মাহাথিরের ক্ষমতায় ফেরা

সোহেল রানা: ড. মাহাথির মোহাম্মদকে দশে দশ দেবেন না অনেকে। এর মধ্যে আমিও রয়েছি। আফ্রো-এশিয়ার অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশের শাসকদের মতো তিনিও বিরোধীদের জেলে ঢুকিয়েছেন, সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান ইউর মতো রক্ত না ঝরালেও নির্যাতন-নিপীড়ন চালিয়েছেন। আর এসব তিনি করেছেন বিতর্কিত ইন্টারনাল সিকিউরিটি আইন প্রণয়ন করে। ১৯৯৮ সালে নিজের ডেপুটি আনোয়ার ইব্রাহিমকে বরখাস্তের পর দুর্নীতি আর সমকামিতার অভিযোগে কারাগারে পাঠানো হয়। তবে পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে তার উচ্চকণ্ঠ দেশের বাইরে মাহাথিরকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয়।
মাহাথির ‘উন্নয়ন’ করেছেন এটি যেমন সত্য, তেমনই চিরসত্য বয়ান হলো, ‘উন্নয়ন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া’। তবে যেটি কঠিন সত্য তা হলো, মাহাথির লুটপাট এড়িয়ে উন্নয়ন করতে পেরেছিলেন। চমকটা সেখানেই। এশিয়া-আফ্রিকায় অনেকেই গণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতায় এসে স্বৈরশাসক বনে গেছেন; তারা একহাতে উন্নয়ন করেছেন, অন্যহাতে লুটপাট করে পরিবার ও দলীয় নেতা-কর্মীদের জন্য সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। কিন্তু মাহাথির এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম, তিনি বিরোধী মতকে তার শেষ দিককার শাসনামলে গুরুত্ব না দিলেও তার উন্নয়ন ছিল একেবারে ফ্রেশ, লুটপাট ও দুর্নীতিমুক্ত। আর সে কারণেই তিনি মালয়েশিয়ার বাইরে তৃতীয় বিশ্বের জন্য রোল মডেল। কারণ দু-একটা ব্যতিক্রম বাদে তৃতীয় বিশ্বের বেশিরভাগ শাসকই দুর্নীতিগ্রস্ত হয়।
ষাট বছরেরও বেশি সময়ের রেকর্ড ভেঙে ৯২ বছর বয়সে আবারও মালয়েশিয়ার শীর্ষপদে মাহাথির মোহাম্মদ। তিনি যার সঙ্গে জোট করে ক্ষমতায় এলেন, অর্থাৎ তার দলের একসময়কার নেতা আনোয়ার ইব্রাহিমকে তিনিই জেলে পুরেছিলেন। মূল অভিযোগটা ছিল একেবারেই ঘোরতরÑসমকামিতা। রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু নেই। তার ভাষায় সেই সমকামী নেতার সাথেই কেন জোট? নিজ দলের বিরুদ্ধেই বা কেন যেতে হলো মাহাথিরকে? অথবা মাহাথিরের ক্ষমতায় যাওয়ার প্রেক্ষাপটটা কে তৈরি করে দিল? এসব প্রশ্নের উত্তর নিয়ে আলোচনায় আসছি পরে, তার আগে মালয়েশিয়ার সবশেষ নির্বাচনের ফলের দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক। আমনো পার্টির নেতা মাহাথির বিএন জোটের হয়ে টানা ২২ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। তার এই জোট মালয়েশিয়ার ক্ষমতায় ছিল ৬১ বছর,মানে ১৯৫৭ সালে ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর বিরোধীরা ক্ষমতায় যেতে পারেননি, কিংবা যেতে দেওয়া হয়নি। বিরোধী জোটের নেতা হিসেবে নিজের আগের দলেরই প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাককে ক্ষমতা থেকে টেনে নামালেন মাহাথির। অথচ একসময় নাজিব ছিলেন মাহাথিরের খুব আস্থাভাজন।
