মে দিবস কি সীমাবদ্ধ থাকবে আনুষ্ঠানিকতায়

তৌহিদুল ইসলাম চঞ্চল: মহান মে দিবস পালিত হয় বিভিন্ন আয়োজনে। রাজধানীসহ দেশের নানা জায়গায় দিনটিতে ভোজ, অনুষ্ঠান, শোভাযাত্রা, মাইকে সারাদিন বাজে ভুপেন হাজারিকাসহ নামকরা শিল্পীদের জীবনমুখী কিংবা মানবতার গান। কোথাও চলে দিনব্যাপী স্লোগান, মিছিল, বক্তৃতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। শ্রমিকদের অনেকেই লাল রঙের কাপড় মাথায় দিয়ে ঘোরেন। পরদিন থেকে আবার নেমে পড়েন জীবনযুদ্ধে।
মে দিবসের ছুটির দিনেও কাজ করতে হয়েছে শ্রমজীবীদের। দু-তিন ঘণ্টার একটা বিরতি পেলেও পেতে পারেন। নচেৎ কেউ আমাকে আপনাকে গন্তব্যে পৌঁছাতে কিংবা গামছা ঘাড়ে সামনে এসে জিজ্ঞাসা করবেÑ‘স্যার, কী খাবেন বলুন?’ ঘরে পৌঁছে দেবে খবরে ঠাঁসা একটি সংবাদপত্র।
চার দোকানের কর্মী ১২, ১৩ বা ১৪ ঘণ্টা টানা কাজ করলে কারও মাথাব্যথার কারণ হয় না। রাজধানীর পান্থপথ-সোনারগাঁও রোডের ঢালুতে বেশ কয়েকটি মাঝারি ওয়েলডিংয়ের দোকান। এ কাজে কিশোররা নিজে প্রটেক্টর ব্যবহার করে না। কিন্তু সদা সতর্ক থাকে পথচারীর গায়ে যেন বিদ্যুৎস্ফুলিঙ্গ লেগে না যায়! কিন্তু এটি কারও নজরে আসে না। জীবনের প্রয়োজনে, সংসার বাঁচানোর তাগিদে ৮-১০ বছরের শিশু পর্যন্ত পান-সিগারেট বিক্রি কিংবা বিভিন্ন ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ফাইফরমাশ খাটছে। গাঁওগেরাম থেকে রাজধানীতে আসা হাজারো রিকশাচালক প্রতিদিন টেনশনে থাকা রাগান্বিত মানুষগুলোর কখনও কখনও চড়থাপ্পড় খাচ্ছে, যা চোখের দৃষ্টির বাইরে থাকে। বারবণিতা যারা শহরের অলিগলিতে নির্যাতিত-নিপীড়িত, দু’বেলা অন্নের জন্য নিজেকে জলাঞ্জলি দিচ্ছে। ফসলের মাঠে সমপরিমাণ কাজ করা পুরুষদের চেয়ে কম মজুরি পান নারী শ্রমিকরা। আবার সে মজুরি পরিশোধে ভাবখানা যেন দয়া দেখাচ্ছে! গ্রামের বাড়ি থেকে আনা অনাথ ছোট্ট গৃহকর্মী মেয়ে বা ছেলেকে চড়থাপ্পড়, লাথি কিংবা গরম খুনতি দিয়ে ছ্যাঁকা দিয়ে বিত্তবানদের কেউ কেউ বুনো সুখ উপভোগ করছেন। কার ঘরে কী হচ্ছে আপনি-আমি থোড়াই জানি। যে শিশু আমার ঘরে সকালে সংবাদপত্র পৌঁছে দিল, তার মজুরি কত তা নিয়ে নেই কোনো বিশ্লেষণ। মোটরসাইকেলের গ্যারেজ কিংবা অন্যান্য গ্যারেজে কর্মরত দুধদাঁত পড়েনি এমন শিশুরা যখন শুধু খাবারের বিনিময়ে কাজ করে যাচ্ছে, তা আমাদের কাছে ‘কাজ শেখা’র একটা তরিকা বুঝি। তাকে দিয়ে ১০০ কেজি কিংবা তারও বেশি ওজনের একটি যান এখান থেকে সেখানে সরানো হয় বা এদিক-সেদিক থেকে বিভিন্ন সাইজ আর ওজনের পার্টস আনা-নেওয়া করা হয় এই মনে করে যে, তোমাকে ভাত খাওয়াচ্ছি, আবার কাজ শেখাচ্ছি আমি গুরু! মুদিখানাসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কর্মী বছরে কত দিন ছুটি পায়। কাজ ছেড়ে দিলে কী সুযোগ-সুবিধা পাবে? হয়তো বছরে তার সর্বোচ্চ ৮-১০ দিন ছুটি।
এফডিসিতে রঙিন স্বপ্ন নিয়ে কাজ শুরু করা আর কোনোভাবে জীবন বাঁচাতে যারা রাজা-মহারাজার বেশে সাবলীল অভিনয় করে যাচ্ছেন, বড় বড় শপিংমলে যারা পাপেটের আড়ালে সৃষ্টির সেরা মানুষের রূপটি আড়াল করে ক্রেতাকে আনন্দ দিয়ে যাচ্ছেন, নামকরা সব গীতিকার, সুরকার কিংবা প্রযোজকদের পেছনে হন্যে হয়ে ঘুরছেন, কোরাস গানে একটু তিন-চার মিনিট দাঁড়িয়ে দুই পয়সা আয় করেন সংসার চালাবেন বলেÑতারা কি শ্রমিকের কাতারে পড়েন!
