মালয়েশিয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাবলি থেকে শিক্ষাটা কী?

ড. আর এম দেবনাথ: মে মাসের ২০ তারিখে দৈনিক ‘শেয়ার বিজ’-এ চীন সম্পর্কে একটি খবর ছাপা হয়। খবরটির শিরোনাম: ‘ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ দেশের ভূমি ও বন্দর দখল করছে চীন।’ খবরটি বেশ ব্যতিক্রমধর্মী এবং চিন্তা জাগানিয়া, বিশেষ করে তা হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার ফল হওয়ায়।
এ বিষয়ে আলোচনার আগে আমি মালয়েশিয়ার সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফলের দিকে একটু নজর দিতে চাই। কারণ এই ফলের অন্তর্নিহিত তাৎপর্যের মধ্যেও চীন আছে। এই তো সেদিন গিয়েছিলাম এয়ারপোর্টে একমাত্র মেয়ে সুবর্ণাকে ‘সি অফ’ করতে। বিমানবন্দরে ঢুকতে টিকিট লাগেÑমূল্য ৩০০ টাকা। টিকিট নিয়ে মালপত্রসহ ঢুকব বিমানবন্দরের ভেতর। বিরাট লাইন। দেখলাম, লাইনে কোনো ‘হোয়াইট কলার’ ভদ্রলোক নেই। সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের ফ্লাইট। দেখা যাচ্ছে, যাত্রী সব মালয়েশিয়ার। লাইনে দাঁড়ানো কৃষকপুত্ররা, যারা সারা বছর দেশে ‘রেমিট্যান্স’ পাঠায়। এদের দেখে দেখে আমার মালয়েশিয়ার কথা মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল তাদের ৯ তারিখের নির্বাচনের কথা, যে নির্বাচনে ৯২ বছর বয়সী রাজনীতিবিদ, মালয়েশিয়ার ‘কৌটিল্য’ পুনরায় ১৫-১৬ বছর পর ক্ষমতায় ফিরে এসেছেন। আমাদের কৃষকপুত্ররা যাচ্ছে ওই মালয়েশিয়ায়ই। ছোট একটি দেশ। বেশিদিন আগের কথা নয়Ñদেশটি ছিল ‘জেলেদের’। মাছই ছিল প্রধান ব্যবসা। স্বাধীনতার পর তারা সিঙ্গাপুরের সঙ্গে কিছুদিন ছিল। কিন্তু সেই ঐক্যবদ্ধ দেশ টেকেনি। দেশটিতে রয়েছে ৬৯ শতাংশ মালয়ী, যাদের বলা হয় ভূমিপুত্র; ২৪ শতাংশ চীনা বংশোদ্ভূত নাগরিক এবং ৭ শতাংশ ভারতীয় বংশোদ্ভূত। খুবই জটিল ‘ডেমোগ্রাফি’। এর মধ্যেই ড. মাহাথির মোহাম্মদের দল ‘ইউনাইটেড মালয় ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (ইউএমএনও)’ ১৯৫৫ সাল থেকে ২০১৮ সালের ৯ মে পর্যন্ত মালয়েশিয়া শাসন করেছে। এ মুহূর্তে দেশে তিন নেতা। একজন বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ড. মাহাথির মোহাম্মদ এবং আরেকজন সদ্য কারামুক্ত প্রাক্তন উপপ্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। বিদায়ী প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করলেন অন্য দুইজন। এতে ৬৩ বছরের একদলীয় শাসনের পরিসমাপ্তি ঘটল।
বড়ই মজার বিষয়, নাজিব রাজাকের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ দুর্নীতি। তিনি নাকি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার চুরি করেছেন। তার এখন বিচার হবে। জেল থেকে মুক্তি পাওয়া নেতা আনোয়ার ইব্রাহিম, তিনি ছিলেন মাহাথিরের অর্থমন্ত্রী। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ সমকামিতা ও দুর্নীতির। মাহাথিরের বিরুদ্ধেও অভিযোগ ছিল একনায়কত্ব ও ‘ক্রোনি ক্যাপিটেলিজমের’। