এসএমই প্রচ্ছদ

ঘরের ভেতর ট্যাংকিতে মাছ চাষ

এম ইদ্রিছ আলী, ময়মনসিংহ

খাল-বিল, নদী-নালা, পুকুর-দিঘির মতো কোনো বিশাল বা মাঝারি আকারের বদ্ধ কিংবা মুক্ত কোনো জলাশয় নয়। প্রচলিত ধারায় জলাশয় বলতে যা বোঝায়, তা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। রীতিমতো ঘরের ভেতর মাছ চাষ করার মতো এক অভিনব পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে ময়মনসিংহের একটি প্রতিষ্ঠান। স্বল্প জমি, অল্প পানিতে ঘরের ভেতর দুটি কামরা, দেখভাল করে দুজন। সে ঘরের ভেতরের কামরায় ১০ টন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন আটটি ট্যাংক। আর এ ট্যাংকেই উৎপাদিত হচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির সুস্বাদু মাছ। বাংলাদেশে প্রথম বিশ্বের সর্বাধুনিক মিনি রি-সার্কুলেশন একুয়াকালচার (মিনি আরএএস) প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঘরের ভেতরেই সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক উপায়ে মাছ চাষ করে তাক লাগিয়ে দিয়েছে ফিশ হ্যাচারি ও কালচার ফার্ম এগ্রো থ্রি প্রতিষ্ঠানটি।

প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার এবিএম শামসুল আলম বাদল বলেন, এ পদ্ধতিতে পুকুর বা জলাশয় অপেক্ষা ৩০ গুণ বেশি মাছ উৎপাদন করা সম্ভব। এখানে আটটি ট্যাংকে ৮৫ হাজার পাবদা, গুলশা ও মাগুর মাছের চাষ করা হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিন এখানে মাছ চাষের সঙ্গে সম্পৃক্ত আগ্রহী উদ্যোক্তা এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিজ্ঞানীরা পরিদর্শনে আসছেন। এছাড়া দেশের চাহিদা মিটিয়ে রফতানি বাড়াতেও এ পদ্ধতি ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছেন তারা।

এ পদ্ধতিতে বিশ্বের মাত্র কয়েকটি দেশে মাছ উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে চীন, মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ ও ভিয়েতনাম উল্লেখযোগ্য। তবে সেসব দেশে কোরাল, মাগুর বা কৈ চাষ হয়ে থাকে ব্যাপক হারে।

বাণিজ্যিকভাবে পাঁচ মাস আগে ময়মনসিংহ শহরের মাসকান্দা এলাকায় বিসিক শিল্প নগরীতে একটি টিনশেড ঘরে এ শৈল্পিক মাছ চাষ পদ্ধতির সূচনা। যেখানে ১০ টন ধারণক্ষমতার আটটি ট্যাংকে চাষ হচ্ছে পাবদা, গুলশা, মাগুরের মতো বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষ হয় বলে দ্রুত বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মাছের গুণগত মান হয় উন্নত ও স্বাস্থ্যসম্মত। আশার কথা, এ প্রযুক্তিতে মাছের মৃত্যুহার নেই বললেই চলে।

চলতি বছরের আগস্টের শুরুতে আটটি ট্যাংকের মধ্যে তিনটিতে ১২ হাজার করে পাবদা, চারটিতে ১২ হাজার করে গুলশা ও একটিতে চার হাজার মাগুর মাছ ছেড়ে চাষ শুরু হয়। ইতোমধ্যে পাবদা মাছ বিক্রিও করা হয়েছে। গত সপ্তাহে এ পাবদা বিক্রি হয় প্রতি কেজি ৬০০ টাকা দরে।

আর পরীক্ষামূলকভাবে অন্য একটি পাত্রে চাষ করা হয় বিলুপ্তপ্রায় মহাশোল। চকচকে সোনালি রঙের এ মাছ নেত্রকোনার কংসসহ বিভিন্ন নদীতে পাওয়া যেতো। প্রচলিত ধারণা ছিল নদী ছাড়া এ মহাশোল মাছ পাওয়া অসম্ভব। কিন্তু সব ধারণা পাল্টে দিয়ে ঘরের ভেতরেই সুস্বাদু এ মাছ চাষেও সফল হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে। পরবর্তী সময়ে বাণিজ্যিকভাবে মহাশোল মাছও চাষ করা হবে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাহায্য নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানী মশিউর রহমান।

চাষ প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানা যায়, মেকানিক্যাল ও বায়ো-পরিশোধন প্রক্রিয়ায় মাছের বর্জ্য, খাদ্যাবশেষ, দ্রবীভূত অ্যামোনিয়া, কার্বন ডাই-অক্সাইড এসব ক্ষতিকারক গ্যাস ৯০ শতাংশ পর্যন্ত অপসারণ সম্ভব মিনি আরএএস পদ্ধতিতে। ফলে এটি একটি শতভাগ অর্গানিক পদ্ধতি। এছাড়া পুকুরে অক্সিজেনের স্বল্পতা থাকলেও, এখানে সে অসুবিধা নেই। মাত্র পাঁচ সপ্তাহে মাছের ওজন বাড়ে ১০ গ্রামেরও বেশি। চার মাসেই হয়ে ওঠে বাজারজাত উপযোগী।

তবে মিনি রি-সার্কুলেশন একুয়াকালচার পদ্ধতিটি অনেকটাই ব্যয়বহুল। ব্যয়বহুল হলেও মাত্র দুই বছরের মধ্যেই খরচ মিটিয়ে লাভের মুখ দেখা যাবে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটি

ফিশ হ্যাচারি ও কালচার ফার্ম এগ্রো থ্রির স্বত্বাধিকারী এবিএম শামসুল আলম বাদল জানান, পুকুরে যেখানে প্রতি শতাংশে ৪০০ থেকে ৫০০ মাছ চাষ করা যায় সেখানে এ পদ্ধতিতে প্রতি কিউবিক মিটারে এক হাজার ২০০ মাছ চাষ করা যায়। ঢাকার সায়েন্স ল্যাবরেটরি তাদের সঙ্গে প্রতিনিয়িত যোগাযোগ করে তারাও মিনি আরএএস পদ্ধতিটি নিয়ে যৌথ কাজের প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানান শামসুল আলম।

তিনি বলেন, জমি সংকটের কারণে বিশ্বে আরএএস একটি জনপ্রিয় পদ্ধতি। দিন দিন বাংলাদেশেও জমি সংকট দেখা দিচ্ছে। তাই সরকারি সহায়তা অথবা ব্যক্তি উদ্যোগে যদি এ পদ্ধতিতে মাছ চাষ করা যায়, তাহলে বিপ্লব ঘটানো যাবে।

সর্বশেষ..