হোম প্রচ্ছদ মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সামান্যই

মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সামান্যই


Warning: date() expects parameter 2 to be long, string given in /home/sharebiz/public_html/wp-content/themes/Newsmag/includes/wp_booster/td_module_single_base.php on line 290

জাকারিয়া পলাশ: প্রতিবেশী মিয়ানমারের সঙ্গে মাত্র সাত কোটি ডলারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য রয়েছে বাংলাদেশের। এ সামান্য বাণিজ্য অর্থনীতির ওপর তেমন কোনো প্রভাব সৃষ্টি করছে না। এ অবস্থায় আরাকানের জাতিগত দ্বন্দ্বের কারণে সৃষ্ট রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যাকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বাংলাদেশের। দেশটির সঙ্গে বাণিজ্যের মাধ্যমে বাংলাদেশের সম্ভাব্য লাভের চেয়ে রোহিঙ্গা সমস্যা বড় ঝুঁকির মুখে ফেলছে। কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকরা মনে করছেন এমনটা।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে দেখা গেছে, দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যে বাংলাদেশের রফতানির চেয়ে আমদানি বেশি। তবে সার্বিকভাবে বাণিজ্যের পরিমাণ খুবই কম। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে রফতানি হয়েছে মাত্র দুই কোটি ৩৭ লাখ ডলারের পণ্য। আর আমদানি হয়েছে চার কোটি ৮০ লাখ ডলারের পণ্য। সব মিলিয়ে মোট বাণিজ্যের পরিমাণ সাত কোটি ডলারের কিছু বেশি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের এই বাণিজ্য অবশ্য আগের বছরগুলোর চেয়ে কম। প্রতিবেশী দেশ হলেও কূটনৈতিক সম্পর্কে অবনতির কারণে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য কমছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১০-১১ অর্থবছরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ছিল প্রায় ২৮ কোটি ডলারের। ২০১১-১২ অর্থবছরে এই পরিমাণ কমে দাঁড়ায় পৌনে আট কোটি ডলারে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে রফতানি অপরিবর্তিত থাকলেও আমদানি কিছুটা বেড়েছিল। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে আমদানি কমেছিল অর্ধেকেরও বেশি। সর্বশেষ ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দু’দেশের আমদানি-রফতানি মিলে মোট বাণিজ্য ছিল সাড়ে সাত কোটি ডলার। বাণিজ্যসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মিয়ানমারের সঙ্গে বাণিজ্যের বিষয়ে ইপিবির এই তথ্য অফিসিয়াল। দুই দেশের মধ্যে বেশ কিছু আন-অফিসিয়াল বাণিজ্য রয়েছে। তবে দু’দেশের বাণিজ্যের মোট পরিমাণকে বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনীতির আকারের তুলনায় সামান্য বলেই একে বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অগ্রাধিকার হিসেবে মনে করছেন না বিশেষজ্ঞরা।

এ প্রসঙ্গে সাবেক কূটনীতিক মোহাম্মদ জমির শেয়ার বিজকে বলেন, এই মুহূর্তে বাণিজ্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। ইস্যুটি এখানে মানবিক এবং নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট। ইসরাইলের কাছ থেকে অস্ত্র ও ট্যাংক কিনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তাদের বহরে যুক্ত করেছে বলে খবর এসেছে। সীমান্তে ল্যান্ডমাইন পুঁতে দেওয়া হচ্ছে। প্রতিবেশী দেশের এই বাড়তি অস্ত্র অবশ্যই বাংলাদেশের জন্য হুমকি। এ বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।

আরাকান থেকে এরই মধ্যে আসা বিপুল পরিমাণ (প্রায় তিন লাখ) রোহিঙ্গা শরণার্থীর বিষয়টি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় ব্যাপক শঙ্কা সৃষ্টি করতে পারে বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকরা। এ সংকটকালে দেশের খাদ্যসহ অন্য কোনো পণ্যের আমদানির জন্য বাংলাদেশকে বিকল্প গন্তব্য খোঁজারও পরামর্শ দিচ্ছেন তারা। এ অবস্থায় দেশের খাদ্যমন্ত্রীর চাল কেনার বিষয়ে সমঝোতা করতে মিয়ানমার যাওয়াকেও ভুল বলে মনে করছেন তারা।

এদিকে চরম সংকটকালেও ১০ লাখ টন চাল আমদানির জন্য সমঝোতা (এমওইউ) করতে মিয়ানমার গিয়েছিলেন খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম। কিন্তু মিয়ানমার সরকার এ সময়ে তিন লাখ টন চাল দিতে রাজি হয়েছে। এ-সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করে এসেছে বাংলাদেশ। গত বৃহস্পতিবার মিয়ানমারের রাজধানীতে ওই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। সমঝোতা অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় সংস্থা মিয়ানমার রাইস ফেডারেশন আগামী ছয় বছরে প্রতিবছর তিন লাখ টন চাল বাংলাদেশে সরবরাহ করবে। তবে ওই চালের দাম কত হবে, তা ঠিক হবে আরও পরে। এ চুক্তির মাধ্যমে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যে ঘাটতির পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পাবে। এর আগে মিয়ানমার বিভিন্ন দেশে বেসরকারি খাতের মাধ্যমে চাল রফতানি করত। বাংলাদেশের সঙ্গে এই প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমঝোতা স্মারক সই করল।

এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তারেক শামসুর রেহমান বলেন, বাংলাদেশের উচিত আর্থিক সম্পর্ক ছিন্ন করা। আশিয়ানভুক্ত মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া এরই মধ্যে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কথা বলেছে। আশিয়ানভুক্ত ওই দেশগুলোকে ব্যবহার করে আশিয়ানের অভ্যন্তর থেকে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হবে। মিয়ানমারে অনুষ্ঠিত সব মানবিক সংকটকে জাতিসংঘে সবিস্তারে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া দরকার এবং জাতিসংঘের কোনো ফোরামে অং সাং সুচির সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎও এড়ানো উচিত বলে তিনি মত দেন।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এ বিশ্লেষক বলেন, বাংলাদেশকে একা চলতে হতে পারে। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও তুরস্কের মতো দূরবর্তী সহযোগীকে কাছে পেলেও তা খুব বেশি নাও হতে পারে। অন্যদিকে ভারত ও চীনের মতো প্রতিবেশী এবং যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশ পাশে পাবে না। এ অবস্থায় সহযোগী দেশগুলোকে নিয়ে একটি টাস্ক কমিটি গঠন করা জরুরি। এ অবস্থায় দ্রুত উদ্যোগ না নিলে সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। অনেকেই মনে করছেন, বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমারকে নিয়ে বিসিআইএম নামের যে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের আলোচনা হচ্ছিল তা এই সংকটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমনকি চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড (ওবর) প্রকল্পের সঙ্গেও যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা হারাতে পারে বাংলাদেশ। তাই রোহিঙ্গা ইস্যুকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দ্রুত আলোচনায় আনার বিকল্প নেই বলেই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

উল্লেখ্য, আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি বা আরসা নামে একটি গোষ্ঠী গত ২৫ আগস্ট ভোরে রাখাইনের কয়েকটি পুলিশ চৌকিতে অতর্কিতে হামলা চালিয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়। এ হামলার অভিযোগ তুলে মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা অধ্যুষিত মংডু, রাথেডাং ও বোথেডাং এলাকায় অভিযান চালায়। ওই সেনা অভিযানে এ পর্যন্ত চার শতাধিক বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে, যার বেশিরভাগই রোহিঙ্গা। এর পরই বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা সদস্য নাফ নদী পেরিয়ে বাংলাদেশের কক্সবাজার এলাকায় আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে আসে। এর আগে কয়েক দশক ধরে কক্সবাজার এলাকায় নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছে বাংলাদেশে।