সুস্বাস্থ্য

মহামূল্যবান জীবন সচেতন হোন, সযতনে রাখুন

পীড়াদায়ক ও প্রাণঘাতী রোগের একটি ডেঙ্গু। মশার কামড়ে রোগটি ছড়ায়। আজ মশা ও ডেঙ্গু প্রতিরোধে কয়েকটি বিষয় তুলে ধরা হলো

মশা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশের কারণে হাসিঠাট্টার পাত্র হননি এমন মানুষ হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। দূর কিংবা কাছের মানুষের কাছে ব্রাত্য হয়েছেন অনেকে। হালকা সেজেছেন। এভাবে চলতে চলতে একসময় মশা নিয়ে কথা বলা বাদই দিয়েছেন। সেই মশা নিয়েই মশাইরা এখন আতঙ্কিত। অথচ মহামূল্যবান জীবন সযতনে রাখতে, একে রক্ষায় প্রাণঘাতী যে কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলা উচিত। একে অন্যের সঙ্গে তথ্য বিনিময় করা উচিত। ২০১৯ সালে এসেও যদি না বুঝতে পারেন, তাহলে উজ্জ্বল জীবন হেলায় নষ্ট হতে পারে। এসব কারণে প্রাণঘাতী মশাকে আর হেলা নয়। এর অপকারিতা সম্পর্কে নিজে জানুন, অপরকে জানান।
মশার কামড়ে এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকে। তাই ডেঙ্গু থেকে বাঁচার উপায় সম্পর্কে জানুন।
# ডেঙ্গু থেকে বাঁচার প্রথম ও প্রধান উপায় মশার বংশ ধ্বংস করা
# আবৃত থাকতে হবে। হাত ও পা মশার সবচেয়ে সহজ লক্ষ্য। তাই ঘরে-বাইরে যেখানেই থাকুন, কাপড়ে আবৃত থাকার চেষ্টা করুন। এজন্য ফুল প্যান্ট, ফুলহাতা শার্ট, জুতা প্রভৃতি দিয়ে শরীর ঢেকে রাখতে হবে। তবে গরমে আঁটোসাঁটো পোশাকের পরিবর্তে ঢিলেঢালা কাপড় পরাই উত্তম। আরাম পাবেন
# পানি যেন বদ্ধ হয়ে না থাকে, সেদিকে নজর দিতে হবে। মশার বংশবিস্তারের আদর্শ স্থান জমে থাকা পানি। বৃষ্টির দিনে এমনিতেই জলাবদ্ধতা বাড়ে। ফলে মশার বংশবিস্তারের স্থানও বাড়ে। তাই মশার উপদ্রব থেকে বাঁচতে যেসব জায়গায় পানি জমে থাকতে পারে, সেগুলো পরিষ্কার করে ফেলুন। পাশাপাশি গাছে বেশি পানি দেওয়া থেকে বিরত থাকুন
# মশা তাড়ানোর জন্য গাছ রোপণ করুন। মশা দূরে রাখে এমন গাছ যেমন তুলসি, সিট্রোনেলা, লেমনগ্রাস প্রভৃতি রোপণ করতে পারেন। মশা তাড়ানোর কার্যকর ও স্বাস্থ্যকর উপায় এ ধরনের গাছ লাগানো
# ময়লা রাখার পাত্র প্রতিদিন পরিষ্কার করুন। ব্যবহারের সময় পাত্রগুলো ঢেকে রাখতে হবে। জীবাণু ভরা ময়লা পাত্র মশা টানে। একই সঙ্গে ঘরের কোণা, ছায়াবৃত স্থান, বাগান নিয়মিত পরিষ্কার রাখুন
# মশা তাড়ানোর ওষুধ ব্যবহার করুন। স্প্রে, মলম প্রভৃতি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিন। ঘরে কিংবা বাইরে সবখানেই এগুলো ব্যবহার করা উচিত
# ভোর ও সন্ধ্যায় যেন মশা কামড়াতে না পারে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে
# রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ান। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুন। তাহলেই রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে এবং সব ধরনের রোগবালাই থেকে দূরে থাকতে পারবেন।

চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয়: খাবারগুলো প্লাটিলেট বাড়ায়
ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক এডিস ইজিপ্টি। এ মশার কামড়ে রক্তের প্লাটিলেট কমে যায়। ফলে অনেক সময় কোনো আঘাত ছাড়াই রক্তক্ষরণ হতে থাকে। তবে খাদ্যাভ্যাস সুস্বাস্থ্যকর হলে প্লাটিলেটের সংখ্যা স্বাভাবিক থাকে। কিছু খাবার আছে, যেগুলো প্লাটিলেট বৃদ্ধিতে সহায়তা করে থাকে। দেখে নিতে পারেন এগুলো:
পেঁপে ও এর পাতা: পেঁপে খুব দ্রুত রক্তে প্লাটিলেটের পরিমাণ বাড়াতে সক্ষম। মালয়েশিয়ার এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির এক গবেষণায় দেখা গেছে, ডেঙ্গু জ্বরের কারণে প্লাটিলেটের পরিমাণ কমে গেলে পেঁপে পাতার রস তা দ্রুত বৃদ্ধি করে। রক্তে প্লাটিলেটের পরিমাণ কমে গেলে প্রতিদিন পেঁপে পাতার রস কিংবা পাকা পেঁপের জুস খাবেন। ডেঙ্গু জ্বরে ভীষণ উপকারী এটি।
দুধ: দুধে ক্যালসিয়াম রয়েছে যা হাড় শক্তিশালী ও বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয়। দুধ রক্তের প্লাটিলেট জন্মাতে সহায়তা করে। এছাড়া দুধে ভিটামিন ‘কে’ রয়েছে, যা সঠিকভাবে রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে। তাই ডেঙ্গু জ্বরের রোগীকে দুধ খাওয়াতে হবে।
গাজর: আমরা জানি, চোখের দৃষ্টি রক্ষা ও উন্নতিতে গাজরের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু অনেকেই হয়তো জানেন না যে, গাজর রক্তের প্লাটিলেট স্বাভাবিক রাখতে বেশ কার্যকর। তাই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের জন্য গাজর খুব ভালো কাজ করবে।
শিমের বীজ: শিমের বীজ ও মটরশুঁটিতে ভিটামিন ‘বি৯’ রয়েছে, যা রক্তের প্লাটিলেট স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া ‘বি৯’ সমৃদ্ধ অন্যান্য খাবার এবং পালংশাকও খাওয়া উচিত।
ডালিম: ডালিম রক্তে প্লাটিলেটের পরিমাণ বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। এতে প্রচুর আয়রন রয়েছে, যা প্লাটিলেট বৃদ্ধি করে থাকে। প্রতিদিন খাবারের তালিকায় ডালিম রাখতে পারেন। নিয়মিত দুই সপ্তাহ খেলে দুর্বলতা দূর করে দেহে শক্তির জোগান দেবে।
আমলকী: আমলকীতেও রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘সি’। এছাড়া এতে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। ফলে এ ফল খেলে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। এছাড়া প্লাটিলেট ধ্বংস হওয়া থেকে রক্ষা করে। তাই ডেঙ্গু জ্বর হলে আমলকী খাওয়া আবশ্যক।
লেবুর রস: লেবুর রসে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন ‘সি’ থাকে। ভিটামিন ‘সি’ রক্তে প্লাটিলেট বাড়াতে সহায়তা করে। এছাড়া এ ভিটামিন রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে। সুতরাং এ সময় বেশি করে লেবুর রস খেতে হবে।
অ্যালোভেরার রস: অ্যালোভেরা রক্তকে বিশুদ্ধ করে। রক্তের যে কোনো সংক্রমণ দূর করতে অ্যালোভেরা উপকারী। তাই নিয়মিত অ্যালোভেরার জুস খেলে রক্তের প্লাটিলেটের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।
মিষ্টিকুমড়ো: মিষ্টিকুমড়ো রক্তের প্লাটিলেট তৈরিতে বেশ কার্যকরী। এছাড়া এতে রয়েছে ভিটামিন ‘এ’, যা প্লাটিলেট তৈরিতে সহায়তা করে। তাই রক্তের প্লাটিলেটের সংখ্যা বাড়াতে নিয়মিত মিষ্টিকুমড়ো খেতে হবে। মিষ্টিকুমড়োর বীজও বেশ উপকারী।

সতর্ক হতে হবে
পীড়াদায়ক একটি রোগ ডেঙ্গু। এতে আক্রান্ত রোগী দুর্বল হয়ে পড়ে। এর রেশ শরীরে থেকে যায় দীর্ঘদিন। চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে এ রোগ থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
এডিস মশা ডেঙ্গুর জন্য দায়ী। সাধারণত বদ্ধ পরিষ্কার পানি, ফুলের টব, টায়ার ও এয়ারকুলারে জমা পানি থেকে এ মশাটি বিস্তৃতি লাভ করে। এ মশা থেকে চার ধরনের ভাইরাস মানবদেহে আসতে পারে। শহরাঞ্চলের অভিজাত এলাকা ও বড় বড় দালানকোঠায় এ মশার প্রাদুর্ভাব বেশি চোখে পড়ে।
মে থেকে সেপ্টেম্বর বিশেষ করে গরম ও বর্ষার সময়টিতে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ বেশি থাকে। শীতকালে এ জ্বর হয় না বললেই চলে। তবে শীতে লার্ভা অবস্থায় এডিস মশা দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে পারে। বর্ষার শুরুতে সেগুলো থেকে নতুন করে ডেঙ্গু ভাইরাসবাহিত মশা বিস্তারলাভ করে।

