মুসলিম বিশ্বের সংকট নিরাসনের চাবি কার হাতে?

তৌহিদুর রহমান: কয়েক মাস ধরেই বৈশ্বিক গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু ইয়েমেনি শিশুর ছবি ঘুরে বেড়াচ্ছে। ছবিগুলোতে যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা আঁতকে ওঠার মতো। শিশুদের শরীরের চামড়ার নিচে হাড়গুলো স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে। একটি ছবিতে শিশুর পায়ের সঙ্গে একজন সুস্থ মানুষের আঙুলের মাপ দেখানো হয়েছে। সেখানে দুটিই একই ধরনের দেখা যাচ্ছে। এসব ছবি একজন সুস্থ মানুষ দেখলে তার প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে, তা যে কেউ সহজেই অনুমান করতে পারেন। খবরে বলা হচ্ছে, এক-দুটি নয়, দেশটিতে হাজার হাজার শিশু এ অবস্থার শিকার। মূলত পুষ্টিহীনতার কারণে তাদের এমন অবস্থা। কিছু খবরে বলা হচ্ছে, অনেক শিশু এখন ভালোভাবে কাঁদতেও পারছে না! মধ্যপ্রাচ্যের প্রসিদ্ধ ও সমৃদ্ধ প্রাচীন সভ্যতার একটি দেশ ইয়েমেনে এখন মানবতা যেন ডুকরে কেঁদে মরছে।
দেশটিতে এ পরিস্থিতি কি এমনি এমনিই সৃষ্টি হয়েছে? এর উত্তর হলোÑনা। বর্তমান বিশ্বে যারা মানবিকতার কথা বলে, শান্তির কথা বলে, গণতন্ত্র ও সুশাসনের বুলি আওড়ায়, তাদেরই ক্ষমতার দ্বন্দ্বের ফল ভোগ করছে এসব শিশু। কয়েকটি দেশের শাসক দ্বারা প্রভাবিত হয়ে গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে গেছে দারিদ্র্যপীড়িত দেশটি। এতে শুধু যে শিশুরা মানবিক বিপর্যয়ের শিকার তা নয়, দেশটির নারীরাও মারাত্মক দুর্ভোগের মধ্যে দিন পার করছে। কয়েক বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধে ১০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। অনেক শহর মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। এ অবস্থার অবসান কবে হবে, তাও কারও জানা নেই। মুসলিমপ্রধান ইয়েমেনে একটি ‘নিয়মতান্ত্রিক গণহত্যা’ নীরবে প্রত্যক্ষ করছে বিশ্ববাসী। কারোই কোনো প্রতিবাদ নেই; কথিত মানবিক বোধও তাদের এখন জাগ্রত হয় না। শুধু ইয়েমেন নয়, সিরিয়া থেকে শুরু করে ফিলিস্তিন, ইরাক, চীন, ভারত, মিয়ানমারসহ বিশ্বের অনেক দেশেই এখন নির্যাতন-নিপীড়নের লক্ষ্যবস্তু হলো মুসলিম সম্প্রদায়। কিছু দেশ রয়েছে ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকিতেও!
