মীর আক্তারের বিরুদ্ধে ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ

রহমত রহমান: দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান মীর গ্রুপ অব কোম্পানির প্রতিষ্ঠান মীর আক্তার হোসেন লিমিটেড। দেশের নির্মাণ খাতের শীর্ষ এ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এ প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৩৭ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি উদ্ঘাটন করেছে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলাও করেছে এনবিআর।
যদিও ভ্যাট ফাঁকির বিষয়টি অস্বীকার করছে মীর আক্তার হোসেন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন। তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, ‘ভ্যাট ফাঁকি নয়। কোনো মামলা হয়নি, অ্যাসেসমেন্ট চলতেছে। কে মামলা করেছে, আপনাকে কে বলেছে?’
মীর আক্তার হোসেন আরও বলেন, ‘মামলা করার কোনো সুযোগও নেই। কারণ অ্যাসেসমেন্ট হয়। এরপর আপিল হয়। পরে ট্রাইব্যুনাল। তারপর মামলা হয়।’ ভ্যাট বিভাগ আপনাদের ব্যয়ের ওপর ভ্যাট দাবি করছে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘তারা যা দাবি করছে তা সঠিক না। ফাঁকি নয়, এখনও অ্যাসেসমেন্ট স্টেজে আছে। ভ্যাট বিভাগ কিছু প্রশ্ন করছে, আমরা উত্তর দিচ্ছি এ স্টেজে আছে। কাগজ চাইছে, আমরা দিচ্ছি। এখনও ফাইনাল হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।’
এনবিআর সূত্র জানায়, মীর আক্তার হোসেন লিমিটেড দেশের নির্মাণ খাতের অন্যতম বৃহৎ ও অভিজ্ঞ কোম্পানি। এ কোম্পানি পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে সফলতার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক মানের মহাসড়ক-সেতুর পাশাপাশি কল-কারখানা, মিলনায়তন, হাসপাতাল, পাঁচতারা হোটেল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভবন, রেলপথ, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণ ও বিমানবন্দর উন্নয়নের মতো কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
সূত্র আরও জানায়, মীর আক্তার হোসেন লিমিটেড এনবিআরের আওতাধীন কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ঢাকা (দক্ষিণ) এর ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ পায় এনবিআর। বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানটির ব্যয় বা কেনাকাটার বিপরীতে সঠিকভাবে উৎসে ভ্যাট কর্তন ও জমা না দেওয়ার অভিযোগ উঠে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ভ্যাট কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানটির ধানমন্ডি কার্যালয় পরিদর্শন করেন। সেখান থেকে ভ্যাট-সংক্রান্ত কাগজপত্র ও দলিলাদি জব্দ করা হয়। পরে মীর আক্তার হোসেন লিমিটেডের কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানটির ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত বার্ষিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন জমা দেন। সে অনুযায়ী কর্মকর্তারা নিরীক্ষা করেন।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, মীর আক্তার হোসেন লিমিটেড একটি ভ্যাটযুক্ত সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। সেবা প্রদানের জন্য পণ্য ক্রয় করে থাকে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি পণ্য ক্রয়ের ভ্যাট চালান দেখাতে পারেনি; যাতে জোগানদার ভ্যাট প্রযোজ্য। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন প্রকল্প ব্যয়, পরিবহন ব্যয়, বিজ্ঞাপন, প্রিন্টিং ও স্টেশনারি, ইউনিফর্ম ও বিভিন্ন ব্যয়ের ওপর উৎসে ভ্যাট প্রযোজ্য। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি সঠিকভাবে তা কর্তন করে সরকারি কোষাগারে জমা দেয়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী মীর আক্তার ২০১২-১৩ অর্থবছর পণ্য ক্রয় ও ব্যয়ের বিপরীতে প্রায় সাত কোটি ৯৪ লাখ টাকার ভ্যাট পরিশোধ না করে ফাঁকি দিয়েছে। একইভাবে ২০১৩-১৪ অর্থবছর প্রায় ছয় কোটি ৯৯ লাখ টাকা, ২০১৪-১৫ অর্থবছর প্রায় এক কোটি ৬২ লাখ টাকা, ২০১৫-১৬ অর্থবছর প্রায় এক কোটি ৯৬ লাখ টাকা ও ২০১৬-১৭ অর্থবছর প্রায় ২৬ হাজার টাকাসহ পাঁচ বছরে প্রায় ১৮ কোটি ৪৯ লাখ টাকার ভ্যাট পরিশোধ না করে ফাঁকি দিয়েছে।
এ ভ্যাট পরিশোধ না করায় ভ্যাট আইন অনুযায়ী দুই শতাংশ হারে সুদ প্রায় ১৮ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। সুদসহ প্রতিষ্ঠানটি পাঁচ বছরে মোট প্রায় ৩৬ কোটি ৮২ লাখ টাকার ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। এ ভ্যাট পরিশোধে মীর আক্তার হোসেন লিমিটেডকে সম্প্রতি দাবিনামা সংবলিত কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করা হয়েছে। নোটিসের জবাব দিতে ১৫ দিনের সময় দেওয়া হয়। জবাব না দিলে আইন অনুযায়ী মামলাটি একতরফাভাবে নিষ্পত্তি করা হবে বলে নোটিসে উল্লেখ করা হয়।
এ বিষয়ে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, মীর আক্তার হোসেন লিমিটেডের বিরুদ্ধে ভ্যাট ফাঁকির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়ার পর নিরীক্ষা করা হয়েছে। জব্দ করা দলিলাদি ও প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী কিছু ফাঁকি উদ্ঘাটন করা হয়েছে। তবে আরও ফাঁকি উদ্ঘাটনে আমরা কাজ করছি।
উল্লেখ্য, ১৯৬৮ সালে যাত্রা শুরু হয় মীর আকতার হোসেন লিমিটেডের। এ প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করেছে ঐতিহ্যবাহী পাঁচ তারকা শেরাটন হোটেল (রূপসী বাংলা হোটেল) থেকে শুরু করে বর্তমানের র‌্যাডিসন হোটেল। রাজধানীর দিলকুশায় ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের ১৮ তলা ইসলামী ব্যাংক টাওয়ার, তৃতীয় বুড়িগঙ্গা সেতু, রাজশাহী সিটি করপোরেশন ভবন, ঢাকা-বগুড়া মহাসড়ক, আমেরিকান দূতাবাস, ব্রিটিশ দূতাবাস ভবন, ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ (আইইউবি), আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল স্কুলসহ অনেক বড় প্রতিষ্ঠান। এছাড়া বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি কাজ করছে হাতিরঝিল প্রকল্পে, মিরপুর-বনানী ফ্লাইওভার, খিলগাঁওয়ে ৫০০ বেডের হাসপাতালসহ আরও অসংখ্য ইমারত নির্মাণে। মীর গ্রুপের অন্যতম সহযোগী প্রতিষ্ঠান মীর টেলিকম, মীর কনসেট প্রডাক্ট লিমিটেড, মীর সিরামিক লিমিটেড, মীর সিমেন্ট, মীর সিপি, মীর রিয়েল এস্টেট, মীর পাওয়ার, মীর টেকনোলজি, মীর হোল্ডিং লিমিটেড, বিটিএস কোম্পানি বিডি লিমিটেড, আরগো ভেঞ্চার লিমিটেড, বাংলা টেলিকম লিমিটেড, কেয়ার ট্রেডিং, মীর এনার্জি লিমিটেড ও আরগো কোম্পানি লিমিটেড প্রভৃতি।