ক’বছর আগে মে দিবসের এক অনুষ্ঠানে কয়েকজন শ্রমিককে জিজ্ঞাসা করেছিলাম মে দিবস মানে কি, এ দিনে কি হয়েছিল প্রভৃতি। কিন্তু কোনো উত্তর মেলেনি। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন চারপাশে স্পষ্টত শুধু হিন্দি আর বাংলা গানের তাণ্ডব, নাচানাচি, চিল্লাহল্লা, খাওয়া-দাওয়া ছাড়া আর কিছু নেই। অধিকার চাই, এটা-ওটা চাই বলে যারা চিৎকার-চেঁচামেচি করছে, তাদের কার্যক্রম কি শুধুই আনুষ্ঠানিকতা, বক্তৃতা-বিবৃতিতেই সীমাবদ্ধ? যে কার্যক্রম ও আচরণ দু’যুগ ধরে দেখে আসছি, তা কাগজের পরিমাণই শুধু বাড়িয়ে যাচ্ছে।
কায়িক শ্রমের কথা বলা হলো। এরপর অফিসার, এক্সিকিউটিভসহ বিভিন্ন পদবিতে ভূষিত যারা, তারা কি শ্রমিক শ্রেণিতে পড়েন? ইন্টেলেকচুয়াল লেবার কাকে বলেÑএকটু গুগলকে শ্রশ্ন করুন। যদি তাকেও লেবার/শ্রমিক বলা হয়, তাহলে তার জন্য কি কোনো আইন আছে? থাকলেও তার কি কোনো প্রয়োগ আছে? একই বাসে দু’ধরনের শ্রমিক, যায় একজন কায়িক শ্রম দিচ্ছেনÑযেমন বাসের হেলপার, আরেকজন মানসিক শ্রম দিচ্ছেন। তো এই ইন্টেলেকচুয়াল লেবারের গলা থেকে টাই আর হাত থেকে ল্যাপটপটা কেড়ে নিলে দুজনের কাজের সময় কিংবা অধিকারের খুব একটা পার্থক্য হবে বলে মনে হয় না।
দুজনেই ভোরে বের হয়ে বাড়িতে পৌঁছান রাত ১১-১২টায়। দুজনেই কারও না কারও গালি (না হলেও ধমক) খাচ্ছেন নিয়ত। দুজনেই দিনশেষে পরাজিত, ক্লান্ত, অবসাদগ্রস্ত।
মে দিবস নিয়ে আরও অনেক জানা-অজানা তথ্য রয়েছে, তা লিখে শেষ করা যাবে না। সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমরা অন্যান্য দিনের মতো এ দিনটির তাৎপর্য নিয়েও দোদুল্যমান অবস্থানে। যেমন একুশে ফেব্রুয়ারিতে অলিগলিতে হিন্দি গান বাজে, ঠিক তেমনি মে দিবসও শুধু একটি উৎসব হিসেবেই পালিত হচ্ছে অনেক জায়গায়। অনেকের এ নিয়ে ছিটেফোঁটা ধারণাও নেই। এতে ইতিহাসের ক্ষতি হচ্ছে না, বঞ্চিত হচ্ছে শ্রমিক, লঙ্ঘিত হচ্ছে তাদের অধিকার।

মানবসম্পদ প্রশিক্ষক
chanchal.songÑgmail.com