ঘোষিত সরকারি ফলাফলে দেখা গেছে, মাহাথিরের পাকাতান হারাপান জোট পার্লামেন্টের ২২২ আসনের মধ্যে ১১৩টিতে জয় পেয়ে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। আর নাজিবের বিএন জোট ৭৯টি আসন ধরে রাখতে পেরেছে। নাজিব রাজাকের বিরুদ্ধে মাহাথিরের এ অপ্রত্যাশিত জয়ে উৎসবে মেতেছে মালয়েশিয়াবাসী। কারণ জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও কয়েক বিলিয়ন ডলারের দুর্নীতির অভিযোগে নাজিবের জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছিল। কিন্তু জয়টা কি অপ্রত্যাশিত ছিল ? কিংবা কেবল মাহাথিরের জন্যই কি মানুষ বিরোধী পাকাতান হারাপানকে ভোট দিয়েছিল? আসলে বিরোধীরা আগেই ক্ষমতায় আসতে পারত যদি দেশটিতে অবাধ ও সুষ্ঠু কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতো। মালয়েশিয়ায় উন্নয়ন হলেও এত দিন সেখানে নির্বাচনট হতো মুগাবে স্টাইলেই। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিকদের মতো সেখানেও কাদা ছোড়াছুড়ি ছিল, বিশেষ করে মাহাথিরের শেষ শাসনকাল বিরোধীদের জন্য খুবই পীড়াদায়ক ছিল। মামলা-মোকদ্দমায় জর্জরিত ছিল বিরোধী নেতারা, একসময় মিছিল-সমাবেশও সেখানে প্রায় নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। বিরোধী নেতা আনোয়ার ইব্রাহিম এখনও জেলে। সবমিলে ক্ষমতাসীন জোট বারিসানের বিরুদ্ধে একটি সফল নির্বাচনি বিপ্লবের অপেক্ষায় ছিল মালয়েশিয়রা। আর মাহাথির সেই জোটে আসায় নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারটা বিরোধীদের জন্য সহজ হয়ে যায়, মাহাথিরের প্রভাব নির্বাচনে গণকারচুপির চেষ্টা নিস্তেজ করে দেয়। অর্থাৎ ভোট মানুষ আনোয়ার ইব্রাহিমকেই দিয়েছে, পাকাতান হারাপানকেই দিয়েছে।
মাহাথিরকে নির্বাচনে টেনে এনেছে নাজিবের দুর্নীতি। জয়ের পরই তিনি বলেছেন, ‘আমরা প্রতিশোধ নিতে চাচ্ছি না। আমরা আইনের শাসন ফিরিয়ে আনতে চাচ্ছি।’ নাজিব রাজাকের পূর্বসুরী আবদুল্লাহ বাদাবির সঙ্গেও দ্বন্দ্বে জড়িয়েছিলেন মাহাথির মোহাম্মদ। বাদাবির মতে, মাহাথির তার নিজের পথেই চলেন এবং তিনি বিশ্বাস করেন, তার পথই একমাত্র পথ।
রয়টার্স এক প্রতিবেদনে বলেছে, মাহাথিরকে এখন তার নতুন জোটের চার দলের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখার জন্য কাজ করতে হবে এবং কারগারে থাকা বিরোধীদলীয় নেতা আনোয়ার ইব্রাহিমকে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী করার পথ বের করতে হবে।
বলা হচ্ছে, অর্থনৈতিক কারণে নাজিবদের পতন হয়েছে। সম্প্রতি মালয়েশিয়ায় জীবনধারণের ব্যয় ভয়ঙ্কর মাত্রায় বেড়েছে এবং জিনিসপত্র ও বিভিন্ন সেবাপণ্যের ওপর সরকার নতুন কর আরোপ করেছে। এগুলো মানুষ ভালোভাবে নেয়নি। এর বাইরে আরেকটি কারণ নাজিব প্রশাসনের দুর্নীতি। যদিও নাজিব রাজাক কখনোই দুর্নীতির সঙ্গে তার কোনোরকম সম্পৃক্ততা স্বীকার করেননি। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির যে অভিযোগ আনা হয়েছিল, তা শুধু মালয়েশিয়া নয়, সারা বিশ্বেই আলোচিত ছিল। তিনি বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে একটি বিশেষ তহবিল গঠন করেছিলেন। অভিযোগটা হলো, যাদের এ তহবিল ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তারা এটি ব্যবহার করে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি করছেন, অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। নাজিব রাজাকের নিজের বিরুদ্ধেও ৭০ কোটি ডলার পকেটে নেওয়ার অভিযোগ রয়েেেছ। তবে তাকে অনিয়মের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
দুই বছর আগে মাহাথির যখন তার আগের জোট ছাড়েন, তখন এটা চমকে দেওয়ার মতো বিষয় ছিল। তিনি সবাইকে হতবাক করে বললেন, দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে তিনি এতই ‘বিব্রত’ যে তার পুরোনো দল (আমনো) তিনি ছেড়ে দিচ্ছেন এবং বিরোধী জোট পাকাতান হারাপানে যোগ দিচ্ছেন। পাকাতান হারাপানের অর্থ আশার জোট (অ্যালায়েন্স অব হোপ), যার নেতা কারাবন্দি আনোয়ার ইব্রাহিম।
