মিষ্টি কুমড়োর আধুনিক চাষাবাদ

স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী মিষ্টি কুমড়ো। কৃষি-কৃষ্টির আজকের আয়োজন সবজিটির নানা দিক নিয়ে

মিষ্টিকুমড়া বর্ষজীবী লতানো উদ্ভিদ। এর ইংরেজি নাম সুইট পামকিন। দেশের প্রায় সব অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজির চাষ করা হয়, যেগুলোর মধ্যে মিষ্টিকুমড়ো অন্যতম। বছরজুড়ে বাড়ির আঙিনায় ও মাঠে চাষ করা যায়। কচি মিষ্টিকুমড়ো এবং পাকা ফল দীর্ঘদিন রেখে সবজি হিসেবে খাওয়া যায়। এছাড়া এর শাকও খাওয়া যায়। দেশের প্রায় সব অঞ্চলে মিষ্টিকুমড়ো জš§ায়। বর্তমানে দেশের অনেক স্থানে ব্যবসায়িক ভিত্তিতে মিষ্টিকুমড়ো চাষ ও বাজারজাত করা হচ্ছে।

মাটি ও আবহাওয়া
জৈব পদার্থসমৃদ্ধ দোঁআশ বা এঁটেল দোঁআশ মাটি কুমড়ো চাষের জন্য উত্তম। তবে চরাঞ্চলের পলি মাটিতে মিষ্টিকুমড়োর ভালো ফলন হয়। দেশের আবহাওয়ায় বছরের যে কোনো সময় মিষ্টিকুমড়োর রোপণ করা যায়।

চারা উৎপাদন

পলিব্যাগে মিষ্টিকুমড়োর চারা উৎপাদনের ক্ষেত্রে তিন থেকে চার সেন্টিমিটার আকারের পলিব্যাগ ব্যবহার করতে হবে

অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের জন্য ছিদ্রযুক্ত পলিব্যাগ ব্যবহার করতে হবে

প্রথমে অর্ধেক মাটি ও অর্ধেক গোবর মিশিয়ে মাটি তৈরি করে নিতে হবে এবং তা পলিব্যাগে ভরতে হবে

প্রতি ব্যাগে দুটি করে বীজ বুনতে হবে এবং বীজের আকারের দ্বিগুণ মাটির গভীরে বীজ পুঁতে দিতে হবে

চারা রোপণ

বীজ গজানোর পর ১৫ থেকে ১৬ দিন বয়সের চারা মাঠে লাগানোর জন্য ভালো

পলিব্যাগের ভাঁজ বরাবর ব্লেড দিয়ে কেটে পলিব্যাগ সরিয়ে মাটির দলাসহ চারাটি নির্দিষ্ট জায়গায় লাগিয়ে চারপাশে মাটি দিয়ে ভরাট করে দিতে হবে। চারা লাগানোর পর গর্তে পানি দিতে হবে। তবে জমিতে হেক্টরপ্রতি সাত থেকে আট কেজি বীজ প্রয়োজন হয়। শীতকালীন ফসলের জন্য অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর এবং গ্রীষ্মকালীন ফসলের জন্য ফ্রেরুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত বীজ বোনার উপযুক্ত সময়। তবে বীজ উৎপাদনের জন্য নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে বীজ বপন করা উত্তম।

জাত
সুপ্রিমা: এটি একটি হাইব্রিড জাত। এটি চ্যাপ্টা, গোলাকার, বেশ পুরু ও গাঢ় হলুদ। ওজন চার থেকে পাঁচ কেজি। কাঁচা ও পাকা দুভাবেই খাওয়া যায়।
সুইটি: এটি একটি দিবস নিরপেক্ষ হাইব্রিড জাত। এটি বছরজুড়ে চাষযোগ্য। চ্যাপ্টা এবং বেশ পুরু ও গাঢ় হলুদ। ওজন সাত থেকে আট কেজি। কাঁচা ও পাকা দুভাবেই খাওয়া যায়।
ড্রিমগোল্ড: বছরজুড়ে চাষযোগ্য। বেশ পুরু এবং ওজন পাঁচ থেকে ছয় কেজি। কাঁচা ও পাকা দুভাবেই খাওয়া যায়।
সলিড গোল্ড: হালকা খাঁজযুক্ত। পুরু এবং গাঢ় হলুদ বর্ণের। ওজন পাঁচ থেকে ছয় কেজি। এটি রাজশাহী অঞ্চলে বেশি চাষ হয়।
সার প্রয়োগ: জমি তৈরির সময় জৈব সার, টিএসপি, দস্তা, ম্যাগনেসিয়াম ও বোরিক এসিড, ইউরিয়া ও এমওপি প্রয়োজনমতো প্রয়োগ করতে হবে।

