মত-বিশ্লেষণ

মাহে রমজান

রমজান কোরআন নাজিলের মাস। শবেকদরে কোরআন নাজিলের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়েছে। রাসুল (সা.) রমজান মাসে পুরো কোরআন শরিফ হজরত জিবরাইল (আ.)-কে একবার শোনাতেন এবং জিবরাইল (আ.)ও নবী করিম (সা.)-কে পুরো কোরআন একবার শোনাতেন। বড় বড় সাহাবিরাও রমজানে প্র্র্রতি সপ্তাহে সমগ্র কোরআন একবার তিলাওয়াত করতেন।
হজরত উসমান (রা.), হজরত উবাই ইবনে কাআব (রা.) প্রমুখ সাহাবি প্র্র্রতিদিন যতটুকু তিলাওয়াত করতেন, তা মঞ্জিল নামে পরিচিত। তাই কোরআন সাত মঞ্জিলে বিভাজিত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে এক মাসে সম্পূর্ণ কোরআন খতম করার জন্য কোরআন মজিদকে সমান ৩০ ভাগে বিভক্ত করা হয়, যা পারা নামে পরিচিত। এরপর আরও সহজ করার জন্য প্র্র্রতিটি পারাকে সমান দুই ভাগে ভাগ করা হয়। এর প্রতিটি অংশকে ‘নিসফ’ বলা হয়। এর অর্থ অর্ধেক বা অর্ধাংশ। প্রতিদিন এতটুকু পরিমাণ তিলাওয়াত করলেও প্রতি দুই মাসে এক খতম হয়। এর এক-তৃতীয়াংশ ও দুই-তৃতীয়াংশ প্রতিদিন পড়লেও প্রতি তিন মাসে একবার খতম হবে।
সর্বশেষ আসে এক-চতুর্থাংশ। যদি কেউ প্রতিদিন এটুকুও তিলাওয়াত করেন, তাহলেও প্রতি চার মাসে তার এক খতম হবে। নিয়মিত তিলাওয়াত ও খতমের জন্য এর চেয়ে কম কোনো অংশ নেই। (হক্কুুল কোরআন)। কোরআন তিলাওয়াতে যেমন সওয়াব, কোরআন পাঠ-শ্রবণেও একই রকম সওয়াব। খতমে তারাবি এই সওয়াব লাভের এক সুবর্ণ সুযোগ।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে ইমাম বুখারি (৪৬১৪) বর্ণিত হাদিস: ‘জিবরাইল (আ.) নবী করিম (সা.)-এর কাছে প্রতিবছর একবার কোরআন পাক পেশ করতেন। আর যে বছর তিনি মারা যান, সে বছর দুবার পেশ করেন।’
ইবনে কাছির (রহ.) ‘আল-জামে ফি গারিবিল হাদিস’ গ্রন্থে (৪/৬৪) বলেন: অর্থাৎ তিনি তাঁকে যতটুকু কোরআন নাজিল হয়েছে, ততটুকু পাঠ করে শোনাতেন।
রমজান মাসে তারাবি নামাজ জামাতে পড়া ও সম্পূর্ণ কোরআন শরিফ একবার খতম করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। এ নামাজে কোরআন শরিফ খতম করা অধিক সওয়াবের কাজ। তারাবির নামাজে প্রতিদিন ২০ রাকাতে ২০ রুকু করে পড়লে ২৭ রমজান লাইলাতুল কদরে পবিত্র কোরআনের সম্পূর্ণ অংশ যাতে পাঠ করা সমাপ্ত হয়, সেদিকে ইমাম সাহেবদের বিশেষভাবে খেয়াল রাখা দরকার।
নবী করিম (সা.) বেশিরভাগ সময় রাতের শেষাংশে তারাবি আদায় করতেন এবং প্রথমাংশে বিশ্রাম নিতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) সর্বদা তারাবি নামাজ আদায় করতেন। তবে তিনি মাত্র চার রাত তারাবি নামাজ জামাতে পড়েছিলেন; কারণ যদি তিনি সর্বদা জামাতে তারাবি নামাজ আদায় করতেন, তাহলে তাঁর উম্মতরা ভাববেন যে, হয়তো এ তারাবি নামাজ ফরজ। হাদিস শরিফে বর্ণিত, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) দুই রাতে ২০ রাকাত করে তারাবি নামাজ পড়িয়েছেন। তৃতীয় রাতে লোকজন জমা হলেও তিনি উপস্থিত হননি। পরদিন সকালে তিনি ইরশাদ করেন, ‘আমি তোমাদের ওপর তারাবি নামাজ ফরজ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করেছি। তখন তো তা তোমাদের জন্য কষ্টকর হবে।’
তারাবির নামাজের মাসায়েল
যদি কেউ মসজিদে এসে দেখেন, এশার জামাত হয়ে গেছে এবং তারাবি শুরু হয়ে গেছে, তখন তিনি একা একা এশার নামাজ পড়ে তারপর তারাবির জামাতে শরিক হবেন। এরই মধ্যে যে তারাবির নামাজ ছুটে গেছে, তা তিনি জামাতে তারাবি শেষ করে পড়ে নেবেন। তারাবির জামায়াতে শরিক হতে না পারলে একাকী তারাবিহ পড়ে নিতে হবে। ২৭ রমজানে তারাবি খতম হওয়ার পর বাকি দিনগুলোয় অনেকে তারাবি পড়েন না। এটি ঠিক নয়। অথচ সেগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে রমজান মাসের শেষ ১০ দিনের বেজোড় রাতগুলোয় পবিত্র শবেকদর নির্দিষ্ট করা আছে। তাই পুরো রমজান মাসের তারাবির নামাজ আদায় করা প্রত্যেক মুমিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
পবিত্র কোরআন পাঠের মাধ্যমে তারাবির নামাজ আদায়সহ সময়মতো সাহরি ও ইফতার করাসহ অন্যান্য ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের তাঁর নৈকট্য অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।

সর্বশেষ..