লক্ষণ
# তীব্র জ্বর
# সারা দেহে প্রচণ্ড ব্যথা
# হাড়, কোমর, পিঠসহ অস্থিসন্ধি ও মাংসপেশিতে ব্যথা
#মাথাব্যথা ও চোখের পেছনে ব্যথা হয়
# জ্বর হওয়ার চার বা পাঁচ দিনের মাথায় শরীরজুড়ে লালচে দানা দেখা যায়, যাকে বলা হয় স্কিন র‌্যাশ। এগুলো অনেকটা অ্যালার্জি বা ঘামাচির মতো
# বমি বমি ভাব, এমনকি বমি হতে পারে
# ক্লান্তিবোধ
# রুচি কমে যাওয়া

চিকিৎসা
# চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলতে হবে
# এ জ্বরের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই
# জ্বর সাধারণত নিজে নিজেই ভালো হয়ে যায়। তাই উপসর্গ অনুযায়ী সাধারণ চিকিৎসাই যথেষ্ট তবে…
# শরীরের যেকোনো অংশ থেকে রক্তপাত হলে
# প্লাটিলেটের মাত্রা কমে গেলে
# শ্বাসকষ্ট বা পেট ফুলে পানি এলে
# প্রস্রাবের পরিমাণ কমে গেলে
# জন্ডিস দেখা দিলে
# অতিরিক্ত ক্লান্তি বা দুর্বলতা দেখা দিলে
# প্রচণ্ড পেটব্যথা বা বমি হলে
চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকতে হবে।

সাবধানতা
# ব্যথানাশক কোনো ওষুধ গ্রহণ করা যাবে না
# পরিপূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হবে

১০০টির বেশি দেশে…
গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে ডেঙ্গুর মারাত্মক প্রভাব রয়েছে। বৃষ্টি, তাপমাত্রা ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ এর জন্য দায়ী। ২০০০ সালে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর আগমন ঘটে। একবার কোনো দেশে এ রোগ ঢুকলে সহজে বের হয় না। ধারণা করা হয়, আফ্রিকার জঙ্গল থেকে এ রোগের বাহক এডিস মশার বিস্তৃতি ঘটেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ১২৮ দেশের মানুষ ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে। অঞ্চলগুলোর মধ্যে রয়েছে:
# ভারতীয় উপমহাদেশ
# দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া
# দক্ষিণ চীন ও তাইওয়ান
# প্যাসিফিক দ্বীপপুঞ্জ
# ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ
# আফ্রিকা
# উত্তর আমেরিকার মেক্সিকো
# দক্ষিণ আমেরিকা (চিলি ও প্যারাগুয়ে ব্যতীত)
ডেঙ্গু মহামারি
# ডেঙ্গু মহামারির রূপ নেয় ১৭৭৯ সালে, ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা ও মিসরের কায়রোয়
# ১৭৮০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায়
# বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ, হংকং, গ্রিস ও অস্ট্রেলিয়ায়
# ১৯৮১ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রায় সাত লাখ মানুষ আক্রান্ত হয়, মারা যায় প্রায় ৯ হাজার মানুষ
# ১৯৮৭ সালে ভিয়েতনামে
# বাংলাদেশে প্রথম আসে ১৯৬৪ সালে
# আরেকটি জরিপে জানা যায়, ১৯৭০ সালের আগে মাত্র ৯টি দেশ ডেঙ্গু মহামারির
শিকার হয়
# ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে ফ্রান্স ও ক্রোয়েশিয়ায় ২০১০ সালে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ে

দেখতে যেমন

এডিস এজিপ্টি ও এডিস এলবো পিকটাস নামের মশা ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক। প্রথমটি থাকে শহরে, দ্বিতীয়টি গ্রামে।
এডিস মশা দেখতে নীলচে কালো বর্ণের। এদের গায়ের ওপর সাদা ছোপ ছোপ দাগ রয়েছে। এরা মাটির সঙ্গে সমান্তরালভাবে বসে থাকে।

সর্বশেষ..



/* ]]> */