মে মাসে জাইকার সঙ্গে প্রকল্প ঋণচুক্তি

  মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: মাতারবাড়ীতে হতে যাচ্ছে দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর। এতে ১৬ মিটার ড্রাফটের জাহাজে ৮০০০ টিইইউএএসের বেশি কনটেইনার নিয়ে জাহাজ সহজে ভিড়তে পারবে। এতে দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের গতিশীলতা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে। এ জন্য জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) সঙ্গে প্রকল্প ঋণচুক্তি সই হতে যাচ্ছে আগামী মাসে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মতে, চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান সক্ষমতা আছে সাড়ে আট থেকে ৯ মিটার ড্রাফটের একটি জাহাজ সর্বোচ্চ আড়াই হাজার টিইইউএস কনটেইনার নিয়ে চলাচল করে। অথচ প্রতিবেশী রাষ্ট্র শ্রীলঙ্কার কলম্বো পোর্টে একটি জাহাজ ১৯ হাজার ২০০ টিইইউএস কনটেইনার নিয়ে চলাচল করে থাকে। এমনকি চেন্নাই পোর্টেও ছয় হাজার ৮০০ টিইইউএস কনটেইনার নিয়ে জাহাজ চলাচল করতে পারে। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দর অনেক পুরোনো একটি বন্দর। আর বর্তমান আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি অনুসারে ২০৪১ সালে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ হবে ৫৭ লাখ হতে ৬৫ লাখ টিইইউএস এবং জাহাজের সংখ্যা হবে আট হাজার ২০০টি, যা বর্তমান বন্দর দিয়ে এ চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। এ জন্য মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শেষ করেছে উন্নয়ন সংস্থা জাইকা। ২০২৩ সালের মধ্যে এর অপারেশনাল কার্যক্রম শুরু করার লক্ষ্য চলতি বছরের মে মাসে ঋণচুক্তি সই হতে যাচ্ছে।

জানা যায়, জাইকার অর্থায়নে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ৪৬০ ফুট দৈর্ঘ্যরে কনটেইনার জেটি এবং ৩০০ ফুট দৈর্ঘ্যরে মাল্টিপারপাস জেটি নির্মাণ করা হবে। মাতারবাড়ী বন্দরে আরও একাধিক জেটি নির্মাণের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা থাকবে। কনটেইনারসহ অন্যান্য কার্গোর পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে বন্দরের আয়তন বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে। জাইকার উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল গত কয়েক মাসে বন্দর সংক্রান্ত বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে।

জাইকার পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞরা বলেন, গভীর সমুদ্রবন্দর বাংলাদেশের জন্য একটি ব্যাপক সম্ভাবনাময় প্রকল্প। এটি বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে আরও বিস্ময় ও চমক দেখাতে পারবে। এ সমুদ্রবন্দর নির্মাণে জাইকা ইতোমধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানাভাবে অগ্রসর হচ্ছে। আশা করছি খুব দ্রুত সুসংবাদ দিতে পরব।

চট্টগ্রাম বন্দরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, জাপানের জাইকার অর্থায়নে কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করা হবে। এ প্রকল্পে জাপান প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে চায়। জাইকা নিজেদের আদলে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে চায়। জাইকা ইতোমধ্যে পুরো বিষয়টি নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর, রেলওয়ে, সড়ক ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেছে। আর জাইকা জাপানের কাশিমা বন্দরের আদলে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করতে চায়।

বন্দর চেয়্যারম্যাস কমোডর জুলফিকার আজিজ বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর অনেক পুরোনো একটি বন্দর। আর বর্তমান আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি অনুসারে ২০৪১ সালে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ হবে ৫৭ লাখ হতে ৬৫ লাখ টিইইউএস এবং জাহাজের সংখ্যা হবে আট হাজার ২০০টি। যা বর্তমান বন্দর দিয়ে এ চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। তাই আমাদের মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করতে হবে। এটির কোনো বিকল্প নাই। আর এটি নির্মাণে আমার ফিজিভিলিটি স্টাডি করছি।

তিনি আরও বলেন, বিদ্যমান চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ভবিষ্যতের দেশের চাহিদা পূরণ অসম্ভব। স্বল্পমেয়াদে বে টার্মিনাল নির্মাণ করে চাহিদা মোকাবিলা করতে হবে। কিন্তু মাতারবাড়ী ডিপ সিপোর্ট আমাদের অর্থনীতির চেহারা পাল্টে দেবে। এ বন্দর দিয়েই আমাদের ভবিষ্যতের উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণ হবে।

উল্লেখ, জাইকা মাতারবাড়ীতে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য জেটি নির্মাণ করতে গিয়ে উক্ত স্থানে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের সম্ভাবনা দেখতে পায়। যদি কক্সবাজার এলাকায় সোনাদিয়ায় একটি গভীর সমুদ্র নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হলেও শেষ পর্যন্ত তা আর এগোয়নি।