ধারাবাহিক

মিস্টার মার্কেট

মিজানুর রহমান শেলী: মিস্টার মার্কেটের আরও একটি প্রীতিকর বৈশিষ্ট্য রয়েছে, সে কখনোই তোমাকে এড়িয়ে যাবে না। কখনোই তোমাকে অবজ্ঞা বা অবহেলা করবে না। যদি তার কোনো উদ্ধৃতি তোমার কাছে আজ মজাহীন মনে হয়, তবে সে তোমার কাছে আগামীকাল কোনো নতুন কিছু নিয়ে হাজির হবে। লেনদেন খুব কড়াকড়িভাবে তোমার পছন্দের আওতায় রাখতে হবে। এই শর্তগুলোর মধ্যে তার আচরণ যত বেশি খেদো-বিষণœতায় পৌঁছে যাবে তুমি তত বেশি লাভবান হবে।
কিন্তু বলে সিনড্রেলার মতো তোমাকে একটি সতর্কতা অবশ্যই মেনে চলতে হবে অথবা তোমার সবকিছু বিলেতি কুমড়া আর ইঁদুরে পরিণত হবে। সতর্কতাটা হলো, মিস্টার মার্কেট সেখানে তোমাকে সেবা দেওয়ার জন্য থাকবে। কিন্তু সে তোমাকে পথ দেখাবে না, কোনো নির্দেশনা দেবে না। এটা তার পকেট বই, কিন্তু এটা তার জ্ঞান বা প্রজ্ঞা নয়। তবে যদি তুমি তা হস্তগত করতে পার নিঃসন্দেহে তুমি লাভবান হবে। যদি তুমি তাকে দেখ যে, সে কিছু দিন নিজেকে এক বিশেষ ধরনের বোকা মেজাজে তোমার কাছে উপস্থাপন করছে, এক্ষেত্রে তুমি স্বাধীন, তার কাছ থেকে তুমি তোমার সুবিধা আদায় করেও নিতে পার অথবা তুমি চাইলে তাকে এড়িয়ে চলতে পার। কিন্তু তুমি একবার যদি তার প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে পড় তবে মারাত্মক এক বিপদ তোমাকে ছেয়ে ধরবে।
হ্যাঁ এটা খুব কার্যকর বিষয়, তুমি যখন দেখবে তুমি আসলে মিস্টার মার্কেটকে চিনতে পারছ না, তাকে বুঝতে পারছ না এবং তুমি তোমার ব্যবসার মূল্যমানও নির্ণয় করতে পারছ না, তবে তোমার উচিত হবে মিস্টার মার্কেটের কাছ থেকে যোজন যোজন দূরে থাকা। এমনকি ওই খেলায় তুমি অবশ্যই নিজেকে জড়াবে না। যেভাবে পোকারে বলা হয়, ‘যদি তুমি ইতোমধ্যে খেলায় ঢুকে পড়েছ, আর তুমি জানো না কে আসলে প্যাটসি, তাহলে তুমিই প্যাটসি’।
বেনের মিস্টার মার্র্কেট নামের এই কল্পচরিত্রটি আজকের দিনের বিনিয়োগী বাজারে সেকেলে বলে মনে হতে পারে। কেননা, বেশিরভাগ পেশাদার ও একাডেমিশিয়ানরাই আজ বাজারের কার্যকারিতা নিয়ে কথা বলছে, কথা বলছে বহুমাত্রিকতা, বৈচিত্র্য নিয়ে এবং বেটা তত্ত্ব নিয়ে। এরকম বিষয়-আশয়ে তাদের স্বার্থ খুব পরিষ্কারভাবে বোধগম্য। কেননা, বিনিয়োগী উপদেশের সরবরাহকারী বা ফেরিওয়ালাদের কাছে কৌশলগুলোর গুঢ়রহস্য একটি মূল্য লাভ করেছে।
বলা চলে কোনো জাদুকরী ডাক্তার রোগীকে কেবল ‘দুটি এসপিরিন সেব্য’ পরামর্শ দিয়েই তার জীবনের খ্যাতি ও ভাগ্য লুফে নিতে পেরেছে। বিনিয়োগী পরামর্শের ভোক্তাদের কাছে ইস্টোরিকার বাজার মূল্যের গল্প একটি ব্যতিক্রম বিষয়। আমার মতে, বিনিয়োগের সাফল্য কোনো গুপ্ত সূত্র ও কম্পিউটার প্রোগ্রাম থেকে উৎপন্ন হয় না। এমনকি তা স্টক ও বাজারের দামের হামভাব থেকে যে ঈঙ্গিত ছড়িয়ে পড়ে তার ওপরও নির্ভর করে না। বরং একজন বিনিয়োগকারী সফল হবেন তখন যখন তিনি কোনো ভালো ব্যবসা জ্ঞানের সঙ্গে এমন একটি যোগ্যতাকে যুক্ত করতে পারবেন যে যোগ্যতা তারে চিন্তা ও আচরণকে উচ্চ-সংক্রামিত আবেগ থেকে আলাদা রাখবে। কেননা, এই আবেগ তাকে পুরো বাজারের চারদিকে কেবল তাকে ঘুড়িয়ে নিয়ে বেড়াবে। এরকম পৃথকীকরণে আমি যখন নিজের প্রচেষ্টায় চালিয়েছি, তখন আমি এর প্রবল কার্যকারিতা খুঁজে পেয়েছি। আর এটা বেনের মিস্টার মার্কেট ধারণাকে আমার মাথায় প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছে।
