মত-বিশ্লেষণ

যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার আইএনএফ চুক্তি বাতিল ও বিশ্বে অস্ত্র প্রতিযোগিতা

তৌহিদুর রহমান: গত শতাব্দীর শুরুতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং মধ্যভাগে এসে সূত্রপাত হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের। এ সময়টায় যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত রাশিয়া, জার্মানি, জাপানসহ বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর অস্ত্র প্রতিযোগিতার কথা কারও অজানা নয়। তখন কতটা ভয়াবহ অস্ত্র প্রতিযোগিতা চলেছে, তা দুই বিশ্বযুদ্ধের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও জীবনহানি থেকে সহজেই অনুমেয়। অবশ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মূল অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে, যা স্নায়ুযুদ্ধে পরিণত হয়েছিল। নব্বইয়ের দশকে তখনকার সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনে রাশিয়ার সৃষ্টি হলে এ স্নায়ুযুদ্ধ কিছুটা স্তিমিত হয়ে যায়। তবে তা ছিল সাময়িক। আক্ষরিক অর্থে এখনও যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে সেই প্রতিযোগিতা চলছে। যদিও চীনও এখনকার বিশ্বে বড় খেলোয়াড়ে পরিণত হচ্ছে ক্রমেই।
পরবর্তীকালে গত শতাব্দীর শেষ পর্যায়ে এসে অস্ত্র হ্রাসের কয়েকটি চুক্তি করেছে দেশ দুটি। এর মধ্যে ইন্টারমিডিয়েট-রেঞ্জ নিউক্লিয়ার ফোর্সেস (আইএনএফ) ছিল অন্যতম। তবে সম্প্রতি স্নায়ুযুদ্ধের সময় থেকে চলে আসা ওই গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক মিসাইল চুক্তি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বেরিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্ত নতুন করে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার আশঙ্কা তৈরি করেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। ঐতিহাসিক আইএনএফ ট্রিটি নামের ওই চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্র ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতারা স্বাক্ষর করেন ১৯৮৭ সালে। কয়েক বছর ধরে ওয়াশিংটন অভিযোগ করে আসছে, ওই চুক্তির শর্তের বাইরে গিয়ে রাশিয়া ক্রুজ মিসাইল তৈরি করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ওই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। এজন্য তিনি দায় চাপিয়েছেন রাশিয়ার ওপর। এর আগে গত ফেব্রুয়ারি মাসে চুক্তিটি ছয় মাসের জন্য স্থগিত করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। রাশিয়াও এরপর পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং তারাও চুক্তিটি মেনে চলার বাধ্যবাধকতা স্থগিত করে। আইএনএফ ট্রিটি বাতিল হওয়ার ফলে বিশ্বজুড়ে মারণাস্ত্র নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের সংকট তৈরি হওয়া ছাড়াও আরও অনেক বিপজ্জনক অস্ত্র উৎপাদনের শঙ্কা উদ্ভূত হবে বলে অনেকে মনে করছেন। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পারমাণবিক অস্ত্রের মজুত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার হাতে। এর মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমা ফেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তার ভয়াবহতাও কারও অজানা নয়।
গুরুত্বপূর্ণ এই চুক্তিটি বাতিল হলে কীভাবে বিশ্বের জন্য মারণাস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও বিপজ্জনক অস্ত্র উৎপাদনের শঙ্কা তৈরি হবে? চুক্তিটি হলো যুক্তরাষ্ট্র ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের জন্য ১৯৮৭ সালে স্বাক্ষরিত একটি চুক্তি। তখন বিশ্বের দুই পরাশক্তি সম্মত হয়েছিল যে, তারা তাদের পারমাণবিক ক্ষমতাসম্পন্ন সব ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস এবং ৫০০ থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার কিলোমিটার দূরে আঘাত হানার ক্ষমতাসম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্রগুলো স্থায়ীভাবে অকেজো করে ফেলবে। ছোট আকারের, সহজে বহনযোগ্য ও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে সহজে আঘাত হানতে সক্ষম এসব অস্ত্রকে চরম হুমকি হিসেবে দেখা হতো।
সত্তরের দশকের শেষের দিকে পশ্চিম ইউরোপের নানা স্থানকে লক্ষ্যবস্তু করে এসএস-২০ মিসাইল মোতায়েন করে সোভিয়েত ইউনিয়ন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ন্যাটো সামরিক জোটে থাকা অনেক দেশ উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে।
আইএনএফ চুক্তিটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? এর জবাব হলো চুক্তিটির ফলে প্রথমবারের মতো পরাশক্তিগুলো তাদের পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা কমিয়ে আনতে সম্মত হয়। একটি ক্যাটেগরির সব পারমাণবিক অস্ত্র ধ্বংস করা হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আর্মস কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশনকে অস্ত্রের ঘাঁটিগুলো পরিদর্শনের সুযোগ দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৯১ সালের জুন মাসের মধ্যে সব মিলিয়ে দুই হাজার ৬৯২টি স্বল্পমাত্রার, মধ্যমমাত্রার ও আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করে। চুক্তির আওতায় নিষিদ্ধ করা হয়েছিল পাঁচ হাজার ৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত মাত্রার ক্ষেপণাস্ত্র।