গত জানুয়ারিতে নিজের একসময়কার রাজনৈতিক শিষ্য নাজিব রাজাকের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ইচ্ছা পোষণ করেন আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার মাহাথির মোহাম্মদ। তিনি তখনই বলেন, জয়ের ব্যাপারে তিনি আস্থাবান ‘যদি না নাজিব কারচুপি করে’। মাহাথিরের এ বক্তব্য তার আমলে হওয়া নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে ভাবতেও প্রলুব্ধ করবে। যা-ই হোক, দুই এক জায়গায় কিছু অনিয়ম হলেও নির্বাচন যথেষ্ঠ গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।
মাত্র একুশ বছর বয়সে রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয় মাহাথির মোহাম্মদের। ১৯৬৪ সালে কেদাহ প্রদেশ থেকে এমপি নির্বাচিত হন তিনি। কিন্তু নিজ দল ও দলীয় নেতাদের সমালোচনা করে লেখা তার একটি চিঠি ও বই মালয়েশিয়ার প্রতিষ্ঠাতাকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। ষাটের দশকে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ও দেশটির প্রতিষ্ঠাতা টেংকু আবদুল রহমানের সমালোচনা করে মাহাথির প্রকাশ্যে একটি চিঠি লিখেছিলেন। ‘মালয় ডিলেমা’ নামে লিখেন একটি বই, যাতে মাহাথির মন্তব্য করেন, মালয়েশিয়ার মালয় জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত করা হচ্ছে এবং দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসাবে দেখা হচ্ছে। মালয়েশিয়ায় এই মালয়দের সংখ্যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬০ শতাংশ। মন্তব্যের জেরে মাহাথিরকে নিজ দল থেকে বহিষ্কার করা হয়, তবে পরে আবারও দলে ফেরেন তিনি। ১৯৭৪ সালে তিনি এমপি নির্বাচিত হন এবং শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পান। পরের চার বছরের মধ্যে তিনি ক্ষমতাসীন দল আমনোর উপনেতা নির্বাচিত হন। ১৯৮১ সালে প্রথম প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন মাহাথির। সেই থেকে শুরু। তার নেতৃত্বে অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয় মালয়েশিয়া। শিক্ষায় ব্যাপক বিনিয়োগ করতে থাকে মাহাথিরের সরকার। তার এসব উন্নয়ন আর সংস্কার কার্যক্রমই, সরকারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ সত্ত্বেও মাহাথিরকে দেশে-বিদেশে জনপ্রিয় করে তোলে।
রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার কয়েক বছর পর আনোয়ার ইব্রাহিমকে কারাগারে পাঠানোর ব্যাপারে অনুতপ্ত হন মাহাথির। তিনি স্বীকার করেন, ‘জীবনে অনেক ভুল করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে আনোয়ার ইব্রাহিমকে বরখাস্ত করা।’ নিজ দল ছেড়ে
আনোয়ার ইব্রাহিমের পাকাতান হারাপানের সঙ্গে জোট বাঁধার পর নাজিব রাজাকের চোখে মাহাথির ছিলেন, ‘এক নম্বর অভিনেতা’।
যা-ই হোক, ৯২-তে পা রাখা মাহাথির মোহাম্মদ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন দুই বছর পর তিনি ক্ষমতা অন্য কারও হাতে তুলে দেবেন। মাহাথির যদি তার কথা রাখেন তাহলে, মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় চমকটা সামনে। কারণ পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে পাকাতান হারাপানের কারাবন্দি নেতা আনোয়ার ইব্রাহিম, যাকে বহিষ্কারের ঘটনায় এখন অনুতপ্ত আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার।

গণমাধ্যমকর্মী
sohel.shalbanÑgmail.com