মায়ের প্রতি ভালোবাসা কি জন্মগত?

মায়ের সঙ্গে সন্তানের নাড়ির সম্পর্ক। এ সম্পর্ক আত্মার, রক্তের ও ভালোবাসার। তবু সব সন্তানই কি মায়ের প্রতি একই রকম প্রগাঢ় টান অনুভব করে, একই রকম ভালোবাসে? অবশ্যই না। কিন্তু সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসা বলা যায় সব যুগে, সব দেশে প্রায় একই রকম। আজ বিশ্ব মা দিবস। মাকে ভালোবাসার জন্য বিশেষ দিনের প্রয়োজন নেই অবশ্য। কিন্তু মায়ের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য কতটুকু পালন করতে পারছি সে ভাবনাটি একবার অন্তত ঝালাই করে নেওয়াই যায় এ দিনটিতে।
পৃথিবীতে সন্তান জš§ দেওয়া ও মা হওয়া সবচেয়ে কষ্টের কাজÑএটা সবাই জানলেও অনুধাবন করতে পারেন কেবল মায়েরাই। শুধু সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময়ই নয়, পুরো ৯টি মাসই সীমাহীন যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে কাটে তার প্রতিটি মুহূর্ত। সন্তান জš§ দিয়েও নিস্তার নেই। এ তো কেবল কষ্টকাব্যের সূচনাপর্ব। অসহায় শিশুটিকে নিখাদ ভালোবাসা ও নিবিড় যতেœ বাঁচিয়ে রাখেন, গড়ে তোলেন মা। শুধু তা-ই নয়, সারাটি জীবন ধরে সন্তানের দুঃখের ভার বয়ে চলেন তিনি। কঠোর পৃথিবীর আঘাত-বঞ্চনা যতবার আমাদের ক্লান্ত ও হতাশ করে ফেলে, ততবারই প্রাণ জুড়াতে, সান্ত¡না খুঁজে পেতে আমরা ফিরে আসি মায়ের বুকে। কিন্তু মায়ের কষ্ট লাঘব করতে কতটুকু সজাগ আমরা? আর ঠিক কবে থেকে ভুলতে বসেছি যে মায়ের মনেও কিছু অতৃপ্তি, কিছু চাওয়া থাকতে পারে?
মায়ের ভালোমন্দ নিয়ে ভাবার অভ্যাসটা তৈরি হয় শৈশব থেকেই। আর এ অভ্যাস গড়ে তুলতে পরিবারের অন্য সদস্যের পাশাপাশি মুখ্য ভূমিকা নিতে পারেন মা নিজেই। শিশুদের উপদেশ দিয়ে আসলে কিছু শেখানো যায় না। আচরণ ও কাজের মাধ্যমে তাদের সামনে নৈতিক শিক্ষা ও কর্তব্যবোধের দৃষ্টান্ত তুলে ধরতে হয়। এভাবেই তাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ ও সংযম গড়ে ওঠে। নিজের মা-বাবাকে দাদা-দাদি ও নানা-নানির প্রতি যথাযথভাবে কর্তব্য পালন করতে দেখে বড় হচ্ছে যে শিশু, সে যে মা-বাবার প্রতি কর্তব্যপরায়ণ ও যতœশীল হবেÑএমন আশা করাই যায়।
অন্যদিকে মা-বাবার সঙ্গে আপনার দেখা-সাক্ষাৎ যদি কেবল গরমের ছুটি, যোগাযোগ বলতে সপ্তাহে দু’একবার ফোনে কথা আর কর্তব্য শুধু মাসকাবারি টাকা পাঠানো পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে আপনার সন্তানও একেই মানদণ্ড ধরে নেবে। সন্তানের সঙ্গে আপনার সম্পর্কের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। এমনকি তা স্থায়ী হতে পারে সারাজীবন। এজন্যই অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে পা রাখতে না রাখতেই মা-বাবার সঙ্গে সম্পর্ক ঢিলে হয়ে পড়ে সন্তানদের। মা তখন ‘টেকেন ফর গ্রান্টেড’। মায়ের সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির জন্য ন্যূনতম কৃতজ্ঞতাও অনুভব করে না এ বয়সের অধিকাংশ ছেলেমেয়েরা। এর পেছনে বয়োসন্ধিজনিত কিছু জটিলতাও কাজ করে অবশ্য। তাই এ সময় সন্তানের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করার ব্যাপারে বিশেষত মায়েদের বেশি সজাগ থাকা দরকার। এ অদ্ভুত বিপন্ন সময়ে আবারও শক্ত হাতে সন্তানের পাশে দাঁড়াতে হবে। না হলে এটি এমন একটি সময় যখন বেশিরভাগ সন্তানের সঙ্গে মা-বাবার আবেগিক দূরত্ব তৈরি হয়।
যে ত্যাগ-তিতিক্ষা মা-বাবা সারাজীবন আমাদের জন্য করেন তা ভাবলে কৃতজ্ঞ না হয়ে পারা যায় না। কিন্তু এ ভাবনাটি হৃদয়ে জাগরূক রাখা ও কর্তব্যবোধ তৈরি করাও চর্চার ব্যাপার। অনেকে আর্থিক সঙ্গতির দোহাই দিয়ে দায়িত্ব থেকে নিষ্কৃতি পেতে চায়। মা-বাবার প্রতি ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে আর্থিক সচ্ছলতা খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। এ কথা জোর দিয়ে বলতে পারি, কারণ অনেক সচ্ছল পরিবারের মায়েরাও সন্তানের অবহেলা পাচ্ছেন। এমনকি অপুষ্টির অভাবে অকালে নানারকম বার্ধক্যজনিত রোগের শিকার হচ্ছেন মায়েরা। ক’জন সন্তান নিয়মিত খোঁজ রাখেন তার মা পুষ্টিকর খাবার খাচ্ছেন কিনা, বা রাতে তার ভালো ঘুম হয় কিনা? দামি মোবাইল ফোনের বায়না ধরা কিশোর কি কাক্সিক্ষত ফোনের বাজেট থেকে অর্ধেক কমিয়ে মায়ের জন্য একটি ওয়াশিংমেশিন কেনার কথা ভাবে? ফোনটা একটু কম দামি হলে বিনোদনে ঘাটতি পড়বে খুব সামান্যই। কিন্তু বাড়িতে একটি কাপড় ধোয়ার যন্ত্র থাকলে কতটা কষ্টের হাত থেকে বেঁচে যেতে পারেন মা তা ভাবা উচিত প্রতিটি সন্তানের। যিনি পরিবারের জন্য সর্বাধিক ত্যাগ ও কষ্ট স্বীকার করেন, সেই মায়ের সুখ-সুবিধা ও আরাম-আয়েশকে অগ্রাধিকার দিতে জানতে হবে প্রতিটি সন্তানকে। আর এ শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব মা, বাবা ও পরিবারের সবার।
পাশাপাশি মায়ের মানসিক ও আবেগিক চাহিদা নিয়েও ভাবতে হবে সন্তানকে। যে কোনো প্রয়োজন বা আকাক্সক্ষার কথা সন্তানের কাছে প্রকাশ করতে পারেন মায়ের মনে এমন ভরসা তৈরি করতে হবে। মায়েরা সারাজীবন সন্তানসহ পরিবারের সবার আবদার মিটিয়ে চলেন। তাই শেষ বয়সে মুখ ফুটে কিছু চেয়ে নিতে অধিকাংশ মায়েরাই সংকোচে গুটিয়ে যান। এজন্য সন্তানকেই এগিয়ে যেতে হবে। নিয়মিত গল্প করে, একসঙ্গে সময় কাটিয়ে মায়ের মনের সংকোচ দূর করাই আদর্শ সন্তানের কাজ। মায়ের আসলে চাওয়ার মতো খুব বেশি কিছু থাকে না। সন্তানের কাছ থেকে একটু সময়, যত্ন আর শিশুসুলভ দুটি আবদার পূরণ এতেই তাদের মন কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। মা দিবসে তাই নতুন করে ভাবুন, মাকে খুশি করার জন্য নিজের করণীয়টুকু করছেন কিনা; সন্তানকেই বা মায়ের প্রতি যত্ন বান হওয়া শেখাতে পারছেন কতটুকু।

শামসুন নাহার রাখী