মনকে ছুটি দিতে বেড়িয়ে আসুন চট্টগ্রাম থেকে

সাইদ সবুজ: কর্মব্যস্ত শহুরে বন্দি মন খানিকটা ছুটি পাওয়ার জন্য ছটফট করে অনেকের ক্ষেত্রেই। বুকভরে নির্মল আলো-বাতাস নিতে কার না মন চায়? কিন্তু শহুরে ব্যস্ত জীবনে অনেকেই সেই সুযোগ পায় না। ঈদের ছুটি সুযোগটা নিয়ে আসে প্রতি বছর। তাই ঘরে বসে না থেকে ঈদের ছুটিতে ঘুরে আসতে পারেন অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান থেকে।
চট্টগ্রাম শহর ও শহরতলিতে প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য রয়েছে সময় কাটানোর মনোরম পরিবেশ। যারা বেশি দূরে যাবেন না, তারা ঈদের ছুটিতে ঘুরে আসতে পারেন শহর ও শহরতলির ফয়েজ লেক, মিনি বাংলাদেশ, অভয়মিত্র ঘাট, পতেঙ্গা ও পারকি সমুদ্রসৈকত থেকে। এছাড়া হাতে একটু সময় থাকলে ঘুরে আসতে পারেন শহরের কাছেই দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃত্রিম লেক মহামায়া সেচ প্রকল্প, দেশের ষষ্ঠ সেচ ও প্রথম বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প মুহুরী প্রজেক্ট, আট স্তরবিশিষ্ট জলপ্রপাত খৈয়াছড়া ঝরনা, বাওয়াছড়া, সীতাকুণ্ড ইকো পার্ক ও নাপিত্তা ছড়া ঝরনা থেকে।
পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী ইসরাত জাহান ঈদের ছুটিতে মা ও একমাত্র ভাইয়ের সঙ্গে যাবে দাদাবাড়ি মিরসরাইয়ে। সে বড় ভাই ফয়সালের কাছে বায়না ধরেছে ছুটিতে মহামায়া লেক দেখাতে নিতে হবে। অন্যদিকে ইসরাতের বান্ধবী লামিয়া ঈদের ছুটিতে থাকবে শহরে। সে যাবে মায়ের সঙ্গে ফয়েজ লেকে।
ফয়েজ লেকে দেখার মতো রয়েছে অনেক কিছু। শিশুদের জন্য যেমন নানা রকম রাইডের ব্যবস্থা আছে, তেমনি বড়রাও খুজেঁ পাবেন পাহাড় ও হ্রদ। সব মিলে মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। এ অঞ্চলের চারদিকে পাহাড় আর মাঝখানে রয়েছে অরুণাময়ী, গোধূলি, আকাশমণি, মন্দাকিনী, দক্ষিণী, অলকানন্দা নামের হ্রদ। হ্রদের পাড়ে যেতেই দেখা মিলবে সারি সারি নৌকার। নৌকায় যেতে মিনিট দশেক লাগবে। এর পরই দেখা মিলবে দুই দিকে সবুজ পাহাড়, মাঝেমধ্যে দু-একটি বকসহ নাম না জানা হরেক রকম পাখি। রয়েছে মনোরম পরিবেশে হরিণের বিচরণ স্থান। পর্যটক আকর্ষণ করার জন্য একটি মিনি চিড়িয়াখানা ফয়েজ লেকের প্রবেশপথের কাছে রয়েছে। লেকের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হচ্ছে, এর সৌন্দর্য ও তার পার্শ্ববর্তী পাহাড়।
একটি চিত্তবিনোদন পার্ক সম্প্রতি ফয়েজ লেকে খোলা হয়েছে। লেকে নৌকায় ভ্রমণ, ল্যান্ডস্কেপিং, রেস্টুরেন্ট, ভাসমান ধাপ কনসার্ট, হাঁটার পথ এবং অন্যান্য অনেক মজার ও উপভোগ্য জিনিস রয়েছে। দর্শনার্থীরা হ্রদটির রোমহর্ষক দৃশ্য উপভোগের জন্য নৌকাভ্রমণে যেতে পারেন। চিত্তবিনোদন পার্কে দুটি উচ্চ সøাইড আছে। সেগুলো হলো উচ্চগতির রোলার কোস্টার ও বাম্পার বোট। এখানে একটি অবকাশযাপন কেন্দ্র আছে, যেখানে বিভিন্ন বয়সী ও রুচির মানুষের জন্য কিছু না কিছু আছে। মানুষ ফয়েজ লেকে মজা ও উত্তেজনার পাশাপাশি প্রশান্তি ও শান্তিতে থাকতে পারে। ‘সি ওয়ার্ল্ড’ হচ্ছে চট্টগ্রামের হƒদয়ে অবস্থিত ফয়েজ লেকের একটি জল থিম পার্ক। স্পøাশ পুল, ওয়াটার কোস্টার রাইডার ও বিশ্বমানের থিম পার্ক হিসেবে যা আশা করা যায় তার সবই সি ওয়ার্ল্ডে আছে।
শহরের প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে চট্টগ্রামের স্বাধীনতা কমপ্লেক্স (মিনি বাংলাদেশ)। এখানে প্রবেশ করতেই দেখা যাবে জাতীয় সংসদ ভবনের রেপ্লিকা। ভবনের নিচে আছে জলরাশি। একটু বামে গেলে দেখতে পাবেন আধুনিক স্থাপত্যের ছোঁয়ায় তৈরি প্রায় ২৫০ ফুট উচ্চতার ঘূর্ণায়মান ‘রিভলবিং রেস্টুরেন্ট’। এখানে ওঠার পর দেখা যাবে সমগ্র চট্টগ্রাম। দেখা যাবে হাইকোর্ট, দরবার হল। এভাবে দেশের বর্ণিল ঐতিহ্য, স্থাপনা ও নান্দনিক স্মারক নিয়ে গড়ে উঠেছে মিনি বাংলাদেশ (স্বাধীনতা পার্ক)। চট্টগ্রাম নগরীর বহদ্দারহাট বাস টার্মিনালসংলগ্ন এ বিনোদন কেন্দ্রটিতে রয়েছে ঝরনা ও পাঁচটি পানির ফোয়ারা। হ্রদের লেকের মধ্যে আছে প্যাডেল বোট। আরও আছে শিশুদের জন্য ছয়টি বাম্পার কার। মিনি বাংলাদেশে আছে আহসান মঞ্জিল, সংসদ ভবন, কার্জন হল, কান্তজির মন্দির, লালবাগ কেল্লা, বড়কুঠি, ছোটকুঠি, সোনা মসজিদ, পাহাড়পুর বিহার, দরবার হল, হাইকোর্ট, সেন্ট নিকোলাস চার্চ, শহীদ মিনার, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, ট্রেনের নিচে ব্রিজ ও চিরন্তন পল্লির রেপ্লিকা। ফলে এটি দর্শনার্থীদের কাছে মিনি বাংলাদেশ হিসেবে পরিচিত। তাছাড়া ২৪তলা সমপরিমাণ সুউচ্চ রিভলবিং রেস্টুরেন্ট ও অ্যামিউজমেন্ট রাইডটি দর্শকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। আছে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও বিভিন্ন জেলার ইতিহাস-ঐতিহ্যনির্ভর পাড়ার রেপ্লিকা প্রভৃতি। শিশুসহ বিনোদনপিপাসুদের জন্য আছে মিনি ট্রেন, প্যাডেল ট্রেন, ফ্যামিলি কোস্টার, প্যাডেল বোট, বেবি ক্যাসল, বেলুন হুইল, বাম্পার কার, মিউজিক সুইং ও আরবি ট্রেন।
প্রকৃতির টানে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়া ভ্রমণপিয়াসীরা এক বিকালে যেতে পারেন পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে। চট্টগ্রাম শহরে ঘুরতে গিয়ে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত না দেখলে ভ্রমণটাই বৃথা। ভারতের মিজোরামের লুসাই পাহাড় থেকে উৎপন্ন হওয়া কর্ণফুলী নদী, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পতেঙ্গার কাছে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এ নদীর মোহনায় রয়েছে বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর ‘চট্টগ্রাম বন্দর’। উৎস থেকে এ নদীর দৈর্ঘ্য ৩২০ কিলোমিটার হলেও কাপ্তাই বাঁধ থেকে মোহনা পর্যন্ত সাড়ে ৮৮ কিলোমিটার। সমুদ্রসৈকতের সঙ্গে ঝাউবনের ছায়াতলে গড়ে উঠেছে খাবারের দোকানসহ অনেক দোকানপাট। এছাড়া রয়েছে সমুদ্রে ঘুরে বেড়ানোর জন্য স্পিডবোট, সমুদ্রতীরে ঘুড়ে বেড়ানোর জন্য সি-বাইক ও ঘোড়া। এজন্য অবশ্য প্রতিঘণ্টা হিসেবে নির্দিষ্ট ভাড়া গুনতে হবে। ঝাউবনঘেঁষে হেঁটে গেলে দেখতে পাবেন কর্ণফুলী নদীর মোহনা আর নদী পার হলেই যেতে পারবেন পারকি সৈকতে।
