যশোরে কীটনাশক প্রয়োগ বন্ধ হচ্ছে না সবজিক্ষেতে

কাজে আসছে না কৃষি বিভাগের উদ্যোগ

মীর কামরুজ্জামান মনি, যশোর: বেগুনের মাজরা পোকা দমনে ব্যবহার করা হয় মার্শাল, যার মূল উপাদান কার্বোসালফান। এটি প্রয়োগের ২১ দিনের মধ্যে ফসল খাওয়া যাবে না। পটোল, ঢেঁড়স, টমেটো ও বেগুনের ডগা এবং ফল ছিদ্রকারী পোকা দমনে ব্যবহার করা হয় সানটাপ অথবা কারটাপ। এটিরও ব্যবহারের ১৪ থেকে ২১ দিনের মধ্যে ফসল খাওয়া যাবে না। অথচ কৃষি বিভাগের নানা উদ্যোগের পরও যশোরে সবজিসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষেতে কীটনাশক প্রয়োগ বন্ধ হচ্ছে না।
দেশের প্রধান সবজি অঞ্চল যশোরের বারীনগর-চুড়ামনকাটি অঞ্চলে দেখা যায়, সকাল-বিকাল কীটনাশক স্প্রে করা হচ্ছে সবজি ক্ষেতে। কোনোরকম নিয়মের তোয়াক্কা না করে চাষিরা সবজি ক্ষেতে কীটনাশক স্প্রের পরপরই ক্ষেত থেকে সবজি তুলে তা বিক্রির জন্য বাজারে নিয়ে আসছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, কীটনাশক মিশ্রিত সবজি খাওয়ার কারণে মানুষ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। পরিবেশের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
জানা গেছে, ২০০১ সালের দিকে কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের কীটতত্ত্ব বিভাগ দেশে সর্বপ্রথম যশোরের গাইদঘাট অঞ্চলে বেগুন ও করলার ক্ষেতে ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা নিধনে কীটনাশকের বদলে ফেরোমন সেক্স ট্র্যাপ ব্যবহার শুরু করে। যশোরের মাঠে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে দুবছর পর এ প্রক্রিয়া সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। তবে অনেকে আবার কীটনাশক প্রয়োগে ঝুঁকে পড়ছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত উপপরিচালক সুশান্ত কুমার তরফদার বলেন, ফসলের ক্ষেতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগ বন্ধে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সবজি জোন হিসেবে পরিচিত এ যশোরে আমরা কৃষককে কীটনাশকের পরিবর্তে বালাইনাশক পদ্ধতি ব্যবহার করার পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছি। এ সময় জেলার অধিকাংশ এলাকায় কীটনাশকের প্রয়োগ কমেছে বলে তিনি দাবি করেন।
যশোর আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম বলেন, প্রজননের সময় পুরুষ পোকাকে আকৃষ্ট করতে স্ত্রী মথ এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ নির্গত করে, যা সেক্স ফেরোমন নামে পরিচিত। সেক্স ফেরোমনের গন্ধে পুরুষ পোকা আকৃষ্ট হয় এবং স্ত্রী পোকার সঙ্গে মিলিত হয়। এ সেক্স ফেরোমন বর্তমান দেশে কৃত্রিম উপায়ে তৈরি করেছেন বিজ্ঞানীরা।
তিনি জানান, প্লাস্টিকের ছোট ছোট টিউবে কিছু পরিমাণ পানি ভরে ঝুলিয়ে রাখা হয় বেগুনসহ বিভিন্ন সবজি ক্ষেতে। প্রতি টিউবের মধ্যে ২/৩ মিলিগ্রাম করে ফেরোমনও রাখা হয়। ফেরোমনের গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে পুরুষ পোকা টিউবের মধ্যে প্রবেশ করে এবং একপর্যায়ে পানিতে পড়ে মারা যায়। এ পদ্ধতির বাইরে যেসব কৃষক সবজি ক্ষেতে কীটনাশক প্রয়োগ করছেন তারা ভুল করছেন।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর দেশের ফসলের ক্ষেতে প্রায় ২৯ হাজার টন রাসায়নিক কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। যার আমদানি মূল্য প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা। এর অন্তত ১০ শতাংশ ব্যবহার করা হয় সবজি ক্ষেতে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষকদের কীটনাশক প্রয়োগের বিপরীতে বিকল্প পন্থায় সবজি চাষ করার নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাজের কাজ হচ্ছে না।
তবে চাষিরা বলছেন, কৃষি বিভাগের এসব উদ্যোগের পরও যশোরের চাষিরা সবজি ক্ষেতে কীটনাশক প্রয়োগ করতে বাধ্য হচ্ছেন। জেলার আবদুলপুর গ্রামের কৃষক রহমত আলী বলেন, সবজি ক্ষেতে এমন এমন কিছু পোকা আক্রমণ করে তখন ক্ষেতে কীটনাশক দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। বিশেষ করে বেগুন, করলা, শসা ও পটোল ক্ষেতে কীটনাশক প্রয়োগ ছাড়া উপায় নেই। এ জন্য কৃষকরা শুধু বালাইনাশক পদ্ধতি অনুসরণের ওপর ভরসা করতে পারেন না।
সদর উপজেলার কোদালিয়া গ্রামের কৃষক তবিবর রহমান জানান, তিনি বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে ফেরোমন ট্র্যাপ হলুদফাঁদ, আলোরফাঁদ নামে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। তবে ফসলের ক্ষেতকে পোকার হাত থেকে রক্ষা করতে পারছি না। ফেরোমন ট্র্যাপের দাম বেশি। এ জন্য কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে এসব যন্ত্র সরবরাহের দাবি জানান তিনি।
এদিকে যশোর অঞ্চলের সবজি চাষিদের নিরাপদ সবজি উৎপাদনের জন্য বেসরকারি বিভিন্ন কৃষি উন্নয়ন সংস্থা কাজ করছে। এর মধ্যে জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশনের আওতাধীন সলিডারিডাট ‘সফল’ নামে প্রকল্পের মাধ্যমে জেলার চুড়ামনকাটি, সাতমাইল এলাকায় কৃষককে প্রশিক্ষিত করে জমিতে বালাইনাশক পদ্ধতিতে চাষে সহায়তা করছে। এসব নিরাপদ সবজি ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যেসহ বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রে পাঠানো হচ্ছে।
প্রকল্পের প্রোগ্রাম ম্যানেজার আবু ইউসুফ জানান, চলতি বছরে যশোর থেকে প্রায় ১০০ টন নিরাপদ উপায়ে উৎপাদিত পটোল বিদেশে রফতানি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব সবজি উৎপাদনে কীটনাশক ছাড়াই সেক্স ফেরোমন ট্র্যাপ, হলুদফাঁদ ব্যবহারে কৃষকদের সার্বিক সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।