পোকামাকড় দমন
মাছিপোকা: এই পোকা মিষ্টিকুমড়োর কচিফল ও ফুলের মধ্যে প্রথমে ডিম পাড়ে। পরে ডিম থেকে কীড়া বের হয়ে ফল ও ফুলের ভেতর ধীরে ধীরে খেয়ে ফেলে এবং ফল ও ফুল পচন ধরে নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে প্রায় ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়।
দমন: আক্রান্ত ফল সংগ্রহ করে নষ্ট করে ফেলতে হবে এবং জমি পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। মাছির আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষা করার জন্য বিষটোপ অত্যন্ত কার্যকর।
রেড পামকিন বিটল: এটি চারাগাছের পাতায় ফুটা করে এবং পাতার কিনারা থেকে খাওয়া শুরু করে এবং ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ পাতা খেয়ে ফেলে। এটি ফুল ও কচি ফলেও আক্রমণ করে।
দমন: চারা আক্রান্ত হলে হাত দিয়ে পূর্ণবয়স্ক পোকা মেরে ফেলতে হবে।
জাবপোকা: এটির আক্রমণে বাড়ন্ত ডগা ও পাতা হলুদ হয়ে যায় এবং গাছ সতেজ ভাব হারিয়ে ফেলে। ফলে পাতা বিকৃত হয়ে যায়, বৃদ্ধি ব্যাহত হয় ও নিচের দিকে পাতা কোঁকড়ানো দেখা যায়। মেঘলা, কুয়াশাচ্ছন্ন ও ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় জাবপোকার বংশ বৃদ্ধি বেশি হয়।
দমন: প্রাথমিক অবস্থায় আক্রান্ত পাতা ও ডগার জাবপোকা হাত দিয়ে পিষে মেরে ফেলতে হবে। সাবানগোলা পানি স্প্রে করলে এ পোকার আক্রমণ অনেকাংশে কমে যায়।
সাদা গুঁড়া রোগ: বয়স্ক পাতায় এ রোগ প্রকাশ পায়। পরে ওপরের ও নিচের পাতায় রোগ ছড়িয়ে পড়ে, ফলে পাতার ওপর বিক্ষিপ্ত সাদা সাদা দাগের সৃষ্টি হয়। রোগ বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে দাগ আকারে বড় হতে থাকে এবং হলুদ বর্ণ থেকে বাদামি রং ধারণ করে। রোগের প্রকোপ বেশি হলে গাছের লতা ও কাণ্ড আক্রান্ত হয়।
দমন: জমির আশেপাশে কুমড়োজাতীয় যে কোনো সবজি চাষ থেকে বিরত থাকতে হবে। আগাম চাষ করে রোগের প্রকোপ কমানো যায়। প্রতি ১০ লিটার পানিতে ২০ গ্রাম ইনসাফ বা থিয়ভিট বা সালফোলাঙ বা কুমুলাস ১৫ দিন পরপর স্প্রে করতে হবে।

পরিচর্যা

গাছে ফুল আসার সময় কোনো ধরনের কীটনাশক প্রয়োগ করা যাবে না, কারণ ওই সময় বিভিন্ন ধরনের কীটপতঙ্গ ফুলে ফুলে উড়ে বেড়ায়। যেসব মিষ্টিকুমড়ো ক্ষেতে কীটপতঙ্গের সংখ্যা বেশি থাকে, সেসব ক্ষেতে কুমড়োর সংখ্যা বাড়ে।

