মহাসড়কটি কী করে বইবে এত ব্যয়ভার?

গতকালের শেয়ার বিজে ছাপা ‘প্রকল্প ব্যয় ছাড়িয়ে যাচ্ছে ১০ হাজার কোটি টাকা’ শীর্ষক খবরটি অনেক পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে বলেই আমাদের বিশ্বাস। প্রতিবেদক জানাচ্ছেন, আনুমানিক ছয় হাজার ৮৫২ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয় ধরে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা ৫৫ কিলোমিটার চার লেন নির্মাণ প্রকল্প সংশোধন করা হয়েছিল ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে। এখন নাকি আবার প্রকল্প ব্যয় সংশোধন করতে হবে। সে ক্ষেত্রে ব্যয় ১০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে তথ্য দিয়েছেন আমাদের প্রতিবেদক। ব্যয়টি নানা কারণেই প্রশ্নবিদ্ধ। প্রথমত, ৫৫ কিলোমিটার চার লেনের জন্য যদি ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়, তাহলে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় দাঁড়াচ্ছে আনুমানিক ১৮৩ কোটি। তার মানে, ঢাকা-এলেঙ্গা চার লেন প্রকল্পের (যার প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০ কোটি টাকার কাছাকাছি) চেয়েও আলোচ্য প্রকল্পের ব্যয় তিনগুণ বেশি। এদিকে দেখা যাচ্ছে, ইউরোপে প্রতি কিলোমিটার চার লেন নতুন করে নির্মাণে ইদানীং ব্যয় হচ্ছে ২৮ কোটি টাকা; এশিয়া মহাদেশের চীন ও ভারতে এ ব্যয় যথাক্রমে ১৩ ও ১০ কোটি টাকা। এর অর্থ, নতুন করে চাওয়া অর্থে প্রকল্পটির নির্মাণ সম্পন্ন হলে ঢাকা-মাওয়া চার লেন হবে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল মহাসড়ক। আমাদের জানামতে, এ মহাসড়কের নির্মাণসামগ্রীতে প্লাটিনাম বা স্বর্ণজাতীয় কোনো মূল্যবান ধাতু নেই। সড়কটির অবস্থানও এমন কোনো প্রতিকূল পরিবেশেও নয় যে, চাহিত বরাদ্দটি যুক্তিসংগত বলে প্রতীয়মান হয় বা হতে পারে। সত্যি বলতে, স্থানীয় বা আন্তর্জাতিক কোনো অর্থনৈতিক পরিস্থিতিই উক্ত ব্যয় সমর্থন করে না বলে মনে করেন বোদ্ধারা। এ অবস্থায় সড়কটির নির্মাণ সম্পন্ন করতে কেন আলোচ্য পরিমাণ বরাদ্দই লাগবে, সেটি ভালো করে খতিয়ে দেখা জরুরি।

এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টরা ছয়টি কারণ দেখিয়েছেনÑপ্রকল্পের কর্মপরিধি বৃদ্ধি, উপকরণ ব্যয় ক্ষেত্রবিশেষে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি, ফাউন্ডেশন ও মাটির সক্ষমতা বাড়াতে অতিরিক্ত বরাদ্দ, আয়কর ও ভ্যাট, জমি অধিগ্রহণের পরিমাণ বৃদ্ধি ও পরিষেবা সংযোগ লাইন (ইউটিলিটি) প্রতিস্থাপন খাতে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তা। লক্ষণীয়, উল্লিখিত খাতগুলোর মধ্যে কয়েকটিতে অর্থের প্রয়োজনীয়তা সহজেই হ্রাস করা সম্ভব; বিশেষত আয়কর ও ভ্যাটের বেলায়। তবে কারও কারও মতে, সে পরামর্শ দেওয়া কঠিনÑযেহেতু আলোচ্য ভ্যাট ও আয়করের বিষয়টি সার্বিকভাবে দেশের রাজস্বনীতির সঙ্গে যুক্ত। এক্ষেত্রে বরং চিহ্নিত করা উচিত, আয়কর-ভ্যাট বাদে অন্য কোন কোন খাত থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ব্যয় কর্তন সম্ভব। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আসলেই ওই পরিমাণ জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে কি না কিংবা অধিগ্রহণ করা জমির দাম চলতি দামের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কি না প্রভৃতির কথা। আবার ভালো হতো ইউটিলিটি প্রতিস্থাপনের মতো কাজ ভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে করা গেলে। কেননা প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে গিয়ে কিলোমিটারপ্রতি সত্য সত্যই ১৮৩ কোটি টাকা গুনতে হলে শেষ পর্যন্ত তার দায় বহন করতে হবে যাত্রীদের। অথচ এখানে ইউটিলিটিগুলোর সুফলভোগকারীদের সঙ্গে পথটি ব্যবহারকারী যাত্রীদের প্রত্যক্ষ সংযোগ স্থাপন কঠিন। এও অস্বীকার করা যাবে না, কাজগুলো যেহেতু পরস্পর সম্পর্কযুক্ত তাই সবচেয়ে ভালো হয় প্রকল্পের কর্মপরিধি বাড়িয়ে ইস্যুগুলো একত্রে অ্যাড্রেস করা গেলে। আমরা চাইব, ইস্যুগুলো একত্রে ও আলাদা আলাদাভাবে বিশ্লেষণপূর্বক কস্ট-বেনিফিট অ্যানালাইসিস করা হোক। অতঃপর উভয় অ্যানালাইসিসের তুলনামূলক মূল্যায়ন থেকে ঢাকা-মাওয়া চার লেন প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি প্রসঙ্গে একটা যথাযথ সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব বলে আমরা মনে করি। অন্যথায় মহাসড়কটির পক্ষে আলোচ্য ব্যয়ভার বহন কঠিন হয়ে দাঁড়াবে বৈকি।