একটা দিন হাতে নিয়ে যেতে পারেন মহামায়া ও খৈয়াছড়া ঝরনায়। পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় এই দুটি স্থানের অবস্থান একই পথে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মিরসরাই উপজেলার ঠাকুরদিঘি বাজারের এক কিলোমিটার পূর্বে মহামায়া। উপজেলার দক্ষিণে খৈয়াছড়া ইউনিয়নের বড়তাকিয়া বাজারের উত্তর পাশে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ৪.২ কিলোমিটার পূর্বে খৈয়াছড়া ঝরনার অবস্থান। মহামায়ায় প্রবেশ করার আগেই দূর থেকে দেখা যায় প্রায়
পাহাড়সম বাঁধ। উভয় পাশে শুধু পাহাড় আর পাহাড়। বাঁধের ধারে অপেক্ষমাণ সারি সারি ডিঙি নৌকা আর ইঞ্জিনচালিত বোট। ১১ বর্গকিলোমিটার আয়তনের লেক কেবল শোভা ছড়াচ্ছে। পাহাড়ের কোলঘেঁষে স্বচ্ছ পানিতে তাকালে দেখা যায় নীল আকাশ। পূর্বদিকে সারি পাহাড়ের বুক চিরে যেতে যেতে একসময় হারিয়ে যেতেও মন চাইবে কল্পনায়। সঙ্গে
পরিবার-পরিজন ও বন্ধুবান্ধব নিয়ে গেলে তো কথাই নেই। বোটে যেতে যেতে হ্রদের শেষ প্রান্তে দেখা মিলবে পাহাড়ের কান্না।
নান্দনিক সৌন্দর্যের আরেক নাম খৈয়াছড়া ঝরনা। প্রকৃতির অপরূপ সৃষ্টি সেতুবন্ধ ও সবুজের চাদরে ঢাকা বনানীর মাঝে ঝুমঝুম শব্দে বয়ে চলছে এই ঝরনাটি। ঝরনাধারায় গা ভিজিয়ে যান্ত্রিক জীবনের অবসাদ থেকে নিজেকে ধুয়ে সজীব করে তুলতে পারেন। এছাড়া রাতে চাঁদের আলোয় ঝরনার অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে পাহাড়ের পাদদেশে তাঁবু টানিয়ে অবস্থানও করতে পারেন। দেশের অন্যতম বৃহৎ আট স্তরের এই প্রাকৃতিক ঝরনাটি দেখতে প্রতিদিন ছুটে আসেন হাজার হাজার
দেশি-বিদেশি পর্যটক। উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নের বড়তাকিয়া বাজারের উত্তর পাশে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ৪.২ কিলোমিটার পূর্বে ঝরনার অবস্থান। এর মধ্যে এক কিলোমিটার পথ গাড়িতে যাওয়ার পর বাকি পথ যেতে হবে হেঁটে। বাঁশের সাঁকো, ক্ষেতের আইল, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ, ছড়া এবং অন্তত চারটি পাহাড় পেরিয়ে এই ঝরনার যেতে হবে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বড় কমলদহ বাজার থেকে দুই কিলোমিটার পূর্বে গেলে আরও একটি ঝরনা দেখতে পাবেন। এটি বাওয়াছড়া ঝরনা। মিরসরাই উপজেলার ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের বাওয়াছড়া পাহাড়ি এলাকায় যুগ যুগ ধরে ঝরনাটি প্রবাহিত হচ্ছে। এর অপরূপ দৃশ্য পর্যটকদের নজর কেড়েছে।
মুহুরীর চরে চলে জল আর রোদের খেলা। এপারে মিরসরাই, ওপারে সোনাগাজী। ৪০ দরজার রেগুলেটরের শোঁ শোঁ আওয়াজ শোনা যায় দূর থেকে। পশ্চিমে মৎস্য আহরণের খেলা, আর পূর্বে মনকাড়ানো প্রকৃতি। এখানে দেখা মিলবে সাদা সাদা বকের। চিকচিকে বালুতে জল আর রোদের খেলা চলে সারাক্ষণ। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের (পুরোনো) জোরারগঞ্জ বাজারে নেমে ধরতে হবে সংযোগ সড়কের পথ। প্রায় আট কিলোমিটার ভাঙাচোরা আঁকাবাঁকা আধাপাকা সড়ক পাড়ি দিতে হবে। এরপর মুহুরী প্রকল্পের বাঁধ। যেতে যেতে দুই কিলোমিটার পরই দেখা মিলবে আসল সৌন্দর্যের মুহুরী প্রজেক্ট। এছাড়া সময় পেলে যেতে পারেন সীতাকুণ্ড ইকো পার্ক ও নাপিত্তা ছড়া ঝরনায়।