ইয়েমেনে এই মানবিক বিপর্যয়ের দায় বহুলাংশে সৌদি আরব নেতৃত্বাধীন জোটের ওপর বর্তায়। তাদের ভয়ংকর বিমান হামলায় দেশটিতে হাজারো মানুষের জীবন চলে গেছে। ধ্বংস হচ্ছে শহরের পর শহর। সৌদি আরবকে অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করছে যুক্তরাষ্ট্র। ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে বড় ভূমিকা রয়েছে ‘মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোঁড়া’খ্যাত ইসরাইলেরও। সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনীর বিরুদ্ধে আবার যুদ্ধ করছে হুথি বিদ্রোহী ও স্বাধীনতাকামী একাধিক বিদ্রোহী গোষ্ঠী। তাদের অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করছে ইরানসহ একাধিক দেশ। জাতিসংঘসহ বিশ্বের সব দেশ ও বিশ্বনেতারা ইয়েমেন পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত। কিন্তু সেখানে মানবিক বিপর্যয় নিয়ে যেন কারও কোনো মাথাব্যথা নেই। জাতিসংঘ, এমনকি অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশনও (ওআইসি) রহস্যজনকভাবে নীরব। এ ধরনের সংস্থাগুলো মাঝেমধ্যে দু’একটি বিবৃতি ও প্রতিবাদ জানিয়েই নিজেদের দায়িত্ব শেষ করছে। ইয়েমেন সমস্যার সমাধানে তাদের যেন কোনো আগ্রহই নেই।
বিশ্বশক্তিগুলোর শক্তি প্রদর্শনের আরেকটি ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে সিরিয়া। বর্তমান শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহতম মানবিক বিপর্যয়ের মুখে দেশটি। মুসলিমপ্রধান দেশটিতে ২০১১ সাল থেকে চলে আসা গৃহযুদ্ধে লাখো মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটসের দাবি, এ যুদ্ধে তিন লাখ ৬৪ হাজার ৭৯২ থেকে পাঁচ লাখ ২২ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অবশ্য বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে এ সংখ্যায় ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। তবে এটা সত্য যে, সিরিয়ায় মৃত্যুর শিকার মানুষের সংখ্যা আঁতকে ওঠার মতো। এর একটি বড় অংশই নারী ও শিশু। এ দুই শ্রেণি সবচেয়ে অসহায় হলেও বিশ্বের ইতিহাসে যুদ্ধগুলোতে তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছেÑসিরিয়ায় তারই প্রতিফলন লক্ষ করা যাচ্ছে।
সিরিয়ার এ মানবিক বিপর্যয়ের পেছনেও বিশ্বের তথাকথিক মানবিকতার কথা বলা দেশগুলোর বড় ভূমিকা রয়েছে। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে মরিয়া বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তাকে অস্ত্র, সৈন্য ও পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করছে রাশিয়া ও ইরান। আবার বিদ্রোহীদের একইভাবে সহায়তা করছে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইলসহ তাদের মিত্র দেশগুলো। একটি অংশে সক্রিয় তুরস্ক সমর্থিত বিদ্রোহীরা। এছাড়া জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটসহ (আইএস) অন্যরাও সক্রিয় রয়েছে। সিরিয়ায় এ গৃহযুদ্ধে দেশটির সরকার ও বিদ্রোহী কয়েকটি গোষ্ঠীর ভূমিকাই আপাতদৃষ্টিতে চোখে পড়ে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সিরিয়া দু’পক্ষের শক্তি প্রদর্শনের রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। সেখানে এক পক্ষের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। আরেক পক্ষে রাশিয়া ও মিত্র দেশগুলো। এ যুদ্ধে যে পরিমাণ নতুন অস্ত্রের পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে, অতীতে কোনো যুদ্ধেই এত অস্ত্রের ব্যবহার হয়েছে কিনা সন্দেহ। হাজারো সিরীয় মুসলিমের মৃত্যু হলেও তাতে যেন কারও মাথাব্যথা নেই। কে কত অত্যাধুনিক অস্ত্র সেখানে ব্যবহার করতে পারে, তার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত পরাশক্তিগুলো। সিরিয়ায় এ পরিস্থিতির শেষ হবে কবে, সে বিষয়ে কারও কোনো ধারণাই নেই।
বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই নির্যাতনের শিকার হচ্ছে ফিলিস্তিনিরা। নিজেদের স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলন করে চলেছে তারা। আর নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদের ওপর প্রায়ই গুলি চালিয়ে হত্যা করছে ইসরাইলি সেনারা। কয়েক দশক ধরে চলে আসা এ সংঘাতে হাজার হাজার ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়েছে। এখন সেখানে এক ধরনের মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। ফিলিস্তিনের এ সমস্যাও কথিত মানবতার কথা বলা যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশের ভুল সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সৃষ্টি। এর খেসারত এখন ফিলিস্তিনি মুসলিমদের জীবনের বিনিময়ে দিতে হচ্ছে। সেখানকার এ অচলাবস্থার অবসান কবে হবে তা কারও জানা নেই। অথচ ইসরাইলি সেনারা হত্যাযজ্ঞের পাশাপাশি ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডও দখল করে নিয়ে তাদের বাস্তুহারায় পরিণত করছে।
এশিয়ার অপর দুই মুসলিম দেশ আফগানিস্তান ও ইরাকের কথা কারও অজানা নয়। দশকব্যাপী ভয়ানক দুই যুদ্ধের পর দেশ দুটি এখন ঘুরে দাঁড়াতে চেষ্টা করছে। তবে এর সামনেও বাধা অনেক। জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো এখনও বিচ্ছিন্নভাবে হামলা করছে। এতে প্রায়ই বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণ চলে যাচ্ছে। হতাহতদের মধ্যে অধিকাংশই যে নারী ও শিশু, তা নতুন করে বলে না দিলেও চলে। দেশ দুটির এ দুর্ভোগের পেছনেও অনেকাংশে দায় কথিত পরাশক্তিগুলোর। আফগানিস্তানে এখন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে মরিয়া ভারত ও পাকিস্তান। সঙ্গে পুরোনো দুই বৈরী পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোট এবং রাশিয়া তো রয়েছেই। এছাড়া ইরাকেও এ দু’পক্ষ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে মরিয়া। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক পুরোনো দুই খেলোয়াড় ইরান ও ইসরাইল তো রয়েছেই। এ দেশগুলোর রেষারেষির ফল হিসেবে দেশ দুটির অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড়াতে রীতিমত সংগ্রাম করতে হচ্ছে। এছাড়া জঙ্গি গোষ্ঠী ও পরাশক্তিগুলোর হামলায় প্রাণ দিতে হচ্ছে হাজারো নিরীহ মুসলিমকে।
এসব মুসলিম দেশের বাইরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মুসলমানরা নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। চীনের শিনজিয়াং প্রদেশে উইঘুর মুসলিমদের নির্যাতনের কথা কারও অজানা নয়। সেখানে প্রায় ১০ লাখ উইঘুর মুসলিমকে বন্দিশিবিরে আটক রাখা হয়েছে বলে সম্প্রতি জাতিসংঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে তাদের হাজার বছর ধরে লালন করা ভাষা, সংস্কৃতির স্থলে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আদর্শে জোর করে অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এমনকি উইঘুর মুসলিমদের চলাচল, পোশাক, ধর্মীয় বিশ্বাসও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে চীন। কেউ এর বাইরে গেলেই তাদের ওপর নেমে আসছে নির্যাতনের খড়গ। বিশ্বের মানবাধিকার সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই এর বিরুদ্ধে সরব। কিন্তু চীন তাতে কোনো কর্ণপাতই করে না। ফলে উইঘুর মুসলিমরা তাদের দুর্দশা থেকে কবে মুক্তি পাবেÑতা সম্ভবত কারোই জানা নেই। চীন দিন দিন একক পরাশক্তিতে পরিণত হচ্ছে। তাদের চ্যালেঞ্জ করার মতো কেউ না থাকলে চীন আরও বেশি কঠোর অবস্থানে যাবেÑসেটাই বাস্তবতা। দেশটির বন্দিশিবিরগুলোকে সম্প্রতি আইন করে বৈধতা দিয়েছে চীন সরকার।