মুক্তিযুদ্ধে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, শিক্ষক, সাধারণ জনতা সবাই স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেয়। ৩০ লাখ শহীদের রক্ত আর মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত এ স্বাধীনতা যুদ্ধে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি দেশের শিক্ষিত সমাজের রয়েছে অসামান্য অবদান। সেই অবদানের এক বিশাল অংশজুড়ে রয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মচারী-কর্মকর্তারা। স্বাধীনতা যুদ্ধে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা নিয়ে লিখেছেন আসিফ হাসান রাজু

আমরাই সেই জাতি, যারা স্বাধীনতা অর্জন করেছি দীর্ঘ ৯ মাসের যুদ্ধের মাধ্যমে। লাখো শহীদের রক্তে অর্জিত এ স্বাধীনতায় রয়েছে দেশের সব শ্রেণির মানুষের অসামান্য অবদান। স্বাধীনতার জন্য পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কাছে নিজের জীবন দিতে কুণ্ঠাবোধ করেনি এদেশের মানুষ। হাজারো মা তাদের সম্ভ্রমের বিনিময়ে হানাদার বাহিনীর হাত থেকে মুক্ত করে এক লাল-সবুজের পতাকা আর ৫৬ হাজার বর্গমাইলের মানচিত্র রেখে গেছেন আমাদের জন্য। তাদের অবদান কখনও ভোলার নয়।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দেশের আপামর জনতা, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র-শিক্ষক ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে।
গ্রাম-গঞ্জ, নগর-বন্দরে মানুষ যেন অগ্নিশলাকার মতো জ্বলে উঠেছিল। সেই ডাকে জাতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে সংগ্রামী ঐতিহ্যের হাত ধরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-ছাত্র, কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও চূড়ান্ত এই যুদ্ধে অংশ নিয়ে রেখে গেছেন অসামান্য দৃষ্টান্ত। শুধু মহান স্বাধীনতা যুদ্ধেই নয়, জাতীয় জীবনের সংকটময় সব সময়ে সর্বদা বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে চলেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
স্বাধীনতা যুদ্ধের পাশাপাশি দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টির অসামান্য অবদান। ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০-এর সাধারণ নির্বাচন, ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ও ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর অগ্রণী ভূমিকা। এই ক্যাম্পাসে শায়িত আছেন লাখো ছাত্রের পথচলার অনুপ্রেরণা, ছাত্রদের অধিকার আদায়ে নিজ জীবনকে উৎসর্গ করা শহীদ ড. শামসুজ্জোহা। তিনি ১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের দায়িত্বে ছিলেন। তার আত্মত্যাগের পর স্বাধিকার আন্দোলনে যুক্ত হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সৈন্যদের নির্যাতনে প্রাণ হারিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবিবুর রহমান, মীর আবদুল কাইয়ুম ও সুখরঞ্জন সমাদ্দার। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০ জন ছাত্র, কর্মকর্তা-কর্মচারী মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন বলে জানা যায়। এরপর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনী অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিশ্চিহ্ন করার যে ব্যর্থ প্রয়াসের সূচনা করে, তাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ও আক্রান্ত হয়।
কয়েক দিনের মধ্যে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যে দল রাজশাহীতে সক্রিয় ছিল, তা দুর্বল হয়ে পড়ে। অবশেষে স্থানীয় ক্যান্টনমেন্টে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। রাজশাহী শহর তৎকালীন ইপিআর নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু এপ্রিলের মাঝামাঝি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি বিশাল অংশ শহরে প্রবেশ করে, বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ী ঘাঁটি স্থাপন করে। তাদের বিতাড়িত করতে শাহাদাতবরণ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের রিডার অধ্যাপক হবিবুর রহমান, ভাষা (সংস্কৃত) বিভাগের অধ্যাপক সুখরঞ্জন সমাদ্দার, মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মীর আবদুল কাইউম, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ছাত্ররা।
