সুস্বাস্থ্য

মানসিক রোগ অটোফ্যাজিয়া

মানুষের মস্তিষ্কে লুকিয়ে থাকা অন্যতম মারাত্মক একটি মানসিক রোগ ‘অটোফ্যাজিয়া’। এ রোগে আক্রান্ত মানুষদের মানসিক অবস্থা ভৌতিক কাহিনির মতোই হয়ে থাকে। অদ্ভুত সব আচরণ করতে দেখা যায় তাদের। এটি মূলত এমন একটি সমস্যা, যা মানুষের বোধশক্তির তারতম্যের ওপর নির্ভর করে জন্ম নেয়।
একজন অটোফ্যাজিয়া রোগীর স্থায়ী অনুভবশক্তি বলে কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। ফলে এ রোগে আক্রান্তকারীরা নিজের শরীরকে কামড় দিয়ে ব্যথা দিতে বেশ পছন্দ করে। যতক্ষণ না ব্যক্তিটি নিজের মাংস বের করতে পারছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে মানসিক প্রশান্তি লাভ করে না। এমনকি সে তার নিজের অঙ্গচ্ছেদ করে তা রান্না করে খেতেও মানসিক প্রশান্তি পেয়ে থাকে। অটোফ্যাজিয়া যখন উচ্চতর লেভেলে পৌঁছায় তখন মানুষ নিজেকে খেতেও দ্বিধাবোধ করে না। তাদের কাছে ব্যাপারটা এমন, তারা মনে করে তাদের বেঁচে থাকার জন্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের প্রয়োজন নেই। তবে আক্রান্তদের মধ্যে সবাই এ রকম ভয়ংকর কাজ করে না। খুব অল্প ব্যক্তিই ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
দেখা যায়, অনেকে সিদ্ধান্তহীনতার কারণে কিংবা কিছু খুঁজে পায় না বলে নিজের নখ খুঁটতে শুরু করে। নখ খুঁটা পর্যন্ত ঠিকঠাক, কিন্তু হুট করে একদিন নখ খুঁটতে খুঁটতে কোনো কারণে রাগ সংবরণ করতে না পেরে আঙুলে কামড়ে ফেলে। শুধু তা-ই নয়, আঙুলে কামড় বসিয়ে সেখান থেকে চামড়া তুলেও ক্ষান্ত হয় না। তারপর হঠাৎ একদিন মনে হবে, তার বাঁ হাতটার কোনো প্রয়োজন নেই। তাই সেটাতে কামড়ে কামড়ে মাংস উঠিয়ে ফেলে। তারপর ধীরে ধীরে পা ও শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থেকে শুরু করে একদিন নিজেকেই খেয়ে ফেলে। শুনতে অবাক লাগলেও এটিই অটোফ্যাজিয়া।
মানসিক চাপ বা অতিরিক্ত টেনশন, নিজের প্রতি ঘৃণা, নিজের কৃতকর্মের জন্য নিজেকে শাস্তি দেওয়ার চিন্তা, কিংবা কোনো কারণে মস্তিষ্কের টিস্যুগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাওয়া প্রভৃতি অটোফ্যাজিয়া হওয়ার কারণ হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা এমন ধারণা করছেন। অর্থাৎ এখানে আবেগপ্রবণতাই কাজ করে বেশি। কিন্তু অটোফ্যাজিয়ার নির্দিষ্ট কোনো লক্ষণ নেই বললেই চলে। এ রোগের লক্ষণ বেশি দেখা যায় বৃদ্ধদের মধ্যেই।
কয়েক বছর আগে আমেরিকার এনসিবিআইয়ে (ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন) একটি কেস নথিভুক্ত করা হয়। এতে দেখা যায়, ৬৬ বছরের এক বৃদ্ধ প্রায় ছয় বছর ধরে তার আঙুল কামড়ে এমন পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন যে, তার দুই হাতের হাড়গুলো পর্যন্ত সেখানে না থাকার মতো অবস্থা। যদিও স্বাভাবিকভাবে আঙুল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ছাড়া তেমন কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। পরে টমোগ্রাফিক স্ক্যান দিয়ে তার মস্তিষ্কের ক্ষয়িষ্ণুতা শনাক্ত করা হয়। চিকিৎসকরা বলেছিলেন, আত্মক্লেষ, আবেগপ্রবণতা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা থেকেই এটি শুরু হয়েছিল তার মধ্যে।
গবেষকরা গবেষণা করে দেখেছেন, যেহেতু অটোফ্যাজিয়ার নির্দিষ্ট কোনো লক্ষণ বের করা অসম্ভব, তাই নিজেদের জীবনাচরণে মনোযোগী হওয়া উচিত। নিজের শরীরের ক্ষতি হয় এমন কোনো কাজ করা উচিত নয়। এমনকি নখ খোঁটা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং এ কাজ থেকে অন্যদেরও নিরুৎসাহিত করতে হবে। যদি নিজেকে সংযত করতে ব্যর্থ হোন, তাহলে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের সাহায্য নিতে হবে।

 

সর্বশেষ..