মত-বিশ্লেষণ

মানব পাচার প্রতিরোধ করতে হবে এখনই

মো. সাজেদুল ইসলাম: মানুষ নিয়ে বাণিজ্যের এমন একটি রূপ মানব ও শিশু পাচার এবং এর উদ্দেশ্য দাসত্ব, জোরপূর্বক শ্রম, বাধ্যতামূলক শোষণমূলক শ্রম ও অঙ্গ পাচারের মতো কার্যকলাপের মাধ্যমে মুনাফা অর্জন। এটি ব্যক্তিঅধিকার হরণ করে ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং শারীরিক ও মানসিক স্বাধীনতা হরণ করে। মানব পাচার একটি বড় সমস্যা। এশিয়ার অন্য দেশগুলোর মতো বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। পাচারের শিকার ব্যক্তিরা সাধারণত মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে বন্দি থাকে এবং তাদের দ্বারা শোষিত হয়।
মানব পাচার প্রতিরোধ ও প্রতিকারের বিষয়টিকে বাংলাদেশ সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা নিচ্ছে সরকার। ইদানীং নারী ও শিশু পাচারের সঙ্গে শ্রম-শোষণের উদ্দেশ্যে পুরুষের পাচারও বেড়ে গেছে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি পুরুষ চাকরির মিথ্যা আশ্বাসে বিদেশে পাড়ি জমায় এবং জবরদস্তি শ্রমের মতো ভয়াবহ শোষণের মুখোমুখি হয়। সাধারণভাবে প্রান্তিক জনগণ ছাড়াও নারীর প্রতি অবিরাম বৈষম্য ও বঞ্চনা এবং জীবন-জীবিকার নিরাপত্তাহীনতা ওতপ্রোতভাবে পাচার সমস্যার সঙ্গে জড়িত।
জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ২০১২ মতে, ‘পাচারের শিকার ব্যক্তিদের অনেকেই ভালো চাকরি বা বিয়ের মিথ্যা আশ্বাসের প্রলোভনে পড়ে। কাউকে কাউকে অপহরণ করে কিংবা জোর বা বলপ্রয়োগ করে অথবা ভীতি প্রদর্শন করে পাচার/কেনাবেচা করা হয়, অথবা ঋণদাস হিসেবে ব্যবহার করা হয়। নারী ও কিছু শিশু পাচার হয় তাদের অভাবগ্রস্ত পরিবারের নীরব সম্মতিতে।’ অভ্যন্তরীণ পাচারের ক্ষেত্রে নারী ও শিশুরা উন্নত জীবন ও কাজের বা বিবাহের মিথ্যে প্রলোভনের শিকার হয়ে পাচারকারীদের হাতে পতিত হয়। পাচারকারীরা তাদের ভিক্ষাবৃত্তি বা আগাম শ্রম বিক্রির মাধ্যমে ইটের ভাটার মতো কষ্টসাধ্য কাজে জোরপূর্বক নিয়োজিত করে।
গ্রামাঞ্চলের প্রান্তিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা মঙ্গার মতো মানবিক বিপর্যয়ের শিকার পরিবারগুলো পাচারকারীদের সহজ শিকারে পরিণত হচ্ছে। আন্তঃসীমান্ত পাচারের শিকার নারী-পুরুষ ও শিশুদের গন্তব্য গ্রাম থেকে শহরের পরিবর্তে ভারত, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। আন্তর্জাতিক পাচারের ক্ষেত্রে পুরুষরাও সমভাবে ঝুঁকির মধ্যে থাকে। শ্রম অভিবাসনের আড়ালে মানব পাচার কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে থাকে।
ভারতের ক্ষেত্রে স্থলপথ ব্যবহৃত হলেও আন্তর্জাতিক মানব পাচারের ক্ষেত্রে স্থলপথ, জলপথ ও আকাশপথ এবং গন্তব্যের পাশাপাশি বিভিন্ন অন্তর্বর্তী দেশ (ট্রানজিট কান্ট্রি) ব্যবহৃত হয়ে থাকে। গত পাঁচ বছরে সাত হাজার ৫২০ জন বাংলাদেশি নাগরিক পাচারের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ছয় হাজার ৪৫ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। লক্ষণীয় যে, শ্রম অভিবাসনের ক্ষেত্রে নিয়োগ পত্র, ভিসা ও টিকিট আইনসম্মত হলেও গন্তব্যে পৌঁছে আমাদের দেশের নাগরিকরা উপলব্ধি করেন যে, তারা যে কাজের লক্ষ্যে এসেছেন তার বদলে স্বল্প বেতনে বা বিনা বেতনে অন্য কোনো শোষণমূলক কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
উপরন্তু, সামাজিক বৈষম্য ও কুৎসার শিকার হওয়ার ভয়ে, অপরাধীদের হুমকির মুখে ও আইনি বিষয়ে অসচেতন হওয়ায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পাচারের শিকার ব্যক্তি ও তার পরিবারবর্গ আইনগত মামলার প্রক্রিয়া এড়িয়ে যান। এর ফলে পাচার সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। পাচারকারীদের গ্রেফতার ও পাচারের শিকার ব্যক্তিদের আইনি সুবিচার প্রদান করাও সম্ভব হয় না। মানব পাচার প্রতিরোধে আইন ও নীতিমালা থাকার পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকার জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (২০১৮-২০২২) গ্রহণ করেছে।
