মানুষকে প্রযুক্তি নয়, মানুষই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করুক

ফারিহা হোসেন: বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সভ্যতার চাকা একই সুতোয় গাঁথা। এখন জীবনকে গতিময় করে তুলতে মোবাইল ফোনের মতো বিভিন্ন উপকরণ অপরিহার্য। এসব ছাড়া উন্নত জীবন ও সভ্যতা যেন কল্পনারও অতীত। প্রযুক্তির নিত্যনতুন উদ্ভাবনে প্রতি মুহূর্তে জীবন বদলে যাচ্ছে। এখন প্রশ্ন মানুষ প্রযুক্তিকে পরিচালনা করবে, নাকি প্রযুক্তিই মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করবে? না, মানুষের জন্য প্রযুক্তি হলেও মানুষ প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণে এনে জীবনকে সুন্দর করবে। সতর্কতার সঙ্গে প্রযুক্তির প্রয়োগ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে পথ চলা ও উন্নতি সাধনে যতটুকু প্রয়োজন এর সুফল ততটুকুই গ্রহণ করা উচিত। প্রযুক্তির বিশাল সাম্রাজ্যে ‘বেহিসাবি’ করে প্রযুক্তির কাছে নিজেকে সঁপে দিলে বিপর্যস্ত হতে পারে জীবন, থেমে যেতে পারে সব অর্জন, এমনকি মৃত্যুঝুঁকিও তাড়া করতে পারে।

এটি সত্য, প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের অগ্রগতির এ যুগে এর অগ্রযাত্রা থামানো যাবে না, উচিতও নয়। তবে অবশ্যই অপব্যবহার রোধ করার পাশাপাশি এর সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। মানুষ সবকিছু সহজে হাতের কাছে পেতে চায়। ইন্টারনেট প্রযুক্তি, স্মার্টফোন যোগাযোগ স্থাপনকে করেছে অতি সহজ। কী নেই মোবাইল ফোন, ইন্টারনেটে; টুইটার, ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোয়? এসবে সব তথ্যই মেলে; কিন্তু কোন তথ্য গ্রহণ করব, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কার ডাকে সাড়া দেব এসব একান্তই ব্যক্তিগত ব্যপার। তবে এ ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। এখন যেখানে-সেখানে মোবাইল ফোন; ছোট-বড় সবার হাতে। সকাল, দুপুর, বিকাল, সন্ধ্যা, রাতÑসারাক্ষণ হাতে মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যস্ত সবাই। এর চর্চায় অনেকেরই বিনিদ্র রাত কাটে। দিনের কাজে এর বিরূপ প্রভাব পড়ে। শ্রমশক্তির অপচয় হয়। কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী, নারী সবাই ব্যস্ত, এ কী কাণ্ড! বছরে একশ টাকার বই কিনবে না, কিন্তু ৫০ হাজার টাকার স্মার্ট ফোন কিনতে টাকা যেন ভূতে জোগায়!

প্রযুক্তি তো জীবনকে সহজ ও সুন্দর করার জন্য। অবশ্য এর জন্য প্রয়োজন হয় সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি। দৃষ্টিভঙ্গির কারণে প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার হতে পারে, আবার হতে পারে অপব্যবহারও। এখন এর ব্যবহারের চেয়ে অপব্যবহারও বাড়ছে সমান হারে। এটি বিপজ্জনক। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে প্রযুক্তির অপব্যবহারে।

মোবাইল ফোন এখন খুবই জনপ্রিয় একটি প্রযুক্তি। প্রতিদিনই এর গ্রাহক বাড়ছে। মানবসভ্যতার বিস্ময়কর বিকাশে বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো মোবাইল ফোন। তথ্য আদান-প্রদানে মোবাইল ফোন যুগান্তকারী বিপ্লব এনেছে। বর্তমানে কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের সমন্বিত এ মিনি সংস্করণ ছাড়া যেন এক মুহূর্তও কল্পনা করা যায় না। অতিদ্রুত বিশ্বের যেকোনো স্থানে যোগাযোগ ক্ষমতা ও নানা ধরনের সুবিধার কারণে সারা বিশ্বে মোবাইল ফোন ব্যাপক জনপ্রিয়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই। মোবাইল ব্যাংকিং দেশের একটি জনপ্রিয় মাধ্যম হয়ে উঠেছে। এটা প্রযুক্তির সুফল।

