মত-বিশ্লেষণ

মাহে রমজান

ইসলামের প্রথম ও দ্বিতীয় আমল হলো যথাক্রমে নামাজ ও রোজা। কোরআনের সঙ্গে রোজা ও নামাজের সম্পর্ক সুগভীর। রাসুল (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা তোমাদের প্রতি রোজা ফরজ করেছেন আর আমি তোমাদের জন্য তারাবির নামাজ সুন্নত করেছি। রমজানের পুরো এক মাস রাতে তারাবি নামাজ জামাতে আদায়ের ফলে পরস্পরের মধ্যে দেখা হওয়ায় একে অপরের প্রতি মমত্ববোধ, সম্প্রীতি, ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও সৌহার্দ্য গড়ে ওঠে।’
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি পূর্ণ ইমান ও সওয়াব হাসিলের উদ্দেশ্যে রমজান মাসের রাতে কিয়াম আদায় করবে, অর্থাৎ তারাবির নামাজ আদায় করবে, তার পূর্ববর্তী সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।’ (সহিহ আল-বুখারি, হাদিস: ১৯০১; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭৫৯)
রাসুল (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা তোমাদের প্রতি রোজা ফরজ করেছেন আর আমি তোমাদের জন্য তারাবির নামাজ সুন্নত করেছি; অতএব যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় রমজানে দিনে রোজা পালন করবে ও রাতে তারাবির নামাজ আদায় করবে, সে গুনাহ থেকে এমন পবিত্র হবে যেমন নবজাতক মাতৃগর্ভ থেকে (নিষ্পাপ অবস্থায়) ভূমিষ্ঠ হয়। (নাসায়ি, প্রথম খণ্ড, ২৩৯ পৃষ্ঠা)। তারাবির নামাজ প্রতি চার রাকাত অন্তর চার রাকাত নামাজের সমপরিমাণ সময় বিরতি দিয়ে আরামের সঙ্গে আদায় করা হয়। তারাবির নামাজ এশার নামাজের পর থেকে ফজরের নামাজের আগ পর্যন্ত পড়া যায়। মাহে রমজানে রোজাদার সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজা রেখে ক্লান্ত হয়ে যান। তারপর রাতে এশা ও তারাবির নামাজ দীর্ঘসময় ধরে পড়তে হয়। সে কারণে দীর্ঘ নামাজের কঠোর পরিশ্রম লাঘব করার জন্য প্রতি দুই রাকাত, বিশেষ করে প্রতি চার রাকাত পর একটু বসে বিশ্রাম করতে হয় এবং দোয়া ও তসবিহ পাঠ করতে হয়।
তারাবির নামাজের গুরুত্ব সীমাহীন, কারণ মাহে রমজান যেসব বিশেষ বৈশিষ্ট্যের জন্য মহিমান্বিত, তার মধ্যে অন্যতম তারাবির নামাজ। তারাবির নামাজ মুসলমানদের ওপর সারা বছরের মধ্যে শুধুই রমজান মাসের জন্যে সুন্নত বিধান হিসেবে স্থিরকৃত। যেহেতু রমজান মাস ছাড়া বছরের অন্য কোনো সময়ে তারাবির নামাজ আদায় করার সুযোগ নেই, তাই বার্ষিক ইবাদত হিসেবে এর গুরুত্ব অন্যান্য সুন্নত নামাজ অপেক্ষা বেশি। রাসুলে করিম (সা.) তারাবির নামাজকে অত্যন্ত গুরুত্বসহ আদায় করতেন বলে সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন হজরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) তারাবির নামাজের ব্যাপারে সাহাবিদের উৎসাহিত করতেন, কিন্তু তিনি তাঁদের দৃঢ়তার সঙ্গে আদেশ
করতেন না।
বিজ্ঞ আলেমরা তারাবির নামাজে কে সুন্নাতে মুআক্কাদাহ যা ওয়াজিবের কাছাকাছি গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিহিত করেছেন। অর্থাৎ তারাবির নামাজ বর্জন করলে অবশ্যই গুনাহ হবে। হজরত উরওয়াহ ইবনে জুবায়ের (রা.) হজরত আয়েশা (রা.) থেকে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজান মাসে রাতের বেলায় মসজিদে নববিতে নামাজ (তারাবি) আদায় করলেন। উপস্থিত লোকজনও তাঁর সঙ্গে নামাজ আদায় করলেন। একইভাবে তাঁরা দ্বিতীয় দিনেও নামাজ আদায় করলেন এবং লোকসংখ্যা অনেক বেশি হলো। অতঃপর তৃতীয় এবং চতুর্থ দিনেও মানুষ একত্র হলো, কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) হুজরা থেকে বেরিয়ে তাদের কাছে এলেন না। অতঃপর সকাল হলে তিনি এলেন এবং বললেন, তোমাদের অপেক্ষা করার বিষয়টি আমি লক্ষ করেছি। কিন্তু শুধু এ ভয়ে আমি তোমাদের কাছে আসা থেকে বিরত থেকেছি যে, আমার আশঙ্কা হচ্ছিল, না জানি তোমাদের ওপর তা ফরজ করে দেওয়া হয়। (সহিহ আল-বুখারি, হাদিস: ৯২৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭৬১)
হাদিসের তথ্যমতে, রাসুলুল্লাহ (সা.) তিন দিন মসজিদে নববিতে জামাতের সঙ্গে তারাবির নামাজ আদায় করেছেন। অতঃপর রাসুলের যুগে, হজরত আবু বকর (রা.)-এর খিলাফতকালে এবং হজরত ওমর (রা.)-এর খিলাফতের প্রথম দিকে মুসলমানরা একাকী অথবা খণ্ডখণ্ডভাবে ছোট জামাতে তারাবির নামাজ আদায় করতেন। অবশেষে হজরত ওমর (রা.) হজরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.)-কে ইমাম নির্ধারণ করে সম্মিলিতভাবে জামাতের সঙ্গে ২০ রাকাত তারাবির নামাজ আদায়ের স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। (সহিহ আল-বুখারি, হাদিস: ২০১০)। আল্লাহ পাক সবাইকে তারাবির ফজিলত অনুধাবন করে যথাযথভাবে আদায় করার তওফিক দান করুন। রমজানের পুরো এক মাস রাতে তারাবি নামাজ জামাতে আদায়ের ফলে পরস্পরের মধ্যে দেখা হওয়ায় একে অপরের প্রতি মমত্ববোধ, সম্প্রীতি, ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও সৌহার্দ্য গড়ে ওঠে।

সর্বশেষ..