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর দেশটির সরকার ও সেনাবাহিনীর পরিকল্পিত গণহত্যার কথা বর্তমান বিশ্বে তুলনাবিরল। নির্যাতনের মুখে সেখান থেকে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। সারা বিশ্বে এ বিষয়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠলেও মিয়ানমার সরকার বিষয়টি নিয়ে নির্লজ্জ মিথ্যাচার করেই চলেছে। এমনকি তারা রোহিঙ্গাদের নিজেদের দেশের নয় বলেও প্রচার চালাচ্ছে। এসব রোহিঙ্গা মুসলিমকে আশ্রয় দিয়ে এখন বিপাকে বাংলাদেশও। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তাদের ফিরিয়ে নিতে গড়িমসি করছে মিয়ানমার। ফলে এ সংকটের সমাধান কবে হবে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় অনিশ্চয়তা।
আমাদের প্রতিবেশী ভারতেও নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে মুসলিমরা। সেখানে গো-রক্ষার নাম করে প্রায়ই মুসলিমদের পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। এজন্য রীতিমতো কমিটি গঠন করেছে দেশটির উগ্রপন্থিরা। এ বিষয়ে দেশটির প্রশাসনের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। এমনকি ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারও এ বিষয়ে মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে। এসব কারণে ভারতের মুসলিমরা নিজেদের বসতবাড়িতে গরু রাখতেও ভয় পাচ্ছে। সম্প্রতি আসাম ও মুম্বাইসহ বিভিন্ন স্থানে বাংলাভাষীদের বিরুদ্ধে নানা পদক্ষেপ শুরু করেছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে নাগরিকত্ব বাতিল, জেল-জরিমানা, হয়রানিসহ নানা বিষয় রয়েছে। বলা বাহুল্য, এই জনসংখ্যার একটি বিরাট অংশই মুসলিম। কাশ্মীরেও দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণ, নির্যাতনের শিকার মুসলিমরা। এ নির্যাতন থেকে তারা কবে রেহাই পাবে কেউ জানে না।
মুসলিমদের নির্যাতন ও হয়রানির ক্ষেত্রে মানবাধিকারের পক্ষে গলা ফাটানো পশ্চিমা দেশগুলোও খুব একটা পিছিয়ে নেই। যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশে মুসলিমবিরোধী জনমত তৈরি করতে কাজ করছে বিভিন্ন গোষ্ঠী। এমনকি তাদের টার্গেট করে অপমান-অপদস্থের ঘটনাও ঘটছে। যুক্তরাষ্ট্রে হত্যার শিকার হয়েছে বেশ কিছু মুসলিম। এর মধ্যে কয়েকজন বাংলাদেশিও রয়েছেন। এছাড়া অনেক দেশে আইন করে মুসলিমদের হিজাব পরা ও পোশাক নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী নানাভাবে মুসলিমদের ওপর নির্যাতনের হার দিন দিন কমার পরিবর্তে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী এভাবে মুসলিমরা নির্যাতন-নিপীড়ন, হত্যার শিকার হলেও এর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া সামান্যই। কথিত বিশ্বনেতারা এর অবসানে উদ্যোগ নেওয়ার পরিবর্তে মুখ বন্ধ করে বসে আছেন। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে তারা নির্যাতনকে আরও উসকে দিচ্ছেন। ইসরাইলকে অস্ত্র ও আর্থিক সহায়তা বাড়িয়েই চলেছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে তাদের হাতে নিরীহ ফিলিস্তিনিদের হত্যা ও ভূমি দখলের হার বাড়ছে। এমনকি সিরিয়া, ইরাকসহ বিভিন্ন দেশে অবৈধভাবে হস্তক্ষেপ করছে ইসরাইল। কিন্তু পরাশক্তিগুলো তা দেখেও না দেখার ভান করছে। মুসলিমদের নির্যাতন বন্ধে সবার আগে এগিয়ে আসার কথা ছিল সৌদি আরবের। তারা বরং করছে উল্টোটা। ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনা অস্ত্রে ইয়েমেনে চালাচ্ছে গণহত্যা। এমনকি মুসলিম বিশ্বে ঐক্য তৈরির পরিবর্তে ফাটল ধরিয়েছে দেশটির রাজতান্ত্রিক সরকার। কাতারকে একঘরে করার পদক্ষেপের মাধ্যমে যার চূড়ান্ত রূপ আমরা দেখেছি।
