সারা বাংলা

মধ্যপাড়া পাথর খনিতে পাঁচ মাস উত্তোলন বন্ধ

রজব আলী, দিনাজপুর: দিনাজপুরের মধ্যপাড়া কঠিন শিলা প্রকল্প থেকে প্রায় পাঁচ মাস বন্ধ রয়েছে পাথর উত্তোলন। কবে পাথর উত্তোলন শুরু হবে তাও বলতে পারছেন না কেউ। এতে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে খনিটি ভবিষ্যৎ। খনিটি দ্রুত উৎপাদনে ফিরে না এলে কয়েকশ’ কোটি টাকার ক্ষতি হবে সরকারের। বেকার হয়ে পড়বে খনি এলাকার কয়েক হাজার মানুষ।
মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক আবু তালেব ফরাজি জানান, গত ৩ এপ্রিল উত্তোলন যন্ত্র ক্রিস্ট মোটর গিয়ারবক্সের
পিনিয়াম ভেঙ্গে যাওয়ায় পাথর উত্তোলন বন্ধ হয়ে যায় খনিটিতে। খনিটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিটিসি চুক্তি অনুযায়ী ক্রিস্ট মোটরটি আমদানি করার কথা থাকলেও এখন প্রর্যন্ত তারা ক্রিস্ট গিয়ারবক্সটি আমদানি করেনি। যার কারণে পাথর উত্তোলন শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না।
তবে জিটিসি বলছে, ক্রিস্ট বক্সটি আমদানি করার জন্য মধ্যপাড়া খনি কর্তৃপক্ষ কোনো কর্মাদেশ দেয়নি। ফলে তারা এ যন্ত্রটি আমদানি করতে পারেননি।
এদিকে গত প্রায় পাঁচ মাস থেকে খনিটিতে পাথর উত্তোলন বন্ধ থাকায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন খনিতে কর্মরত হাজারের অধিক শ্রমিক। তারা এখন পেশা পরিবর্তন করে বিভিন্ন কাজে যোগ দেওয়া শুরু করেছে। এছাড়া খনিটির ইয়াডে থাকা মজুদ পাথরও শেষ পর্যায় এসেছে। পাথরের মজুদ শেষ হয়ে আসলেও নতুন করে পাথর উত্তোলন শুরু না হওয়ায় সরকারের মেগা প্রকল্পগুলোতে বিদেশ থেকে পাথর আমদানি ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। মজুদ পাথরের বিক্রি শেষ হলে একেবাবে বন্ধ হয়ে পড়বে খনিটির কার্যক্রম।
দেশের একমাত্র উৎপাদনশীল মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডে (এমজিএমসিএল) বাণিজ্যিকভাবে পাথর উত্তোলন শুরু হয় ২০০৭ সালে। ওই সময় পাথর খনি থেকে দৈনিক প্রায় দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টন পাথর উত্তোলন করা হলেও ২০১২ সালে এসে পাথর উত্তোলন নেমে আসে ৫০০ টনে। এতে খনিটি বড় রকমের লোকশানের মুখে পড়ে। খনির এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে উৎপাদন বাড়াতে ২০১৩ সারের ৩ সেপ্টেম্বর বেলারুশভিত্তিক জার্মানিয়া ট্রাস্ট কনসোটিয়াম (জিটিসি) এর সঙ্গে ছয় বছরে ৯২ লাখ টন পাথর উত্তোলনসহ খনিটির উৎপাদন রক্ষণাবেক্ষণের চুক্তি করে। চুক্তি অনুযায়ী জিটিসি ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে পাথর উত্তোলন শুরু করে। কিন্তু গত চার বছরে ৯২ লাখ টনের মধ্যে জিটিসি পাথর উত্তোলন করেছে মাত্র ৩১ লাখ টন। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী পাথর উত্তোলন না হওয়ায় আবারও লোকসানের মুখে পড়ে খনিটি।
মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক আবু তালেব ফরাজি জানান, চুক্তি অনুযায়ী জিটিসি ১৭১ দশমিক ৮৬ মিলিয়ন ডলারের বিপরিতে ছয় বছরে ৯২ লাখ টন পাথর উত্তোলন ও ১২টি নতুন স্টোপ (পাথর উত্তোলন ক্ষেত্র) নির্মাণের কথা ছিল। কিন্তু জিটিসি গত চার বছরে ৯২ লাখ টন পাথরের স্থলে এ পর্যন্ত পাথর উত্তোলন করেছে মাত্র ৩০ দশমিক ৭৬ লাখ টন। আর ১২ স্টোভের স্থলে নির্মাণ করেছে মাত্র ছয়টি স্টোভ। পাথর উত্তোলন যন্ত্র ক্রিপ্ট মোটর গিয়ার বক্সের পিনিয়াম নষ্টের কারণ দেখিয়ে চলতি বছরের ৩ এপ্রিল থেকে পুরোপুরি ভূ-গর্ভ থেকে পাথর উত্তোলন বন্ধ রেখেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি।
তিনি আরও জানান, উৎপাদন শুরু করতে তাদের দফতর থেকে বারবার পত্র দেওয়া হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিটিসি কোনো জবাব দিচ্ছে না। তারা পাথর উৎপাদন শুরুর কোনো উদ্যোগও নিচ্ছে না। এ কারণে কবে নাগাদ মধ্যপাড়া খনির উৎপাদন শুরু হবে তা নিশ্চিত করতে পারছে না খনি কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে বাড়ছে লোকসান।
খনি কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, গত ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে খনিটির লোকসান হয় তিন কোটি ৫১ লাখ টাকা। এর আগের অর্থবছর (২০১৭-২০১৮) অর্থবছরে লোকসান হয়েছে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা।
এদিকে আগামী ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানা (জিটিসি)’র চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। খনিটিকে উৎপাদনে নিয়ে যাওয়ার জন্য এবং লাভবান করার লক্ষ্যে নতুন কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির জন্য টেন্ডারের প্রস্তুতি নিয়েছে খনি কর্তৃপক্ষ। এতে অনুমান করা যায়, ২০২০ সালের পর ছাড়া মধ্যপাড়া খনিটিতে নতুন করে পাথর উত্তোলন আর নাও হতে পারে।
আবু তালেব ফরাজি জানান, চুক্তি অনুযায়ী পাথর উৎপাদন করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিটিসি। জিটিসি চুক্তি অনুযায়ী কাজ করতে না পারলে লিকুইডেটেড ড্যামেজ (এলডি), নিরাপত্তার অগ্রিম গ্রহণ করা অর্থ থেকে তারা ক্ষতিপূরণ কেটে নেবেন।
অপরদিকে উৎপাদন বন্ধ থাকার ব্যাপারে জিটিসির মহাব্যবস্থাপক জাবেদ সিদ্দিকী জানান, পাথর উত্তোলনের বিষয়ে অসহযোগিতার করে আসছে খনি কর্তৃপক্ষ। পাথর উত্তোলন বৃদ্ধির অনেক প্রস্তাব দেওয়া হলেও খনি কর্তৃপক্ষ কোনো সহযোগিতা করেনি। উত্তোলন যন্ত্রের ক্রিস্ট মোটর গিয়ার বক্সের পিনিয়াম ভেঙে যাওয়ার কথা খনি কর্তৃপক্ষকে তৎক্ষণাৎ জানানো হলেও, খনি কর্তৃপক্ষ এখন প্রর্যন্ত সেই মেশিনটি আমদানি করেনি। ফলে গত প্রায় পাঁচ মাস থেকে পাথর উত্তোলন বন্ধ রয়েছে। গত চার মাসসহ প্রায় তিন বছর যন্ত্রের অভাবে পাথর উত্তোলন বন্ধ ছিল খনিটিতে। এ কারণে তারা সময়মতো চুক্তি অনুযায়ী পাথর উত্তোলন করতে পারেননি। উত্তোলন বন্ধ থাকার সময়টি তাদের দেওয়া হলে চুক্তি অনুযায়ী পাথর উত্তোলন করবেন। এ জন্য তিনি তাদের চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি করার দাবি জানান।

সর্বশেষ..



/* ]]> */