যাত্রী চাপ বাড়লে সার্জের নামে দ্বিগুণের বেশি ভাড়া আদায়

নতুন প্রতারণা উবারের

ইসমাইল আলী: ‘আজকে রাতে মহাখালী থেকে টিকাটুলী আসছিলাম উবারে। আমার ফেয়ার দেখাচ্ছিল ৪০০ টাকা। কিন্তু নামার পর দেখি ভাড়া এক হাজার ২০ টাকা। কারণটা কী? কারও কোনো আইডিয়া?’ গত শুক্রবার রাতে ফেসবুকে এভাবেই স্ট্যাটাস দিয়েছেন পুরান ঢাকার ওয়ারী এলাকার বাসিন্দা শফিক আহমেদ। সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন ভাড়ার খাতভিত্তিক বিশ্লেষণ। এতে ভাড়ার সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে সার্জ।

শুক্রবার রাতে ফেসবুকে প্রায় একই ধরনের স্ট্যাটাস দেন উত্তরার বাসিন্দা জাহিরুল ইসলাম। তিনি লিখেছেন, ‘দোয়েল চত্বর থেকে উত্তরার ভাড়া হাজার টাকার বেশি। এ শীতে অনলি লোকাল বাস ইজ অ্যাফোরডেবল।’ অস্বাভাবিক ভাড়া নিয়ে অভিযোগ করে মিরপুরের বাসিন্দা মিনহাজ আহমেদ লিখেছেন, ‘মিরপুর-১০ থেকে খামারবাড়ির ভাড়া সাড়ে ৪০০ টাকার বেশি। এটা তো মগের মুল্লুক। তিন-চার দিন ধরে এ ধরনের অস্বাভাবিক ভাড়া দেখানো হচ্ছে।’

* কোনো ধরনের আইনি নিয়ন্ত্রণ নেই
* নীতিমালা মন্ত্রিসভায় উঠছে আগামীকাল

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভাড়া নিয়ে নতুন করে প্রতারণা শুরু করেছে উবার কর্তৃপক্ষ। গত কয়েক দিন ধরে সার্জের নামে হঠাৎ করেই অস্বাভাবিক হারে ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। কোনো কারণ ছাড়াই এ ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। ভিত্তি ভাড়া (বেইজ ফেয়ার), প্রতি কিলোমিটারের ভাড়া ও দূরত্ব অতিক্রমের সময়ের আনুপাতিক ভাড়াও বাড়িয়ে দিয়েছে উবার। কোনো ধরনের আইনি নীতিমালা না থাকায় ভাড়া নিয়ে যথেচ্ছাচার করা হচ্ছে।

সূত্রমতে, কোনো ঘোষণা ছাড়াই ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে উবার। এর প্রমাণ মেলে শফিক আহমেদ নামক এক যাত্রীর ফেসবুক স্ট্যাটাসে। তিনি উবারের বর্ধিত ভাড়ার তালিকাও যুক্ত করে দিয়েছেন তার স্ট্যাটাসে। এতে দেখা যায়, প্রতি কিলোমিটারের ভাড়া ২৮ টাকা ৬০ পয়সা। আর ভিত্তি ভাড়া হবে ১০৪ টাকা ও যাত্রাপথের সময়ের জন্য প্রতি মিনিটের চার্জ তিন টাকা ৯০ পয়সা। যদিও কোম্পানিটির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ঢাকায় উবারে ভ্রমণের ক্ষেত্রে প্রতি কিলোমিটারের ভাড়া ১৮ টাকা। আর ভিত্তি ভাড়া হবে ৪০ টাকা ও যাত্রাপথের সময়ের জন্য প্রতি মিনিটের চার্জ তিন টাকা।

হঠাৎ এ ধরনের বাড়তি ভাড়া আদায়ের কারণ সম্পর্কে জানতে উবারের ঢাকা অফিসে যোগাযোগ করা হলেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে উবার ব্যবহারকারীদের ফেসবুক পেজের অ্যাডমিন নাফিস হাসান ব্যাখ্যা দিয়েছেন বিষয়টির। তিনি এক স্ট্যাটাসে জানান, ‘মূলত সার্জের কারণে উবারে বেশি ভাড়া আসে, যা যাত্রীদের জন্য মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। গত সপ্তাহ থেকে ঢাকায়ও ম্যানুয়াল ফেয়ার ক্যালকুলেশনের সময় সার্জ ফ্যাক্টরের ব্যবহার শুরু হয়েছে। যখন উবারের গাড়ির চাহিদা বেশি থাকবে তখন উবার ব্যবহার করতে হলে আপনাকে ১০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি টাকা ভাড়া পরিশোধ করতে হবে।’

নাফিস হাসান জানান, ‘বিদেশে যারা উবার ব্যবহার করেছেন তাদের উবারের সার্জের ব্যাপারে অভিজ্ঞতা আছে। সার্জ হচ্ছে কোনো একটি এলাকায় যখন উবারের গাড়ির চাহিদা বেড়ে যায় তখন উবারের ভাড়াও বেড়ে যায়। মনে করেন, বৃষ্টির দিন ১৫ জন রিকশার জন্য অপেক্ষা করছে কিন্তু খালি রিকশা আছে মাত্র পাঁচটি। এ অবস্থায় রিকশাচালকরা নরমাল ভাড়ার দ্বিগুণ ভাড়া দাবি করা শুরু করল, যা পুরোপুরি অন্যায্য। এ অবস্থায় যার কাছে সেই পরিমাণ অর্থ আছে এবং রিকশার প্রয়োজনীয়তা বেশি শুধু তারাই রিকশা ব্যবহার করতে পারবেন। সার্জের ব্যাপারটা কিছুটা এমনই।’

তিনি আরও লিখেছেন, ‘অবশ্য সার্জ চালুর পর আপফ্রন্ট ভাড়ায়ও বেশ খানিকটা বৃদ্ধি লক্ষ করা গেছে। আগে যেখানে আপফ্রন্ট ভাড়া ৩০০ টাকা আসত এখন সেখানে আপফ্রন্ট ভাড়া হয়ে গেছে ৪৫০-৫০০ টাকা।’

যদিও উবারের এ ধরনের ভাড়া বৃদ্ধি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বলে মনে করেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) পরিচালক (অপারেশন) শীতাঙ্গশু শেখর বিশ্বাস। তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, উবার যেহেতু এক ধরনের সেবা, তাই এর কর্তৃপক্ষ ঘোষণা ছাড়া ইচ্ছেমতো ভাড়ার হার বৃদ্ধি  করতে পারে না। এক্ষেত্রে রাইড শেয়ারিং সার্ভিসেস নীতিমালায় স্পষ্ট বিধান রয়েছে। তবে নীতিমালা এখনও অনুমোদন হয়নি। তাই এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।

যদিও উবারসহ অন্যান্য অ্যাপভিত্তিক সেবা নিয়ন্ত্রণে রাইড শেয়ারিং সার্ভিসেস নীতিমালা চূড়ান্ত করতে এক বছরের বেশি সময় নিয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। অনুমোদনের জন্য এটি আগামীকাল মন্ত্রিসভায় উঠার কথা রয়েছে। এতে ভাড়া নিয়ন্ত্রণের পরোক্ষ বিধান যুক্ত করা হয়েছে।

সূত্রমতে, ২০১৬ সালের ২২ নভেম্বর ঢাকায় যাত্রা শুরু করে অ্যাপভিত্তিক ট্যাক্সি সেবা উবার। তবে এ সেবা নিয়ন্ত্রণে এতদিন কোনো নীতিমালা ছিল না। ফলে ভাড়াসহ নানা বিষয়ে উবারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উঠতে থাকে। এজন্য এটি নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে উবারের গাড়িতে ট্যাক্সিক্যাবের চেয়ে বেশি ভাড়া আদায় করা যাবে না।

গত মাসে ‘রাইড শেয়ারিং সার্ভিস নীতিমালা ২০১৭’ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়। সভার চলতি সপ্তাহের বৈঠকে এটি অনুমোদনের কথা রয়েছে। মন্ত্রিসভায় পাঠানো প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, নীতিমালায় মোট ১০টি অনুচ্ছেদ রয়েছে। সেগুলো হচ্ছেÑ প্রস্তাবনা, কর্তৃপক্ষ, রাইড শেয়ারিং সার্ভিস পরিচালনার শর্তাবলি, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের দায়-দায়িত্ব, প্রতিষ্ঠান এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেট প্রদান পদ্ধতি, মোটরযান এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেট প্রদান পদ্ধতি, ভাড়ার হার নির্ধারণ বা পুনর্নির্ধারণ, অন্যান্য বিষয়, আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ ও নীতিমালার সংশোধন-পরিবর্তন বা সংযোজন সম্পর্কিত।

ভাড়ার হার অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাইড শেয়ারিং সার্ভিসের আওতায় চলাচলকৃত ব্যক্তিগত মোটরগাড়ির ভাড়া ‘ট্যাক্সিক্যাব সার্ভিস গাইডলাইন ২০১০’ অনুযায়ী নির্ধারিত ভাড়া অপেক্ষা বেশি হতে পারবে না। তবে কোনো কারণে ভাড়াসংক্রান্ত যাত্রী অসন্তোষ সৃষ্টি হলে সেক্ষেত্রে সরকার ভাড়া নির্ধারণ বা পুনর্নির্ধারণ করতে পারবে। এছাড়া যাত্রা শুরুর আগে সম্ভাব্য ভাড়া সম্পর্কে যাত্রীকে জানানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে।

এদিকে উবারের পাশাপাশি মোটর বাইকভিত্তিক রাইড শেয়ারিং সার্ভিস ‘পাঠাও’ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। যদিও মোটরবাইকের ভাড়ার বিষয়ে নীতিমালায় কিছু বলা হয়নি।