আরও শহীদ হন প্রশাসনিক ভবনের নৈশপ্রহরী আবদুর রাজ্জাক, স্টেনোটাইপিস্ট (প্রশাসন) শেখ এমাজউদ্দিন, উচ্চমান সহকারী (হিসাব বিভাগ) এসএম সাইফুল ইসলাম, কর্ম সহযোগী (প্রকৌশল দফতর) মো. কলিম উদ্দিন, সুইপার (স্টুয়ার্ড শাখা) মোহন লাল, পরিবহন শাখার ড্রাইভার আবুল আলী, কাঠমিস্ত্রি (প্রকৌশল দফতর) শফিকুর রহমান, প্রহরী (স্টুয়ার্ড শাখা) নূরু মিঞা, উপাচার্য অফিসের জরুরি পিয়ন মোহাম্মদ ইউসুফ, পিয়ন (পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ দফতর) মো. ওয়াজেদ আলী, প্রহরী (উপাচার্যের দফতর) মো. আফজল মৃধা, অর্ডারলি পিয়ন (প্রক্টর দফতর) ওয়াহাব আলী, বেয়ারার (আইন বিভাগ) আবদুল মালেক। স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রাণ দিয়েছেন শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালার কিউরেটর মনছুর আহমদ খান, প্রহরী হোসেন আলী।
মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রদের ভূমিকা ছিল অসামান্য। স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়ে শহীদ হয়েছেন বাণিজ্য বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবদুল মান্নান আখন্দ, বাংলা শেষ বর্ষের ছাত্র আমিরুল হুদা জিন্নাহ, এমএসসি পূর্বভাগের ছাত্র গোলাম সারওয়ার খান সাধন, রসায়ন বিভাগের স্নাতক সম্মান শ্রেণির ছাত্র প্রদীপ কুমার রাহা, অর্থনীতি বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র মোহাম্মদ আলী খান, বাণিজ্য বিভাগের স্নাতক সম্মান শ্রেণির ছাত্র শাহজাহান আলী,
পদার্থবিদ্যা বিভাগের এমএসসি (পূর্বভাগ) ছাত্র মিজানুল হক।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-ছাত্র, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এই আত্মত্যাগ, যুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন আর ঐতিহাসিক দলিলপত্র স্মরণীয় এবং সংরক্ষণ করে রাখার প্রয়াসে ১৯৭৬ সালের ২ জানুয়ারি ‘শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা’ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
তৎকালীন ভিসি প্রফেসর সৈয়দ আলী আহসানের সভাপতিত্বে ২১ ফেব্রুয়ারি উদ্যাপন কমিটির সভায় গৃহীত হয় এ সিদ্ধান্ত। কাজ দ্রুত শেষ করে সে বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি সংগ্রহশালাটি দর্শকের জন্য প্রথম খুলে দেওয়া হয়। ৬ মার্চের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন সরকারের তৎকালীন শিক্ষা উপদেষ্টা আবুল ফজল। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে চিরঅম্লান করে রাখতে ক্যাম্পাসে নির্মিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য ‘সাবাস বাংলাদেশ’।
সিনেট ভবনের দক্ষিণে অবস্থিত এ ভাস্কর্যটি ১৯৯১ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের উদ্যোগে শিল্পী নিতুন কুণ্ড নির্মাণকাজ শুরু করেন। এর ফলক উ্ম্মোচন করেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম।
স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রাণদানে গণকবরকে স্মৃতিচিহ্ন করে রাখার জন্য নির্মাণ করা হয়েছে বধ্যভূমি। এটি মূল ক্যাম্পাসের পূর্বদিকে অবস্থিত। স্বাধীনতা যুদ্ধে বুদ্ধিজীবীদের অবদানের কথা মাথায় রেখে ক্যাম্পাসে নির্মিত হয়েছে শহীদ বুদ্ধিজীবী চত্বর, যা বর্তমান শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেণার উৎস। শুধু শিক্ষার্থীদের জন্যই নয়, কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের এসব স্মৃতিস্তম্ভ। সর্বোপরি মহান মুক্তিযুদ্ধে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়।