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, ড. মাহাথিরই ক্রমাগতভাবে ২২ বছর ৬-৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে মালয়েশিয়াকে পূর্ব এশিয়ার একটি অনুকরণীয় দেশে পরিণত করেন। বর্তমানে তাদের মাথাপিছু আয় ১৫ হাজার ডলারের কাছাকাছি। বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশের লাখ লাখ শ্রমিক সেখানে কাজ করে। নিজ দেশে ডলার পাঠায়। মালয়েশিয়া এখন চীনাদের একটা আকর্ষণীয় দেশে পরিণত হয়েছে। দলে দলে চীনারা আসছে। শুধু চীনা ধনী কেন, বাংলাদেশের ধনীরাও মালয়েশিয়ায় গিয়ে জায়গা-জমি কিনছে। মালয়েশিয়ায় ‘সেকেন্ড হোম প্রকল্প’ খুব জনপ্রিয় একটি প্রকল্প। মাত্র কোটি দুই-তিনেক টাকা দিয়ে সেখানে থাকার অধিকার পাওয়া যায়। ‘মানি লন্ডারিং প্রিভেনশন’ আইন সেখানে কোনো বাধা নয়। অভাবনীয় এক উন্নতি মালয়েশিয়া করে চলেছে। করে চলেছে ‘সংঘাতমুখী’ জনবিন্যাসের মধ্যেও। মালয়ীদের অভিযোগ, দেশের সব সম্পদ চীনা ও ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের দখলে। মাহাথির তাই মালয়ীদের (ভূমিপুত্র) অনুকূলে আইন করে একটা ‘পজিটিভ ডিসক্রিমিনেশন’-এর চেষ্টা করেনÑযদিও তার ফল ভালো হয়নি। এ কারণে এবারের নির্বাচনে কথা উঠেছে ‘মেরিটোক্রেসির’। এবং এ দাবি ড. মাহাথিরের নেতৃত্বাধীন ‘অ্যালায়েন্সের’, যারা নিজেদের দ্বারা গঠিত দলকে পরাজিত করেই ক্ষমতায় এসেছে এবার।
শুধু কি এই দাবি? না, তা নয়। এবারের নির্বাচনে প্রধানতম দাবি ছিল বিদায়ী প্রধানমন্ত্রীর বিচার। দুর্নীতির বিচার। ‘গুডস অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্যাক্স’ (জিএসটি), যা চালু হয় দুই বছর আগে; তা স্থগিত করা হবে। কারণ এর ফলে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেছে। গরিব ও মধ্যবিত্ত মানুষের কষ্ট বেড়ে গেছে। সর্বশেষ কথা দেওয়া হয়েছেÑসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ানো হবে। তেলের দাম কমানো হবে। বলা বাহুল্য, নাজিব রাজাক প্রাক্তন এক প্রধানমন্ত্রীর সন্তান। তার এই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আত্মসাতের ঘটনা মালয়েশিয়ানদের হতবাক করে দিয়েছে। তার বিচার ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। যে আনোয়ার ইব্রাহিম ছিলেন জেলে; পরে মুক্তি পেয়েছেনÑতারই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা। ইত্যবসরে তার স্ত্রী হয়েছেন উপ-প্রধানমন্ত্রী। এসব ঘটনার মধ্যে মাহাথিরের নির্বাচন-পূর্ববর্তী বক্তৃতাগুলো শুনলে বোঝা যায়, তার অ্যালায়েন্সের অভিযোগগুলো আরও গভীর। নাজিব ছিলেন চীনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এ বন্ধুত্বের বদৌলতে তিনি চীনের সঙ্গে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক চুক্তি করেন; করেন অনেক জমি সংক্রান্ত চুক্তি। বিরোধীদের অভিযোগ, এসব চুক্তি স্বচ্ছ নয়। এসবের