প্রতি জারে দুটি সবল চারা রেখে বাকিগুলো উঠিয়ে ফেলতে হবে। আর লতা বাওয়ার জন্য মাচা দেওয়া ভালো। তবে রবি ফসলে মাচা না দিলেও গাছ মাটিতে বায় ও ভালো ফলন পাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে কুমড়োর কড়ার নিচে খড়বিচালি বিছিয়ে দিলে পচন থেকে রক্ষা পায়।

মাটিতে রস না থাকলে সেচ দেওয়া উচিত। প্রয়োজন অনুযায়ী প্রথম অবস্থায় সাত থেকে ১০ দিন অন্তর সেচ দেওয়া ভালো। গাছ চারদিকে ছড়িয়ে গেলে তখন সেচ দেওয়া বা নিড়ানি দেওয়ার প্রয়োজন হয় না।

ফল সংগ্রহ ও ফলন
সাধারণত কুমড়ো জমিতে পাকিয়ে তোলা হয়। যখন কুমড়োর উপরিভাগ হলদে হয়ে আসবে, তখন কেটে তুলে ফেলা উচিত। ফলে বেশি দিন গুদামজাত করা যায়। কুমড়োর ভেতরের রং যত লাল হবে ততই মিষ্টি এবং ক্যারোটিনসমৃদ্ধ হবে। আবার অন্যদিকে কাঁচা থাকতে তোলা হয়। ওগুলো বেশি দিন গুদামজাত করা যায় না।

উৎস: ই-কৃষি তথ্য এবং ন্যাশনাল
এমার্জেন্সি সার্ভিস

পুষ্টিগুণে ভরপুর
খাদ্যতালিকায় নিয়মিত মিষ্টিকুমড়ার উপস্থিতি আপনাকে রাখতে পারে অনেক অসুখ-বিসুখ থেকে দূরে। কেননা মিষ্টিকুমড়া এমন একটি সবজি,
যার রয়েছে নানাবিধ পুষ্টিগুণ। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট-সমৃদ্ধ মিষ্টিকুমড়া ক্যানসার প্রতিরোধে সাহায্য করে। এছাড়া এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কোলেস্টেরল কমিয়ে রাখতে সাহায্য করে। ফলে আর্টারির দেয়ালে চর্বির স্তর জমতে বাধা দেয়। নিয়মিত মিষ্টিকুমড়া খেলে হƒদরোগও প্রতিরোধ করা যায়। চকচকে উজ্জ্বল চুল ও সুন্দর ত্বকের জন্য নিয়মিত সবজিটি খেতে পারেন।

মিষ্টিকুমড়ায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন ‘এ’। বিটাক্যারোটিন-সমৃদ্ধ এই সবজিটি তাই চোখের জন্য খুবই ভালো। বয়সজনিত রোগ, বিশেষ করে রেটিনার বিভিন্ন অসুখ প্রতিরোধে এটি ভূমিকা রাখে।

গাজরের তুলনায় মিষ্টিকুমড়ায় অধিক পরিমাণে বিটাক্যারোটিন আছে। গাজরে যেখানে ১৩ মিলিগ্রাম বিটাক্যারোটিন রয়েছে, মিষ্টিকুমড়ায় রয়েছে ৩৩ মিলিগ্রাম বিটাক্যারোটিন। এই বিটাক্যারোটিন এক ধরনের শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। শরীরের ফ্রি রেডিক্যাল ড্যামেজ প্রতিরোধে সবজিটি উপকারী। বিভিন্ন দূষণ, স্ট্রেসসহ খাবারে যেসব কেমিক্যাল ও ক্ষতিকর উপাদান থাকে, সেগুলোর কারণে ফ্রি রেডিক্যাল ড্যামেজ হতে শুরু করে। ফলে শরীরের ভালো কোষগুলো নষ্ট হতে শুরু করে, খারাপ কোষের সংখ্যা বেড়ে যায়। সবুজ, কমলা, হলুদ রঙের এই
সবজিতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ফ্রি ড্যামেজ প্রতিরোধ করে।

অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট-সমৃদ্ধ মিষ্টিকুমড়া ক্যানসার প্রতিরোধে সাহায্য করে।ফলে আর্টারির দেয়ালে চর্বির স্তর জমতে বাধা দেয়।

