ঘুরে দাঁড়াচ্ছে চীনের শিল্প খাত

ম্যানুফ্যাকচারিং প্রবৃদ্ধি দুই বছরে সর্বোচ্চ

শেয়ার বিজ ডেস্ক: চলতি বছরের নভেম্বরে চীনে ম্যানুফ্যাকচারিং প্রবৃদ্ধি দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ হারে বেড়েছে। সস্তা ঋণ ও চাহিদা বৃদ্ধি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটির শিল্প খাতকে ঘুরে দাঁড়াতে ভূমিকা রাখছে। খবর এএফপি।

চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দীর্ঘ সময় শ্লথগতিতে রয়েছে। গত মাসের পারচেজিং ম্যানেজার ইনডেক্সে (পিএমআই) প্রত্যাশার চেয়ে বেশি পয়েন্ট দেশটির প্রবৃদ্ধির জন্য ইতিবাচক বার্তা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চীনের ন্যাশনাল ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিক্সের (এনবিএস) তথ্যমতে, কারখানা ও খনির বর্তমান পরিস্থিতি নির্ণয়ক পিএমআই নভেম্বরে বেড়ে ৫১ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছেছে। ২০১৪ সালের জুলাইয়ের পর সূচকের এ পয়েন্টই সর্বোচ্চ। ব্লমবার্গ নিউজের জরিপের পূর্বাভাস ৫১ পয়েন্টের চেয়েও এ সূচক বেশি। অক্টোবরে পিএমআই ছিল ৫১ দশমিক দুই পয়েন্টে।

পিএমআই পয়েন্ট ৫০-এর বেশি হলে মনে করা হয় কর্মকাণ্ড সম্প্রসারিত হচ্ছে। আর ৫০-এর নিচে হলে সংকোচিত হচ্ছে।

এনবিএসের বিশেষজ্ঞ জাও কিংহি এক বিবৃতিতে জানান, বাজার চাহিদা বৃদ্ধি ম্যানুফ্যাকচারিং কর্মকাণ্ড বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি ভোক্তাপণ্য ও উচ্চ প্রযুক্তির সরঞ্জাম উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। তবে কাঁচামাল ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় এবং দেশটির মুদ্রা ইউয়ানের ওঠানামায় কোম্পানিগুলোর উৎপাদন এখনও কিছু জটিলতায় রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

জাপানভিত্তিক নামুরা হোল্ডিংসের বিশ্লেষক জাও ইয়াং বলেন, ‘মুদ্রার মান কমে যাওয়ায় চীনের নতুন রফতানি অর্ডার বেড়েছে।’ ইয়েনের অবচয় অব্যাহত থাকবে বলে তিনি প্রত্যাশা করেন। ফলে আগামী বছরও দেশটির রফতানি ভালো হবে বলে মনে করেন তিনি।

লন্ডনভিত্তিক ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের জুলিয়ান ইভানস জানান, উদ্দীপক ব্যবস্থাগুলোর জন্যই মূলত চীনের ম্যানুফ্যাকচারিং স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসছে। তবে বাড়ি কেনায় নিষেধাজ্ঞা দেশটির সম্পত্তি খাতে প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমাবে। ফলে গত কয়েক মাস ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আগে আরেক ধাপে মন্দার আশঙ্কা করছেন তিনি।

এছাড়া ছোট কোম্পানির কর্মকাণ্ডের নিরিখে তৈরি বেসরকারি কেইজিন পারচেজিং ম্যানেজার ইনডেক্সও ইতিবাচক ছিল, যদিও প্রবৃদ্ধির হারে কিছুটা শ্লথগতি ছিল।

ব্যবসা ও শিল্প খাতের বিশ্লেষক লন্ডনভিত্তিক আইএইচএস মার্কেট ও চীনের ফিন্যান্সিয়াল ম্যাগাজিনের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, নভেম্বরে কিছুটা কমে এর পয়েন্ট ৫০ দশমিক ৯ হয়েছে। আগের মাসে এ পয়েন্ট ছিল পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ (৫১ দশমিক ২)।

