যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং বন্ধে নীতিমালা করছে ডিটিসিএ

নিজস্ব প্রতিবেদক: ঢাকা শহরে যানজটের অন্যতম কারণ ব্যস্ততম সড়কে পার্কিং। এটি বন্ধে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলো কাজে আসেনি। জরিমানা করেও ব্যস্ততম সড়কে পার্কিং বন্ধ করা যাচ্ছে না। তাই রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে গাড়ি সুষ্ঠুভাবে পার্কিংয়ে নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। এ কাজে সহায়তা করবে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)।
এরই মধ্যে পার্কিং নীতিমালা-২০১৮’র খসড়া চূড়ান্ত করেছে ডিটিসিএ। এতে বলা হয়েছে, ঢাকা শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, পদ্ধতির আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগীকরণ, সমন্বিত বাস্তবায়ন ও পার্কিং চার্জের মাধ্যমে সরকারের নন-ট্যাক্স রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির লক্ষ্যে এ নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। শিগগিরই তা মতামত গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের কাছে পাঠানো হবে।
নীতিমালায় ১৪টি বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে পার্কিং ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে সহায়ক আইন প্রণয়ন, পার্কিং ব্যবস্থাপনা পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়ন ও শক্তিশালীকরণের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে পার্কিং চাহিদা নিরূপণ ও তা পূরণে পৃথক চাহিদা এবং জোগান নীতিমালা সংযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) ও মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ এ নীতিমালার আলোকে নিজ নিজ নির্দেশিকা প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়েছে।
পার্কিং চাহিদা নীতিমালায় বলা হয়েছে, যেসব আবাসিক এলাকায় পার্কিংয়ের চাহিদা এর জোগানের চেয়ে কম, সেসব এলাকায় পার্কিংয়ের জন্য স্থান চিহ্নিত করে অবাধ পার্কিংয়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে স্থানীয় সড়ক বা শাখা সড়ক ব্যবহার করা যেতে পারে। আর যেসব এলাকায় পার্কিংয়ের চাহিদার চেয়ে জোগান কম, সেসব স্থানে নিয়ন্ত্রিত পার্কিং ব্যবস্থা প্রবর্তন করা যেতে পারে। এজন্য পার্কিং ব্যবস্থার ওপর প্রাইসিং বা যথাযথ ফি আদায়ের ব্যবস্থা থাকবে, যাতে পার্কিং নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
নিয়ন্ত্রিত পার্কিং স্থানগুলোর ক্ষেত্রে দু’ধরনের মাশুল বা ফি থাকতে পারে। এর মধ্যে যেসব স্থানে পার্কিং যানবাহন চলাচলে বিঘœ সৃষ্টি করে না, সেসব স্থানে স্বাভাবিক মাশুল আদায় করতে হবে। তবে যেসব স্থানে পার্কিং যান চলাচলে বিঘœ সৃষ্টি করে, সেখানে আলাদা হারে পার্কিং মাশুল নির্ধারণ করতে হবে, যা স্বাভাবিক পার্কিং মাশুলের চেয়ে বেশি হবে।
রাজউক ও দুই সিটি করপোরেশন জরিপের মাধ্যমে পার্কিংয়ে চাহিদা নিরূপণ করবে এবং সে অনুযায়ী অবাধ ও নিয়ন্ত্রিত পার্কিংয়ের স্থান চিহ্নিত করবে। এক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন রাস্তার জরিপ ও রাজউক ভূমি ব্যবহার জরিপের দায়িত্ব পালন করবে। এছাড়া নির্দিষ্ট বা সব যানবাহনের ক্ষেত্রে দিনের কোনো সময়ে বা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে ভ্রমণ বা যানবাহনের ধারণক্ষমতার চেয়ে কম যাত্রী বহন বা স্থানবিশেষে পার্কিংয়ে বিধিনিষেধ প্রদানের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
পার্কিং জোগান নীতিমালার ক্ষেত্রে পাঁচ বছর পরপর আদর্শ বা গুণগত মানের পর্যালোচনা করতে হবে এবং সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংশোধন ইমারত বিধিমালায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি রাজউক পার্কিংয়ের জন্য নতুন নতুন জায়গা অনুসন্ধান করবে। এছাড়া প্রত্যেক ভবনের পার্কিং সংস্থানগুলোর উপযোগিতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। যেসব ভবনে পার্কিং সুবিধার ঘাটতি রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে পার্কিং ফি আরোপের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
যেসব অঞ্চলে পার্কিং সুবিধার ঘাটতি রয়েছে, সেসব স্থানে পার্কিং পরিষেবা নির্মাণ ও পরিচালনায় বেসরকারি খাতকে সংযুক্ত করা যেতে পারে। মহানগরের সব গণপরিবহন ইন্টারচেঞ্জ স্থানে পার্ক অ্যান্ড রাইড সুবিধার প্রবর্তন করা যেতে পারে। ফিডার সড়ক বা শাখা সড়কে ‘অনস্ট্রিট পার্কিং’ সুবিধার সংস্থান করা যেতে পারে। পাশাপাশি ট্রাক টার্মিনাল ও বাস ডিপো নির্মাণের জন্য সুবিধাজনক স্থান চিহ্নিত করতে হবে।
এদিকে বড় বড় বাণিজ্যিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিপণিবিতান, হাসপাতাল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, কারখানা, প্রশাসনিক এলাকা প্রভৃতির ক্ষেত্রে পার্ক করার জন্য পার্কিং লটের সংস্থান রাখতে হবে। এজন্য স্থানীয় নগর নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ উপযুক্ত জায়গা চিহ্নিত করে পার্কিং লট নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করবে। আর পার্কিং লট নির্মাণে সমতল, বহুতল ও আন্ডারগ্রাউন্ডÑএ তিন ধরনের ব্যবস্থাই বিবেচনা করতে হবে। আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যবস্থার ক্ষেত্রে সুবিধাজনক স্থানে খেলার মাঠ, পার্ক প্রভৃতির বর্তমান সুবিধা বজায় রেখে পার্কিং লট হিসেবে পুনর্নির্মাণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
নীতিমালার আওতায় স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা পার্কিংয়ে প্রবিধানমালায় নির্দেশিত বিধিনিষেধ প্রয়োগ করবে। তারাই পার্কিং ফি আদায় করবে। এক্ষেত্রে অনুমোদিত রোড সাইন ও মার্কিং দিয়ে পার্কিংয়ের জন্য নির্ধারিত স্থান বা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এলাকা চিহ্নিত করবে। এছাড়া ধার্যকৃত ফি ও পার্কিং বিধান লঙ্ঘনের শাস্তি প্রবিধানমালা দ্বারা নির্ধারিত থাকবে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল হক শেয়ার বিজকে বলেন, রাজধানীতে যানজটের অন্যতম কারণ যত্রতত্র পার্কিং। তবে এ শহরে গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য নির্ধারিত জায়গা কখনোই রাখা হয়নি। আর নীতিমালা না থাকায় এটি নিয়ন্ত্রণও করা যাচ্ছে না। যদিও আরও আগেই এ ধরনের নীতিমালা প্রণয়ন করা দরকার ছিল।
তিনি আরও বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত ও মেগা শহরে এ ধরনের নীতিমালা রয়েছে। এতে শহরের ভেতরে পার্কিংয়ের জন্য গুণিতক হারে চার্জ আরোপ করা হয়। ঢাকা শহরেও চার্জ আরোপের ক্ষেত্রে বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। নামমাত্র চার্জ ধার্য করা হলে নীতিমালা নিয়ে পার্কিং নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।