বেনের শিক্ষা অনুসরণ করে, চার্লি ও আমি আমাদের বাজারজাতযোগ্য ইকুইটিকে আমাদের সঙ্গে কথা বলতে শিখিয়েছি। এটা সম্ভব হয়েছে এর পরিচালনা ফলাফলের ওপর। এমনকি এ ফলাফল নিত্যদিনের কিংবা বার্ষিক দাম উদ্ধৃতির মাধ্যমে নয়। তবে এক্ষেত্রে আমাদের ব্যবসার সফলতা কিংবা বিফলতাটা মূল কথা ছিল না।
বাজার কখনও কখনও ব্যবসায় সাফল্যকে কিছু সময়ের জন্য এড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু পরিশেষ এটা সমাধা হয়। বেনের ভাষ্য মতে, ‘স্বল্পমেয়াদে বাজার একটি ভোটযন্ত্রে পরিণত হয় আর দীর্ঘমেয়াদে এটি হয় ওজন মাপার যন্ত্র’। যে গতিতে ব্যবসা চললে ব্যবসায় সাফল্য আসে বলে সবার জানা, তার গতি আরও বাড়িয়ে নেওয়ার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো যতদূর পর্যন্ত সম্ভব কোম্পানির ইনট্রিনসিক ভ্যালু বা স্বকীয় মূল্য বাড়াতে থাকা। কার্যত ধীর উপলব্ধি কিছু সুবিধা বয়ে আনতে পারে। এটা আমাদের অনেক বেশি ভালো কিছু কেনার সুযোগ করে দেয়, সাধারণত যা কিছু দামদর করে কিনতে হয়।
অবশ্যই কিছু সময়, বাজার একটি ব্যবসাকে আরও বেশি মূল্যমানের হয়ে ওঠার জন্য বাজারের চলমান প্রান্তিক দামের চেয়ে ইতিবাচক মূল্যায়ন করতে পারে। এরকম পরিস্থিতে, আমরা আমাদের অধিকারকে বিক্রি করে দেব। কিছু সময় আমরা আমাদের সিকিউরিটি একটি ন্যায্য মূল্যে বিক্রি করব অথবা নি¤œমূল্যেও বিক্রি করতে হতে পারে। কেননা, আমরা সবসময় চাই চলতি দরের চেয়ে কম দরে কোথাও বিনিয়োগ করতে। এমনকি সেসব জায়গায় বেশি পরিমাণে বিনিয়োগ করতে চাই। আর আমরা যখন কোনো কিছুকে আরও বেশি ভালো ব্যবসা বলে মনে করি, তখনই চলমান ব্যবসা বিক্রি করে নতুন কম দরের ব্যবসায় বেশি বিনিয়োগ করি।
যাহোক, আমরা কেবল এই উদ্দেশ্যে আমাদের হোল্ডিংস বেচে দিই না যে তা আর বেশিদিন ধরে রাখতে পারছি নাÑঅনেকদিন ধরে রাখা হলো কিংবা তার মূল্য আগের চেয়ে বেড়ে গেছে। ওয়ালস্ট্রিট ম্যাক্সিমের একটি উদ্ধৃতি আমি এখানে উল্লেখ করার লোভ সামলাতে পারছি না। বলা হয়েছে, ‘একটি লাভের লোভে তুমি নিজেকে সর্বস্বান্ত করে দিতে পার না’। আমরা যে কোনো সিকিউরিটি অনিশ্চিতভাবে হলেও ধরে রাখতে সন্তুষ্ট হয়ে থাকি ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ এর ইকুইটি মূলধনের সম্ভাব্য রিটার্ন প্রান্তিক দামের তুলনা সন্তোষজনক থাকে, ব্যবস্থাপনায় কর্মনৈপুণ্য অক্ষুণœ থাকে এবং বাজার ওই ব্যবসার মূল্যমানকে অন্যায্যভাবে বাড়িয়ে না দেয়।
এই দর্শন রচনাবলি সম্পাদনা করেছেন লরেন্স এ. কানিংহ্যাম।
অনুবাদক: গবেষক, শেয়ার বিজ।

সর্বশেষ..