদাঁড়ি। রাজধানী থেকে সড়ক, রেল ও আকাশপথে যশোরে যেতে পারেন। গাবতলী, কল্যাণপুর, কলাবাগান থেকে গ্রিনলাইন, সোহাগ, হানিফ, ঈগল, শ্যামলী পরিবহনের এসি বা নন-এসি বাস যশোর যায়।

কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে সপ্তাহের শনিবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৬টা ২০ মিনিটে আন্তনগর ট্রেন সুন্দরবন এক্সপ্রেস ও সোমবার ছাড়া প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টায় আন্তনগর ট্রেন চিত্রা এক্সপ্রেস যশোরের উদ্দেশে ছেড়ে যায়।

আকাশপথে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সঙ্গে যশোরের নিয়মিত ফ্লাইট রয়েছে।

যশোর বাস টার্মিনাল থেকে বাস অথবা মাইক্রোবাসে চড়ে প্রথমে যেতে হবে কেশবপুর। ভাড়া ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। এখান থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশায় যেতে পারবেন সাগরদাঁড়ি।

যেখানে থাকবেন

সাগরদাঁড়িতে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের একটি মোটেল আছে। ভাড়া ৬০০ থেকে ১২০০ টাকা। যাওয়ার আগে মোটেলে কথা বলে যাওয়াটা ভালো হবে। তাছাড়া চাইলে যশোরের আবাসিক হোটেলে থাকতে পারেন।

হাসানুজ্জামান পিয়াস