মূল্য বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি। এসব চুক্তিতে মালয়েশিয়ার স্বার্থ রক্ষিত হয়নি। রেলপথ ও বন্দর বানানোর জন্য চীনের সঙ্গে বহু মূল্যের চুক্তি করেছেন নাজিব। অথচ অভিযোগ, পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশই চীনের ‘বিল্ড অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এর অধীন প্রকল্প অতিমূল্যায়নের জন্য স্থগিত করছে। ইন্দোনেশিয়া ও লাওস অতিমূল্যায়ন এবং জমি সম্পর্কিত বিতর্কে অনেক চুক্তি স্থগিত করেছে। এতদসত্ত্বেও নাজিব একের পর এক চুক্তি করে চীনের কাছে মালয়েশিয়াকে বিক্রি করে দিয়েছেন বলে জোর অভিযোগ। বিরোধী দলগুলোর এ অভিযোগ মানুষের মনে ধরেছে।
মালয়েশিয়ার বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ, যিনি ড. মাহাথিরের উপদেষ্টাদের একজন, সেই জোমো কাওয়েনে সানডেলাম বলছেন ‘ইস্ট কোস্ট রেলওয়ে লিঙ্ক’ নামীয় প্রকল্পটি অতিমূল্যায়িত। এর দাম ধরা হয়েছে ১৪ বিলিয়ন ডলার। ৮৫ শতাংশ দেবে চীন। প্রকল্পটি থাইল্যান্ডের সঙ্গে মালয়েশিয়ার রেলওয়ের মাধ্যমে যোগাযোগের জন্য বাস্তবায়িত হবে। অবশ্যই চীনের বিল্ড অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) অন্তর্ভুক্ত এটি। বিরোধীরা বলেছে, এর থেকে মালয়েশিয়ার কোনো লাভ হবে না। প্রকল্পটিতে স্বচ্ছতা নেই। উল্লেখ্য, এসব অভিযোগে শামিল হয়েছে চীনা বংশোদ্ভূতরাও। এ প্রেক্ষাপটে ড. মাহাথির মোহাম্মদ নির্বাচনের আগে ও পরে বারবার বলেছেন চীনের সঙ্গে সম্পাদিত সব চুক্তি পুনঃপরীক্ষা করবেন। জাতীয় স্বার্থবিরোধী সবকিছুই পরীক্ষা করে দেখা হবে। ‘ইউটিউব’-এ মাহাথিরের একটা ভাষণ শুনলাম। তাতে তিনি একটি প্রকল্প সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছেন। এর নাম ‘ফরেস্ট সিটি’। দ্বীপ তৈরি করে সর্বাধুনিক ফ্ল্যাটবাড়ি, শপিং মল প্রভৃতি বানানো হচ্ছে। মোট ১০ লাখ লোকের বসবাস হবে। দ্রুত কাজ এগিয়ে চলেছে। তার প্রশ্ন, এসব ফ্ল্যাট কারা কিনবে? সাধারণ মালয়ীদের তো ফ্ল্যাট কেনার অর্থ নেই। তাহলে কিনবে ধনাঢ্য চীনারা। কেন, এটা তার প্রশ্ন। এতে বৈষম্য বাড়বে। দেখা যাচ্ছে, এবারই প্রথম মালয়ীরা ভোটের সময় বিভক্ত ছিল। তারা তাদের স্বার্থের দল ‘ইউএমএনও’ ছেড়ে প্রচুর সংখ্যায় মাহাথিরকে ভোট দিয়েছে। দেখা যাচ্ছে, এবারের নির্বাচনে শুধু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইস্যুই প্রাধান্য পায়নি; প্রধান্য পেয়েছে চীন ইস্যু। ‘দি ইকোনমিস্ট’ নামীয় বিশ্বখ্যাত নিউজ ম্যাগাজিনের ১৯ মে সংখ্যায়ও এ বিষয়ে বিশেষভাবে উল্লেখ আছে। ‘দেশ বিক্রির’ অভিযোগ ছিল সর্বত্র। এসব লক্ষ করে বেন ব্ল্যান্ড তার এক নিবন্ধে (ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ১৯ মে ২০১৮) বলছেন, তাহলে কি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চীনা নীতির জন্য মালয়েশিয়ার নতুন সরকার একটা বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে?