মোবাইল ফোন সংযোগদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো তরুণ-তরুণীদের আকৃষ্ট করতে নানা অফার দিয়ে থাকে। এর মধ্যে একটি হলো গভীর রাতের সাশ্রয়ী অফার। রাত জেগে তরুণ-তরুণীরা আসলে ফোনের কতটা সদ্ব্যবহার করে, তা নিয়ে গবেষণা হতে পারে। এখন তরুণী ও সম্পদশালীদের প্রতারণার ফাঁদে ফেলে সম্পদ, জীবন, সম্ভ্রম লুটে নেওয়ার কাজে মোবাইল ফোনের ব্যবহার হচ্ছে। আবার দুর্বৃত্তদের জন্যও এটি একটি মোক্ষম অস্ত্র হয়ে উঠেছে। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। সাধারণ মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করলেও এ-বিষয়ক অপকর্মগুলো সম্পর্কে তেমন সচেতন নয়। ফলে প্রায়ই কেউ না কেউ মোবাইল ফোন প্রতারণার শিকার হচ্ছে। মোবাইল ফোনে কল-মিসকল দিয়ে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা, অশালীন বার্তা পাঠানো, চাঁদাবাজি করা, হুমকি দেওয়া প্রভৃতি জনজীবনকে বিপর্যস্ত করছে। মোবাইল ফোনের এহেন অপব্যবহারে হুমকিতে পড়ছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। এ ব্যাপারে এখনই পদক্ষেপ না নিলে এ প্রবণতা আরও বাড়বে। মোবাইল ফোন জীবনে গতি আনলেও এর অপব্যবহার নিয়ে মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে এক ধরনের ভীতি। বাড়ছে আত্মহনন, নারী নির্যাতন, অশ্লীল মেমোরি কার্ড তরুণদের হাতে, আইসিটি অ্যাক্ট থামাতে পারছে না সাইবার ক্রাইম।

এ সমস্যা সমাধানে সরকারি সংস্থা, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও তথ্যপ্রযুক্তি-সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব রয়েছে। একইসঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি। গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে গ্রাহকদের সচেতন করে তোলা যায়। অভিভাবকদের খেয়াল রাখতে হবে সন্তান মোবাইল ফোন কী কাজে ব্যবহার করছে। মোবাইল ফোনের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে আমাদের জীবন ও জগৎ বর্ণিল হয়ে উঠবে।

মোবাইল ফোনের অপব্যবহারে ‘মোবাইল ভিডিও’ নামক ভয়ঙ্কর উপসর্গ ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়েছে সমাজে। এর মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য, কথোপকথন ও ভিডিওচিত্র মুহূর্তেই চলে যাচ্ছে সর্বত্র। আর এর প্রধান টার্গেট তরুণী ও নারীরা। এতে কলুষিত হচ্ছে গোটা যুবসমাজ। সহজলভ্য মোবাইল ভিডিও দিয়ে তরুণেরা প্রবেশ করছে নিষিদ্ধ জগতে। নেশা থেকে পেশাদার অপরাধীতে পরিণত হচ্ছে তারা। সম্ভ্রম হারিয়ে নারীরা বেছে নিচ্ছে আত্মহননের পথ। ভাঙছে সংসার, ধ্বংস হচ্ছে পরিবার। মোবাইল ব্যবহারের মাধ্যমে তারা মেতে উঠেছে পর্নোগ্রাফি দেখায়। তাদের কাছে পর্নোগ্রাফি মানে আধুনিকতা। কম্পিউটারের দোকান ও ইন্টারনেট থেকে এসব পর্নো ভিডিও ডাউনলোড করে খুব সহজেই দেখছে তারা।

আইসিটি অ্যাক্ট অনুযায়ী সাইবার ক্রাইমের দায়ে দণ্ডিত হলে ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। প্রকারান্তরে এ ধরনের অপরাধের কারণে যদি কারও অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়, তবে হত্যা অথবা হত্যার প্ররোচনার (ফৌজদারি কার্যবিধির ৩০২ ও ৩০৪ ধারা) অভিযোগেও অভিযুক্ত হতে পারে, যার শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ডও হতে পারে। মোবাইল ফোনের অপব্যবহার যাতে কমে সেজন্য প্রয়োজন প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর সন্তানকে মোবাইল ফোন দেওয়া এবং এর অপব্যবহার সম্পর্কে ভালোভাবে বুঝিয়ে বলা।

 

ফ্রিল্যান্স লেখক

 

[email protected]