মত-বিশ্লেষণ

যথাযথ পরিচর্যায় অটিস্টিক শিশুরা মানবসম্পদে পরিণত হতে পারে

 

ইলিয়াছ হোসেন পাভেল :ফারহান আরিফ নাফির বয়স ২১। তিন বছর বয়সে তার মা বুঝতে পারেন সন্তানের মধ্যে কোনো সমস্যা আছে। তিনি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। চিকিৎসক পরীক্ষা করে জানিয়ে দেন শিশুটি অটিজমে আক্রান্ত। তখন নাফির মা-বাবা বিষয়টিকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেন, কিন্তু আত্মীয়স্বজন বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে নেননি। নাফির মা-বাবার দাবি, অটিজমবান্ধব একটি সমাজ তৈরি করতে হবে। কারণ নাফিকে তার মা যখন বাসা থেকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া-আসা করেন, সে সময় মাঝেমধ্যে বাসে যাতায়াত করতে হয়। কিন্তু কখনও কখনও নাফি হঠাৎ করে চিৎকার করে ওঠে। এতে আশপাশের লোকজন বিরক্ত হয়।
অটিজম কোনো মানসিক রোগ নয়, মস্তিষ্কের একটি বিকাশগত সমস্যা, যা একটা শিশুর মধ্যে তিন বছরেই প্রকাশ পায়। অটিজম সমস্যায় আক্রান্তদের বলা হয় অটিস্টিক। অটিজম সম্পর্কে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য সচেতনতা অনেক বেড়েছে, তবে কিছু প্রতিবন্ধকতা এখনও রয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে গবেষকরা অটিজমকে ‘অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। অটিজমে অক্রান্ত শিশুদের কিছু আচরণগত সমস্যা লক্ষ করা যায়, যেমন সামাজিকভাবে মেলামেশা না করা, চোখে চোখ রেখে কথা না বলা, ঠিকমতো গুছিয়ে কথা বলতে না পারা, কোনো কাজে মনোযোগী না হওয়া, কোনো কোনো ক্ষেত্রে শারীরিক বৃদ্ধি সঠিকভাবে না হওয়া প্রভৃতি।
অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে দেখা, শোনা, স্বাদ, গন্ধ ও স্পর্শে প্রতিক্রিয়াহীনতা পরিলক্ষিত হয়। এ ধরনের শিশুদের সাধারণত অনেক সময় খিঁচুনি হয়। তাছাড়া অনেকেই হয় মানসিকভাবে অস্থির প্রকৃতির ও বিষন্ন। অটিজম বলতে শুধু একটি অসুখকে বোঝায় না, আসলে এটি কয়েকটি অসুখের সমষ্টি।
অটিজম কেন হয়, তার সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়নি। মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক জৈব রাসায়নিক কার্যকলাপ, মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক গঠন ও বংশগতির অস্বাভাবিকতা থেকে এ সমস্যা হতে পারে বলে বিভিন্ন গবেষণায় প্রতীয়মান হয়। গর্ভকালে মায়ের ভাইরাস জ্বর, জন্মের সময় শিশুর অক্সিজেনের অভাব, পরিবেশদূষণ ও অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণের ফলে অটিস্টিক শিশু জন্মগ্রহণ করতে পারে।
সাধারণত তিন বছর বয়সে অটিজমের লক্ষণ ধরা পড়ে। এক বছর বয়সে নাম ধরে ডাকলে কোনো প্রতিক্রিয়া না করা, ১৪ মাস বয়সে কোনো কিছু দেখে আগ্রহ প্রকাশ না করা, ১৮ মাস বয়সে কোনো খেলার বস্তু নিয়ে না খেলা, দৃষ্টিসংযোগ না করে বরং একা একা থাকতে পছন্দ করা, ভাষাগত ত্রুটি, একই শব্দ বারবার বলা, প্রশ্নের অসংলগ্ন উত্তর দেওয়ার প্রবণতা, দৈনন্দিন কাজের প্রতি অনীহা এবং অস্বাভাবিক শারীরিক অঙ্গভঙ্গি প্রভৃতি প্রতিক্রিয়া শিশুর মধ্যে দেখা যায়। তবে যত কম বয়সে অটিজম শনাক্ত করা সম্ভব হবে, ততই শিশুকে স্বাভাবিক আচরণে ফিরিয়ে আনার সুযোগ বেশি থাকে।
অটিস্টিক শিশুদের সমাজের বোঝা মনে না করে বরং এসব শিশুকে যথাযথ পরিচর্যার মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব। এক্ষেত্রে অটিজম সম্পর্কে সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজকের অটিস্টিক শিশুরা যাতে ভবিষ্যতে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে, সে লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। শতকরা ৭০ ভাগ অটিস্টিক শিশুর আইকিউ ৭০-এর নিচে থাকে। তবে কিছু অটিস্টিক শিশু বেশ বুদ্ধিমান হয়। অনেক সময় দেখা যায়, বিশেষ ক্ষেত্রে তারা অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ ও পারদর্শী হয়ে থাকে।