মানব পাচার দমনে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বাংলাদেশে সীমান্তের ভেতরে ও বাইরে মানব পাচার দমনে বিভিন্ন পক্ষের কার্যাবলি সুনির্দিষ্ট করেছে। এতে মানব পাচারকে একটি সমাধানযোগ্য সমস্যা হিসেবে দেখা হয়েছে। মানব পাচার কঠোরভাবে দমনে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২ প্রণয়ন করা হয়েছে। মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন; পাচারকারীদের বিচার এবং পাচারের শিকার ব্যক্তিদের পুনর্বাসন; সেবা প্রদান এবং নিরাপত্তা বিধানের জন্য সবচেয়ে সমন্বিত আইনি কাঠামো বলে বিবেচিত। মানব পাচার দমন ও প্রতিরোধ আইন ২০১২ অনুযায়ী, পাচার-অপরাধের জন্য কঠিন শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে (সুসংঘটিত/সংঘবদ্ধ পাচারের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড, অন্যান্য ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড); আনুষঙ্গিক অপরাধের জন্যও শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
এ আইনের অধীনে জাতীয় মানব পাচার দমন সংস্থা, মানব পাচার প্রতিরোধ তহবিল ও মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল রয়েছে যেখানে পাচারের মামলা তদারকি, পাচারকারীর বিচার ও শাস্তির পাশাপাশি পাচারের শিকার ব্যক্তির অধিকার রক্ষা: ভিকটিমকে খুঁজে বের করা, উদ্ধার, প্রত্যাবাসন, পুনর্বাসন, আশ্রয়নিবাস প্রতিষ্ঠা, ভিকটিমকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া, ভিকটিমের গোপনীয়তা এবং মর্যাদা রক্ষা করা, পুনরায় পাচাররোধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তার তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত করা প্রভৃতির বিধান রয়েছে।
জাতীয় মানব পাচার দমন সংস্থা পাচারের শিকার ব্যক্তিকে চিহ্নিতকরণ, পুনর্বাসন ও সুরক্ষার লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় সাধন করে থাকে, পাচারের শিকার ব্যক্তিদের সেবা প্রদানকারী বেসরকারি সংস্থাসমূহের কার্যক্রম পরিদর্শন, তদারকি এবং প্রয়োজনে নিদের্শনা, পরামর্শ ও সহায়তা প্রদানের বিধান রাখা হয়েছে। মানব পাচার প্রতিরোধ তহবিল মানব পাচারের শিকার ব্যক্তিসহ সংশ্লিষ্টদের আর্থিক সহায়তা প্রদান, মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন সম্পর্কিত অন্যান্য খরচ বহন করবে এবং এটি পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা জাতীয় মানব পাচার দমন সংস্থার ওপর ন্যস্ত থাকবে।
মানব পাচার আইনের পাশাপাশি বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসন আইন (২০১৩) এবং শিশু আইন (২০১৩) মানব পাচার প্রতিরোধে একটি আইনি সুরক্ষা বলয় গড়ে তুলেছে। আন্তর্জাতিক মহলের কাছে পাচার দমনে বাংলাদেশ অঙ্গীকারবদ্ধ। বাংলাদেশ ১৯৯৬ সালে স্টকহোমে অনুষ্ঠিত শিশুদের বাণিজ্যিক শোষণের বিরুদ্ধে প্রথম বিশ্ব কংগ্রেসে এবং ১৯৯৫ সালে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনে অংশ নিয়েছে এবং বেশ কিছু মৌলিক মানবাধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষর ও অনুস্বাক্ষর করেছে।
দায়-দায়িত্বের বিচারে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ২০০৮ ছাড়াও নারী ও শিশু পাচার প্রতিরোধ ও দমনে সার্ক কনভেনশন ২০০২সহ আরও কিছু আন্তর্জাতিক দলিলে অনুসমর্থনকারী হিসেবে বাংলাদেশ নারী ও শিশু পাচার বন্ধে এবং পাচার অপরাধের কার্যকর বিচার করতে দায়বদ্ধ। আরও যেসব মানব পাচার-সংক্রান্ত সহায়ক চুক্তি বাংলাদেশ অনুস্বাক্ষর করেছে তা হলো দাসত্ব, দাসব্যবস্থা এবং দাসত্বের অনুরূপ সব ব্যবসায় বিলোপ-সংক্রান্ত জাতিসংঘের সম্পূরক সনদ, ১৯৫৬। পাচার প্রতিরোধে গণসচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি গণমাধ্যম ও অন্যান্য সংশ্লিষ্টরা এগিয়ে এলে পাচার প্রতিরোধে দ্রুত ফলাফল পাওয়া যাবে।

পিআইডি নিবন্ধ

সর্বশেষ..



/* ]]> */