বিশ্বের অপর দুই ক্ষমতাধর মুসলিম দেশ তুরস্ক ও ইরানের ভূমিকাও সন্তোষজনক নয়। ইয়েমেন ও সিরিয়ায় হত্যা, নির্যাতন বন্ধ এবং ফিলিস্তিন ইস্যুতে তারা বেশ সক্রিয় সত্য। কিন্তু মুদ্রার উল্টোপিঠও এক্ষেত্রে আমাদের দেখতে হচ্ছে। সিরিয়ায় ইরান ও তুরস্কের সহায়তায় হামলা চালাচ্ছে বিভিন্ন গোষ্ঠী। এতে অসংখ্য মুসলিমকে মৃত্যুর মুখে পতিত হতে হয়েছে। এছাড়া ইয়েমেন ও ইরাকেও দেশ দুটির বড় ভূমিকা রয়েছে। তাদের সহায়তা নিয়ে বিভিন্ন গোষ্ঠী দেশগুলোতে তৎপর রয়েছে। এতে অসংখ্য জীবনহানির ঘটনা ঘটছে।
বিশ্বে মুসলিম দেশগুলোর সবচেয়ে বড় ও কার্যকর জোট হিসেবে পরিচিত ছিল ওআইসি। কিন্তু এ সংস্থার ভূমিকাও এখন প্রশ্নবিদ্ধ। যখন মুসলিম নির্যাতন বৃদ্ধি পায়, তখনই সক্রিয় হয়ে ওঠে জোটটি। কিছুদিন পরই তা হাওয়ায় মিলিয়ে যায়! জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ (ইইউ) বৈশ্বিক জোটগুলোর ভূমিকাও সন্তোষজনক নয়। আগে যখনই কোথাও নির্যাতন-নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে, তখনই সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে এ সংস্থাগুলো। কিন্তু এখন তা আর দেখা যায়। কিছু ঘটনায় এ সংস্থাগুলো বক্তব্য-বিবৃতি দিয়েই দায় সারছে। সমস্যা সমাধানে দীর্ঘস্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো তৎপরতা এ সংস্থাগুলোর মধ্যে দেখা যাচ্ছে না। বিশ্বনেতারাও একই ধরনের ভূমিকা পালন করছেন। এ অবস্থার অবসান হওয়া জরুরি।
অবশ্য এ নির্যাতন বন্ধের মূল চাবি মুসলিমদের হাতেই। এজন্য সবার আগে দরকার ঐক্য। অতীতে এটা থাকলেও এখন দেশগুলোর মধ্যে অনৈক্যই বেশি। ইরান, সৌদি আরব কিংবা তুরস্ককেন্দ্রিক ব্লকে বিভক্ত দেশগুলো। ফলে মুসলিমদের পক্ষে থাকার পরিবর্তে এখন নিজেরাই নানা সমস্যা তৈরি করছে। এর অবসান ঘটিয়ে মুসলিম দেশগুলোকে একই ছাতার নিচে আনা জরুরি। এটি করতে না পারলে মুসলিম দেশগুলো আরও বিপদে পড়বে, দু’একটি দেশ হয়তো বিশ্ব মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়াও অসম্ভব নয়।
জাতিসংঘ, ইইউসহ বৈশ্বিক সংস্থাগুলোকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা জরুরি। তারা একক কোনো জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে না, সমগ্র বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করে। এক্ষেত্রে মুসলিম নির্যাতন বন্ধে তাদের আরও সক্রিয় অবস্থা কাম্য। তবে মুসলিমদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন বন্ধে বিশ্বনেতা বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন, চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং, জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ কিংবা সৌদি প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান, তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির মতো নেতাদের বড় ভূমিকার প্রয়োজন রয়েছে। তারা নিজেদের নৈতিকতা ও দায়িত্বের জায়গা থেকে মুসলিমদের মানবাধিকার রক্ষা করতে এগিয়ে আসবেন বলে সবার প্রত্যাশা। এতে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার যে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়, তা আরও বেগবান হবে বলে অনেকের বিশ্বাস।

গণমাধ্যমকর্মী

[email protected]