চীনা কর্মকাø ও মালয়েশিয়ার বর্তমান সরকারের অবস্থান আলোচনার পর অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার দিকে ফেরা যাক। দৈনিক শেয়ার বিজের রিপোর্টে বলা হচ্ছে : ‘চীনের দেওয়া বড় অঙ্কের ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হচ্ছে অনেক ঋণগ্রহীতা দেশ। চেক বুক কূটনীতির মাধ্যমে কৌশলে ওইসব দেশের ভূমি ও বন্দর দখল করছে চীন।’ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা নিবন্ধে বলা হয়েছে, চীনের কাছ থেকে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, কম্বোডিয়া, পাপুয়া নিউগিনি ও মালয়েশিয়াসহ ১৬টি দেশ বড় অঙ্কের ঋণ নিয়েছে। চীনের কাছে একটি বন্দর হস্তান্তর করেছে ঋণ গ্রহণের শীর্ষে থাকা পাকিস্তান। একই সঙ্গে পাশেই একটি নৌঘাঁটি নির্মাণের জন্য ভূমি সমর্পণ করেছে ইসলামাবাদ। এ ধরনের প্রকল্প বাবদ পাকিস্তান এরই মধ্যে ১৯ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়েছে। শ্রীলঙ্কাকে চীন ৯ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় শ্রীলঙ্কা তার হামবানটোটা বন্দরটি চীনের কাছে হস্তান্তর করেছে। কম্বোডিয়া যত বিদেশি ঋণ করেছেÑতার ৭০ শতাংশই চীনা। কম্বোডিয়ার ঋণজর্জরিত কৃষকরা চীনাদের কাছে জমি হস্তান্তরে বাধ্য হচ্ছে। পাপুয়া নিউগিনির অবস্থাও একই। এদিকে শ্রীলঙ্কার অবস্থা খুবই খারাপ। সে দেশের বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ মাত্র ৯ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। অথচ আগামী বছরে চীনা ঋণ পরিশোধে লাগবে ৪ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার। ঋণ পরিশোধের এ করুণ অবস্থায় শ্রীলঙ্কাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটি এরই মধ্যে এক দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়ে শ্রীলঙ্কাকে ‘বেইল আউট’ করেছে।
উপরে মালয়েশিয়ার নির্বাচন ঘিরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উন্নয়নের একটা চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করলাম। বিনিয়োগ নয় শুধু ঋণনির্ভর, বিদেশি ঋণনির্ভর উন্নয়ন যে কী সর্বনাশ একটি দেশের জন্য ডেকে আনতে পারে, তার উদাহরণ এখন অনেক। আমাদের শিক্ষা কী এ ক্ষেত্রে? আমরাও অনেক চীনা ঋণ নিচ্ছি। এর মধ্যে কত ঋণ আর কত বিনিয়োগ, তার পরিমাণ আমরা অবগত নই। ঋণের ওপর সুদ কত, তস্য সুদ কত, পরিশোধসীমা কী তাও অনেক ক্ষেত্রে অজানা। খবরে দেখতে পাই, অনেক প্রকল্পই অতিমূল্যায়িত। এসব খবর শেয়ার বিজেও ছাপা হচ্ছে। আমার অভিমত, শক্ত অভিমত হচ্ছে সব বিদেশি ঋণের একটা সামগ্রিক চিত্র প্রকাশ করা দরকার। জাতীয় স্বার্থবিরোধী কোনো ঋণই গ্রহণ করা উচিত নয়। বিনিয়োগ আসুক। কিন্তু তার তো কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। শুধু ঋণ, চীনা ঋণ!

অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক