মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গাদের রক্ষায় বিশ্ব ব্যর্থ

জাতিসংঘ মহাসচিবের নিবন্ধ

শেয়ার বিজ ডেস্ক: মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর সেনাবাহিনীর ব্যাপক নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞের ঘটনাকে জাতিগত নিধন হিসেবে অভিহিত করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। একই সঙ্গে তাদের রক্ষায় ব্যর্থতার জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়কে দায়ী করেছেন তিনি। সম্প্রতি বাংলাদেশের রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরগুলো ঘুরে গিয়ে ওয়াশিংটন পোস্টে একটি নিবন্ধ লিখেছেন তিনি। তাতে এ অভিযোগ করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব।
রোহিঙ্গা নির্যাতনের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে অ্যান্তোনিও গুতেরেস লিখেছেন, সেখানে বাবা-মায়ের সামনেই ছোট শিশুদের হত্যা করা হয়েছে এবং ছোট মেয়ে ও নারীদের গণধর্ষণ করা হয়েছে। গ্রামগুলো জ্বালিয়ে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে নির্যাতনের যে বর্ণনা শুনেছেন তাতে স্বাভাবিক থাকা সম্ভব নয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এক রোহিঙ্গা মুসলিমের সামনেই তার বড় ছেলেকে গুলি করে হত্যা করার বর্ণনার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওই ব্যক্তি ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তার মাকেও নির্মমভাবে হত্যার পাশাপাশি বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি পরে মসজিদে আশ্রয় নিলে সেখানে তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে কোরআন শরিফ পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
‘জাতিগত নিধনের’ শিকার এসব মানুষের ভোগান্তি মানুষের মর্মপীড়া বৃদ্ধির পাশাপাশি রাগ বাড়িয়ে দিতে পারে বলে উল্লেখ করে জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গারা নিজ দেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার মতো মৌলিক মানবাধিকার থেকেও বঞ্চিত। সেখানে পরিকল্পিতভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে মিয়ানমারের নিরাপত্তাবাহিনী। মৃত্যুর ভয় নিয়ে অবস্থান করা অথবা পালিয়ে যাওয়া এমন দুটি বিকল্পের সামনে রোহিঙ্গাদের ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
অ্যান্তোনিও গুতেরেস লিখেছেন, কক্সবাজারে কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে রোহিঙ্গারা। এটা বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধমান শরণার্থী সংকট। সীমিত সম্পদের উন্নয়নশীল দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ তাদের জন্য সীমান্ত ও হƒদয় খুলে দিয়েছে। অথচ বৃহত্তর ও সম্পদশালী দেশগুলো দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে। এর বৈশ্বিক সমাধান দরকার বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
অসহায় মানুষের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো যাতে একা হয়ে না যায় সেজন্য জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলো একটি বৈশ্বিক চুক্তি চূড়ান্ত করছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরিস্থিতির উন্নয়নে জাতিসংঘ ও সাহায্যদাতা সংস্থাগুলো কাজ করছে। তবে এজন্য আরও সাহায্যের পাশাপাশি বৈশ্বিকভাবে দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া প্রয়োজন। তবে একশ’ কোটি ডলারের প্রয়োজনের বিপরীতে মাত্র ২৬ শতাংশ তহবিল জোগাড় হয়েছে বলেও জানান তিনি। আশ্রয় শিবিরগুলোতে রোহিঙ্গারা নানা ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
রোহিঙ্গারা নির্যাতনের বিচার চায় বলে জানিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, রাতারাতি এ সমস্যার সমাধান হবে না এবং এটা অনির্দিষ্টকাল চলতেও দেওয়া যায় না। সব ধরনের পূর্ণাঙ্গ অধিকার দিয়ে তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি মিয়ানমারকে নিশ্চিত করতে হবে এবং সেজন্য পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে।
রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার কারণ বের করে সমাধান করা না হলে দুর্দশা ও ঘৃণা-সংঘাত আরও বেগবান হতে পারে বলে উল্লেখ করে অ্যান্তোনিও গুতেরেস বলেন, রোহিঙ্গারা বিস্মৃত জনগোষ্ঠীতে পরিণত হতে পারে না। সাহায্যের জন্য তাদের করা আবেদনে অবশ্যই সাড়া দিয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে বলেও উল্লেখ করেন জাতিসংঘ মহাসচিব।