কেইজিনের বিশ্লেষক জং জেংসেং বলেন, ‘নভেম্বরে চীনের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিক উন্নতি হয়েছে, যদিও তা আগের মাসের তুলনায় কিছুটা কম ছিল। বেকারত্বের হারে কিছুটা দুর্বলতা ও প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে বলা যায়Ñচীনের শিল্প খাত আগামী মাসে কিছুটা নি¤œমুখী থাকবে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে দেশটিতে প্রবৃদ্ধি অব্যাহত বজায় থাকবে।’

বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম শক্তি চীন। কিন্তু গত বছর দেশটির প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ছয় দশমিক ৯ শতাংশ, যা প্রায় ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনি¤œ। চলতি বছরও দেশটির প্রবৃদ্ধিতে শ্লথগতি বজায় থাকবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এর আগে অক্টোবরে টানা চতুর্থ মাসের মতো চীনের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে পতন ঘটেছিল। ওই সময় দেশটির রিজার্ভ কমেছে ৪৫ দশমিক সাত বিলিয়ন ডলার। ফলে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটির রিজার্ভ ২০১১ সালের পর সর্বনি¤েœ পৌঁছায়।

সাম্প্রতিক সময়ে চীনা অর্থনীতিতে শ্লথগতি দেখা দেওয়ার পর থেকে দেশটির রিজার্ভের পরিমাণ কমেই চলেছে। গত বছরের মে মাস নাগাদ রিজার্ভ হ্রাসের পরিমাণ ছিল ৫১৩ বিলিয়ন ডলার। চীনের ইতিহাসে রিজার্ভে সবচেয়ে বড় বার্ষিক পতন ছিল সেটা।

এছাড়া সেপ্টেম্বরে চীনের শিল্প খাতে মুনাফার প্রবৃদ্ধিও কমেছে।

এনবিএসের তথ্যমতে, ইলেকট্রনিকস, স্টিল ও বিদ্যুৎ খাতে প্রবৃদ্ধির শ্লথগতির কারণে সব মিলিয়ে শিল্প মুনাফা প্রবৃদ্ধি আগের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে।

চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে চীনে শিল্প খাতে মুনাফা বেড়েছে আট দশমিক চার শতাংশ। জানুয়ারি থেকে আগস্টেও প্রবৃদ্ধি একই ছিল।

খননকারী কোম্পানিগুলোর সেপ্টেম্বরে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩০ দশমিক তিন শতাংশ মুনাফা বেড়েছে। ২০১৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে টানা পতনের পর এটাই প্রথম বৃদ্ধি। আগস্টে এ খাতে মুনাফা কমেছিল ২৫ দশমিক তিন শতাংশ।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর মুনাফা সেপ্টেম্বরে বেড়েছে ৪৭ দশমিক ছয় শতাংশ। চলতি বছরের জানুয়ারির পর এটা সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি।

প্রথম আট মাসে ৪১টি শিল্প খাতের মধ্যে ৩১টিতে মুনাফা বেড়েছে। এর মধ্যে পেট্রোলিয়াম প্রক্রিয়াকরণ, পারমাণবিক জ্বালানি প্রক্রিয়াকরণ, লৌহঘটিত ধাতু বিগলনসহ কিছু খাতে মুনাফা দ্বিগুণ হয়েছে।

অন্যদিকে প্রথম ৯ মাসে আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে বিদ্যুৎ, তাপবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর মুনাফা পাঁচ দশমিক সাত শতাংশ কমেছে। এছাড়াও তেল এবং গ্যাস খাতেও লোকসান হয়েছে। এদিকে এক জরিপে দেখা গেছে, চীনের জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যা কর্মশক্তি হারিয়ে এখন বৃদ্ধ। তাই ২০৫০ সালের মধ্যে চীনের কর্মশক্তি ২৩ শতাংশ কমে যেতে পারে।

দেশটিতে যাদের বয়স ১৬ থেকে ৫৯, তাদের কর্মশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু দেশটির মোট জনসংখ্যার ১৬ শতাংশ ২২০ মিলিয়ন মানুষের বয়স ৬০-এর ওপরে।

দেশটির মানবসম্পদ ও সামাজিক নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লি জং পূর্বাভাস দিয়ে বলেন, ৯১১ মিলিয়ন কর্মশক্তি ২৩ শতাংশ কমে ২০৫০ সালে ৭০০ মিলিয়নে নেমে আসতে পারে।