অটিস্টিক শিশুদের প্রতিবন্ধী বলা যাবে না, কেননা প্রতিবন্ধিত্বর অর্থ হলো বিশেষ কোনো বাধার বা প্রতিবন্ধকতায় কোনো কাজ করতে না পারা। পরিবারে এমন কিছু শিশু দেখা যায় যাদের শারীরিক গঠন স্বাভাবিক নয় হাত বা পা নেই, কানে শোনে না; ফলে কথা বলতে পারে না। অনেকে চোখে দেখে না, বা কম দেখে। এটা হলো প্রতিবন্ধিত্ব। আবার কোনো ব্যক্তি যদি তার বয়স অনুযায়ী ব্যক্তিগত বা সামাজিক পর্যায়ে কাক্সিক্ষত আচরণ করতে সক্ষম না হয়, তবে তাকে মানসিক প্রতিবন্ধী বলা হয়। অটিস্টিক শিশুদের সাধারণত এ ধরনের প্রতিবন্ধকতা থাকে না। অটিস্টিক শিশুরা কখনও বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে অত্যন্ত পারদর্শী হয়। এ ধরনের শিশুদের তাই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু বা বুদ্ধিবৃত্তিক চাহিদাসম্পন্ন বলা হয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস ২০১৮’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক শিশুরা সমাজের বোঝা নয়। এদের সুপ্ত প্রতিভা আছে। তাদের উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে পারলে তারা আমাদের সম্পদ হবে। তাই তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে।’ অটিস্টিক শিশুদের মূল ধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত করে গড়ে তুলতে সরকারি ও বেসরকারিভাবে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান কাজ করে যাচ্ছে। অটিস্টিক শিশুদের বিশেষভাবে যত্ন নিতে প্রয়োজন প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনবল। একইসঙ্গে প্রয়োজন মায়া-মমতা ও দরদ দিয়ে কাজ করার মানসিকতা। তবেই এ ধরনের শিশুদের আগামী দিনের উপযোগী মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের প্রয়োজন বিশেষ শিক্ষা ও শিক্ষালয়, যেখানে তাদের বিশেষভাবে পাঠদান করা যায়। নিবিড়ভাবে ব্যবহারিক পরিচর্যা, বিশেষ স্কুলভিত্তিক প্রশিক্ষণ, সঠিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা, নিয়মিত অনুশীলন, প্রয়োজনীয় থেরাপি ও ধারাবাহিক জীবনযাপন একটি শিশুর অটিজম সমস্যা অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। বিভিন্ন সময় অভিভাবকদের অনেকেই পরামর্শ দিয়ে থাকেন, এই বিশেষ শিশুগুলোকে সাধারণ স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য। কিন্তু সাধারণ স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীর তুলনায় শিক্ষকের সংখ্যা খুবই অপ্রতুল, যেখানে বিশেষ শিশুদের জন্য এক অনুপাত তিন হারে শিক্ষক থাকা উপযুক্ত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষ শিশুদের স্বনির্ভর করতে তারা কীভাবে খাবে, ব্রাশ করবে, গোসল করবে, কাপড় পরবে ও ছাড়বে, জুতামোজা পরবে, চুল আঁচড়াবে, টয়লেট করবে সবই শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত। বিশেষ শিশুকে আগে স্বনির্ভর করতে হবে এবং পরে আক্ষরিক জ্ঞান প্রদান করতে হবে। বিষয়টি আবেগের বিষয় নয়, সামাজিক লজ্জাবোধেরও বিষয় নয়। তবে বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে বিশেষ শিশুকে বিশেষায়িত শিক্ষালয়ে ভর্তি করাতে হবে।
বাংলাদেশে যে হারে অটিস্টিক শিশুর সংখ্যা বাড়ছে, সেই অনুপাতে তাদের জন্য স্কুলের সংখ্যা অপর্যাপ্ত। ঢাকার বাইরের জেলা শহরগুলোতে শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নেই বললেই চলে। বাংলাদেশে প্রতি ৫০০ জনে একজনকে অটিস্টিক শিশু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সে হিসেবে বাংলাদেশে দুই দশমিক পাঁচ লাখ শিশু অটিস্টিক। ভারতেও ৫০০ জনে একজন এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ১০ হাজার শিশুর মধ্যে চার দশমিক পাঁচ শিশু অটিস্টিক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, শুধু ঢাকা বিভাগেই অটিস্টিক শিশুর হার শূন্য দশমিক ৮৪ ভাগ।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী দেশে অটিস্টিক শিশুর সংখ্যা আনুমানিক দেড় লাখ। দেশের সর্বশেষ আদমশুমারির তথ্যমতে, দেশে ৯ দশমিক সাত শতাংশ মানুষ প্রতিবন্ধী। আন্তর্জাতিকভাবে কোনো দেশের মোট প্রতিবন্ধীর এক শতাংশকে অটিস্টিক হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। সমাজসেবা অধিদফতরের প্রতিবন্ধী শনাক্তকরণ জরিপ (২০১৩-১৬) অনুযায়ী দেশে অটিস্টিক শিশুর সংখ্যা ৪১ হাজার ৩২৯। এদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক জরিপে বলা হয়েছে, ঢাকা শহরে অটিস্টিক শিশুর হার তিন শতাংশ আর ঢাকার বাইরে দশমিক সাত শতাংশ।
আমাদের উচিত অটিস্টিক শিশুদের অবহেলা বা অনাদর করা নয় অটিস্টিক শিশুদের জন্য একটি বাসযোগ্য সুন্দর মানবিক পৃথিবী গড়ে তোলা। আমাদের মনুষ্যত্ব ও মানবিকতাকে জাগ্রত করতে হবে। সিদ্ধান্ত নিতে হবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন এ শিশু-কিশোরদের আর সামাজিকভাবে রুদ্ধ করে রাখব না, বন্দি করে রাখব না, শৃঙ্খলিত করে রাখব না।

পিআইডি প্রবন্ধ

সর্বশেষ..