মিষ্টিকুমড়ায় রয়েছে প্রচুর ভিটামিন সি, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তুলে সর্দি-কাশি, ঠাণ্ডা লাগা প্রতিরোধ করে। পাশাপাশি এই ভিটামিন চুল ও ত্বক ভালো রাখে। একই সঙ্গে চকচকে উজ্জ্বল চুল ও সুন্দর ত্বকের জন্য নিয়মিত মিষ্টিকুমড়া খেতে পারেন ।

মিষ্টিকুমড়ায় ক্যালোরির পরিমাণ খুবই কম। তাছাড়া এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ম্যাগনেসিয়াম ও পটাসিয়ামÑযা হাইপারটেনশন ও হƒদরোগ দূরে রাখে। এর বিভিন্ন উপাদান ইউরিনেশনের সমস্যা কমায় ও কিডনিতে পাথর সৃষ্টিতে বাধা দেয়।

সবজিটিতে প্রচুর পরিমাণে আঁশ থাকায় তা সহজে হজম হয়। হজমশক্তি বৃদ্ধি ও কোষ্টকাঠিন্য দূর করতে মিষ্টিকুমড়ার জুড়ি নেই।

এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে জিংক ও আলফা হাইড্রোক্সাইড। জিংক ইমিউনিটি সিস্টেম ভালো রাখে ও অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধে সাহায্য করে।

প্রদাহ হ্রাস
কুমড়া বাতের ব্যথাসহ দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার প্রশমন ঘটায়।

গর্ভস্থ সন্তানের জন্য
কুমড়া ও কুমড়ার বীজ গর্ভবতী মায়েরা তাদের সন্তানের সুস্বাস্থ্যের জন্য নির্দ্বিধায় খেতে পারেন। মায়েদের রক্তস্বল্পতা রোধ করে অকাল প্রসবের সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়।

ওজন নিয়ন্ত্রণ করে
কম ক্যালোরি ও উচ্চ আঁশযুক্ত খাবার মিষ্টিকুমড়া ওজন কমানোর একটি উপযুক্ত খাবার। দেহের বাড়তি মেদ ঝরাতেও সহায়তা করে।

মফিজ জোয়ার্দ্দার

উত্তর আমেরিকায় সবচেয়ে ভারীও প্রথম
বেলজিয়ান কুমড়াটির কথা ভুলে যান। কেননা, গত মাসের শুরুতে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাম্পশায়ার অঙ্গরাজ্যের একটি মিষ্টিকুমড়া। বলা হচ্ছে ছবির কুমড়াটি উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে বড় ও ভারী, বিশ্বে দ্বিতীয়। গ্রেট পাম্পকিন কমনওয়েলথ নামের বৈশ্বিক সংগঠন এ স্বীকৃতি দিয়েছে।
এই মিষ্টিকুমড়াটি চাষ করেছেন স্টিভ গিডেস। কুমড়া নিয়ে অনুষ্ঠিত ডিয়ারফিল্ড ফেয়ার নামের একটি মেলায় অংশ নেন তিনি। সেখানে দেখা যায়, এর ওজন দুই হাজার ৫২৮ পাউন্ড। প্রতিযোগিতায় এর দাম নির্ধারণ করা হয় ছয় হাজার ডলার।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় কুমড়াটির মালিক বেলজিয়ামের ম্যাথিয়াস উইলিমিন্স। তার উৎপাদিত সবজিটির ওজন ছিল দুই হাজার ৬২৪ দশমিক ছয় পাউন্ড। ২০১৬ সালে জার্মানির লুডউইসবার্গে এর চাষ করেন তিনি।
১০ বছর আগে কুমড়া চাষাবাদে আগ্রহী হন গিডেস। শখে পরিণত হয় কুমড়া চাষ। এজন্য এক বন্ধুর কাছে কৃতজ্ঞ তিনি। আগামী দিনগুলোয় নিউইয়র্কের বোটানিক্যাল গার্ডেনে চাষাবাদের পরিকল্পনা রয়েছে তার।

বোস্টন গ্লোব অবলম্বনে রাহুল সরকার