মূল্যস্ফীতি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখার সুপারিশ বিশেষজ্ঞদের

আসছে নতুন মুদ্রানীতি

মেহেদী হাসান: অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হবে চলতি জানুয়ারি মাসের শেষদিকে। নতুন এ নীতি তৈরির কাজ জোরেশোরে চালাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এবারের মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। এছাড়া বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখা, খেলাপি ঋণের মাত্রা কমানো, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ ব্যাংকের করণীয় ও দিকনির্দেশনা মুদ্রানীতিতে থাকা উচিত বলে মনে করছেন তারা।

জানা গেছে, মুদ্রানীতি ঘোষণা উপলক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির ইতোমধ্যেই বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, কেন্দ্রীয় ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের বিশিষ্টজনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এসব বৈঠকে আসা পরামর্শের আলোকে জানুয়ারি-জুন সময়ের জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হবে। চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের জন্য ঘোষিত মুদ্রানীতিতে সামগ্রিকভাবে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ধরা হয়েছে। গত অর্থবছরের শেষার্ধের মুদ্রানীতিতে অভ্যন্তরীণ খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হয়েছিল ১৬ দশমিক ৪০ শতাংশ। নতুন মুদ্রানীতিতে তা কমিয়ে ১৫ দশমিক ৮০ শতাংশ করা হয়েছিল।

নতুন মুদ্রানীতি সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ শেয়ার বিজকে বলেন, এবার নির্বাচনী বছর। নির্বাচনী বছরে সাধারণত সব দেশেই যেটা হয়ে থাকে, তা হলোÑমুদ্রা সরবরাহ বেড়ে যায়; ফলে মূল্যস্ফীতিটাই এক বড় সমস্যা হয়ে দেখা দেয়। আর মুদ্রানীতির প্রধান লক্ষ্যই হলো মূল্যস্ফীতিকে কমিয়ে রাখা। তাই এবারের মুদ্রানীতির অনেকগুলো দিকের মধ্যে প্রধানতম দিক হলো, মূল্যস্ফীতি যাতে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ সীমা অতিক্রম করে না যায়।

তিনি বলেন, এবারের বাজেটের সময় বলা হয়েছিল যে, মূল্যস্ফীতি পাঁচ দশমিক ছয় শতাংশের মধ্যে রাখা হবে। সেটি করতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। তবে ছয় শতাংশ বা এর সামান্য বেশি রাখার চেষ্টা করতে হবে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানিত ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, খাদ্য মূল্যস্ফীতির কারণে আমাদের মূল্যস্ফীতি আবার একটু ওপরের দিকে উঠছে। তাই ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহ ও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি এমনভাবে করতে হবে, যাতে মূল্যস্ফীতি না বাড়ে। ঋণের পোর্টফোলিওতে আরও সতর্ক দৃষ্টি দেওয়া উচিত। কেননা, ঋণের মান নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠছে, খেলাপি ঋণ বাড়ছে। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের ম্যানেজমেন্ট অব ক্রেডিট মার্কেট ও সুশাসন বাড়াতে হবে।

তিনি বলেন, এক বছরে এক্সচেঞ্জ রেটের যে অবনমন হয়েছে, সেটা এখন যে জায়গায় আছে, সেটা ধরে রাখা। এছাড়া বিদেশ থেকে যে ঋণ  নেওয়া হয়েছে, তা ফেরত দেওয়ার সময় হয়ে এসেছে। এক সময় বাংলাদেশ ব্যাংক বেসরকারি খাতকে বিদেশ থেকে ঋণ নিতে দিয়েছে। ফলে দেশের উদ্যোক্তারা বিদেশ থেকে প্রায় সাড়ে ১০ বিলিয়ন ডলারের মতো ঋণ নিয়েছেন। তবে এখন আমাদের ঋণের সুদহার যেহেতুু কিছুটা কম, তাই তাদের উৎসাহিত করতে হবে তারা যাতে বাইরে থেকে ঋণ না নিয়ে দেশ থেকেই ঋণ নেয়। তাহলে আমাদের ঋণের মানও বাড়বে। বিদেশ থেকে তাদের ফিরিয়ে আনতে হবে। এছাড়া বাইরে থেকে নতুন ঋণ নেওয়ার অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংককে সতর্ক থাকতে হবে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের মাত্রা অনেক বেড়ে যাচ্ছে, যা ব্যাংক খাতে ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এটাকে কীভাবে কমানো যায়Ñতার একটি দিকনির্দেশনা এবারের মুদ্রানীতিতে থাকা উচিত। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যে আমানত ও ঋণের অনুপাত কমানোর চিন্তাভাবনা করছে। এছাড়া সাম্প্রতিককালে ব্যাংক খাতে যেসব দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে, যেমনÑসুশাসনের অভাব, পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি ও অপরিশোধিত ঋণের মাত্রা বৃদ্ধি; এ বিষয়গুলো বাংলাদেশ ব্যাংক কীভাবে মোকাবিলা করবে, সেসব বিষয়ে মুদ্রানীতিতে নির্দেশনা থাকা উচিত।

এর আগে গত ২৬ জুলাই ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে চলতি অর্থবছরের জন্য গড় বার্ষিক ভোক্তা মূল্যস্ফীতি পাঁচ দশমিক পাঁচ শতাংশ পরিমিত রাখা ও সাত দশমিক চার শতাংশ প্রকৃত দেশজ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বিবেচনায় রেখে মুদ্রানীতি করা হয়েছিল। এতে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৫ দশমিক আট শতাংশ ধরা হয়েছে। যার মধ্যে বেসরকারি ও সরকারি খাতের জন্য ঋণ প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হয়েছে যথাক্রমে ১৬ দশমিক তিন ও ১২ দশমিক এক শতাংশ।

প্রসঙ্গত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি অর্জনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার প্রয়াস থেকে প্রতি ছয় মাস পরপর মুদ্রানীতি ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক।