মার্কেন্টাইল ব্যাংক: খেলাপি বাড়লেও নাজুক ঋণ আদায় পরিস্থিতি

নাজমুল ইসলাম ফারুক: মার্কেন্টাইল ব্যাংকের পর্ষদে রয়েছে দেশের কয়েকটি বড় গ্রুপের কর্ণধার। তাদের হাত দিয়ে ব্যাংকটি উন্নতির শিখরে পৌঁছানোর কথা থাকলেও হয়েছে তার বিপরীত। পর্ষদের স্বেচ্ছাচারিতা, নানা ধরনের ঋণ অনিয়ম, স্বজনপ্রীতির কারণে ব্যাংকটির খেলাপি বেড়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ আদায় সন্তোষজনক না হওয়ায় ঋণ অবলোপন বাড়ছে।

মার্কেন্টাইল ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে, ২০১৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ৬২৫ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে তা আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৭৪ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ১৪৯ কোটি টাকা। এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জুনে প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, এ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৭০ কোটি টাকা। তবে আলোচিত দুই বছরে ব্যাংকটির ঋণ অবলোপন করেছে  ৪৮৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০১৬ সালে ২৩৯ কোটি টাকা ঋণ অবলোপন করেছে। আগের বছর ২৪৯ কোটি টাকা ঋণ অবলোপন করেছিল। যদিও আলোচিত সময়ে অবলোপনকৃত ঋণের মাত্র ১১ কোটি টাকা আদায় করতে পেরেছে ব্যাংকটি। এছাড়া বাকি অবলোপনকৃত ঋণ আদায়ে ব্যর্থ হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তাছাড়া খেলাপি ঋণের পরিমাণও দিন দিন বাড়ছে।

ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, অতীতে বিতরণ করা ঋণ থেকেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। এসব ঋণ আদায়ে ব্যাংকের ওপর চাপ থাকে সব সময়। ঋণ আদায়ের চাপ থেকে রক্ষা পেতেই দীর্ঘদিন অনাদায়ী খেলাপি ঋণ রাইট অব বা ঋণ অবলোপন করা হয়। এতে পুরোনো ঋণ আদায়ের চাপ কমে যায়। ফলে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ চাপমুক্ত হয়ে ব্যাংকের কার্যক্রম চালাতে পারে।

এ সম্পর্কে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিআরও মতি উল হাসান শেয়ার বিজকে বলেন, খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকটি কাজ করে যাচ্ছে। আশা করছি, বছর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমে আসবে।

ঋণ অবলোপন সম্পর্কে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন খেলাপি ঋণের বোঝা বইতে গিয়ে ব্যাংকের ওপর প্রেশার বেশি থাকে। সে প্রেশার থেকে রক্ষা পেতেই মূলত ঋণ অবলোপন করা হয়। এতে প্রেশার অনেকটা কমে যায় বলে জানান তিনি।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব ও প্রকাশনা তথ্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণের যে তথ্য দেওয়া হয়, তাতে শুধু নিয়মিত খেলাপি ঋণকেই দেখানো হয়। তবে সব সময় অবলোপন করা ঋণকে আড়ালেই রাখা হয়। মন্দঋণ মানে শ্রেণীকৃত পুরোনো (পাঁচ বছরের বেশি)  খেলাপি ঋণ ব্যাংকের স্থিতিপত্র (ব্যালান্স শিট) থেকে বাদ দেওয়াকে ‘ঋণ অবলোপন’ বলা হয়। আর ঋণ দেওয়ার পর আদায় না হলে তা খেলাপি হয়ে পড়ে, যার বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে প্রভিশন (নিরাপত্তা সঞ্চিতি) রাখতে হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক তিন মাস পরপর খেলাপি ঋণের তথ্য-উপাত্ত তৈরি করে। ১০ কোটি টাকার নিচে যেকোনো ঋণ তিন মাসে পরিশোধ করতে না পারলে তা হয় সাব-স্ট্যান্ডার্ড বা ভালো-মন্দের মাঝামাঝি মান। ছয় মাসে পরিশোধে ব্যর্থ হলে ডাউটফুল বা সন্দেহজনক মান ও ৯ মাসে পরিশোধ করতে না পারলে ব্যাড অ্যান্ড লস বা মন্দঋণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

এদিকে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যর্থ হলেও বাড়ছে পরিচালন ব্যয়। ২০১৬ সালে ব্যাংকটির পরিচালন ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৫৬৫ কোটি টাকা। আগের বছর ব্যাংকটির পরিচালন ব্যয় হয়েছিল ৪০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকটির পরিচালন ব্যয় বেড়েছে ১৬৫ কোটি টাকা। তবে ব্যয় বাড়লেও পরিচালন আয়ও বেড়েছে। ২০১৬ সালে ব্যাংকটির পরিচালন আয় হয়েছে এক হাজার আট কোটি টাকা, আগের বছর পরিচালন আয় হয়েছিল ৭৯৪ কোটি টাকা। অন্যদিকে বেড়েছে পরিচালকদের ফি’র পরিমাণ। ব্যাংকটির গত বছর পরিচালকদের ফি বাবদ দিয়েছে ৬৫ লাখ ৯৩ হাজার টাকা। আগের বছর ফি বাবদ দিয়েছিল ৪৫ লাখ ৩১ হাজার টাকা। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে পরিচালকদের ফি বেড়েছে ২০ লাখ টাকার বেশি। অথচ ব্যাংকটির ঋণ আদায়ের অবস্থা নাজুক।