যে কারণে নতুন সংকটের সৃষ্টি: ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ তোলে ৯এম৭২৯ নামের নতুন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে রাশিয়া ওই চুক্তির লঙ্ঘন করছে। তখন বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট থাকলেও তিনি চুক্তিটি বাতিল করেননি। ক্ষেপণাস্ত্রটি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর কাছে এসএসসি-এইট নামে পরিচিত। কিছু প্রতিবেদন বলছে, রাশিয়ার কাছে এ ধরনের প্রায় ১০০ মিসাইল রয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে এক সংবাদ সম্মেলনে মাইক পম্পেও বলেন, অনেক বছর ধরে কোনো রকম বিকার ছাড়াই রাশিয়া ইন্টারমিডিয়েট-রেঞ্জ নিউক্লিয়ার ফোর্সেস ট্রিটির শর্তগুলো লঙ্ঘন করছে। স্বাক্ষরকারী পক্ষগুলো মেনে না চলে, তাহলে এমন কোনো চুক্তি স্বাক্ষরের মানে নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
যদিও মস্কো দাবি করেছে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ৫০০ কিলোমিটারের কম যেতে সক্ষম। তাদের যুক্তি, পোল্যান্ড ও রোমানিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের যে প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রগুলো রয়েছে, সেগুলোকে পরিবর্তন করে আক্রমণকারী মিসাইলে রূপান্তর করা সম্ভব, যা হয়তো রাশিয়ার বিপক্ষে ব্যবহার করা হতে পারে। এ বিষয়ে ওয়াশিংটনের বক্তব্য, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি আইএনএফ চুক্তির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে তৈরি করা হয়েছে। এ নিয়ে গত ফেব্রুয়ারিতে আইএনএফ চুক্তি স্থগিত করার প্রতিবাদে বার্লিনে মুখোশ পরে প্রতিবাদ জানান একদল অ্যাক্টিভিস্ট।
এর মাধ্যমে কি তাহলে নতুন পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হচ্ছে? বিবিসির কূটনৈতিক সংবাদদাতা জোনাথন মার্কুইসের মতে, আইএনএফ চুক্তিটি বাতিল হওয়ার মানে হলোÑবিশ্বের অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের পিছিয়ে যাওয়া। অথচ চুক্তিটি একটি বিশেষ ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র নির্মূল করে দিয়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে, ঐতিহাসিক এই চুক্তি বাতিল হয়ে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে নতুন এক অস্ত্র প্রতিযোগিতা দেখা দিতে পারে। এই চুক্তির অবসানের বিষয়টি বিশেষভাবে চিন্তার কারণ হলো নতুনভাবে জেগে ওঠা রাশিয়ার হুমকি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র অব্যাহতভাবে উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। সব মিলিয়ে মস্কো বা ওয়াশিংটন কেউই ওই চুক্তিকে আর গুরুত্ব দিতে চাইছে না বলেই বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
আর্মস কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান থমাস কান্ট্রিম্যান বলছেন, রাশিয়ার শর্ত লঙ্ঘনের জবাবে চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে আসার পরে হয়তো এমন পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে, যা আশির দশকে দেখা গেছে। তখন যুক্তরাষ্ট্র আর সোভিয়েত ইউনিয়ন একে অপরকে জবাব দিতে মিসাইল মোতায়েন করেছে। এখন বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, আইএনএফ চুক্তি অবসানের ফলে আবার পাল্টাপাল্টি অস্ত্র মোতায়েন করতে দেখা যেতে পারে।
নতুন উত্তেজনা শুরুর পর রাশিয়া কী বলছে? যুক্তরাষ্ট্রের ওই ঘোষণার আগে আগে মস্কো পরামর্শ দিয়েছে, চুক্তি থেকে বেরিয়ে গেলেও যুক্তরাষ্ট্র যেন কিছু শর্ত বজায় রাখে। রাশিয়ার তাস বার্তা সংস্থাকে দেশটির উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই রিয়াবকভ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় কোনো অস্ত্র মোতায়েন না করে, তাহলে রাশিয়াও সেরকম আচরণ করা থেকে বিরত থাকবে। এই চুক্তিটি বাতিল করা আরও একটি কারণে উদ্বেগজনক। তা হলো স্টার্ট নামের একটি চুক্তি নবায়নের ডেটলাইন রয়েছে ২০২১ সালে, যা হয়তো সংকটের মধ্যে পড়ে যেতে পারে। ২০১০ সালের ওই চুক্তিতে দূরপাল্লার মিসাইলের সংখ্যা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্র আর রাশিয়া যদি সম্মত হয়, তাহলে নতুন স্টার্ট চুক্তিটি আরও পাঁচ বছরের জন্য হতে পারে। কিন্তু অনেক বিশ্লেষকের আশঙ্কা, বর্তমান উদ্বেগজনক রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিটি ঝুঁকিতে পড়তে পারে। দুই দেশের মধ্যে এরই মধ্যে সম্পর্কের বেশ অবনতি হয়েছে। রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কিছু নিষেধাজ্ঞাও কার্যকর রয়েছে। এছাড়া ক্রমেই পরাশক্তি হয়ে ওঠা চীনের সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক তলানিতে। অথচ রাশিয়ার সঙ্গে চীনের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। ওয়াশিংটন ও মস্কোর এই উত্তেজনায় যুক্তরাষ্ট্র বা রাশিয়ার তুলনায় বেশি প্রভাব পড়তে যাচ্ছে ইউরোপের নিরাপত্তার ওপর। নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা যদি শুরু হয়, তাহলে ইউরোপিয়ানরা প্রাথমিকভাবে রাশিয়ার নতুন অস্ত্রের জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকবে বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের।
গত মাসে ন্যাটোর মহাসচিব জেনারেল জেমস স্টলতেনবার্গ বলেছিলেন, রাশিয়ার মিসাইলগুলো পরমাণু অস্ত্র বহনে সক্ষম, সহজে বহন করা যায় আর শনাক্ত করা কঠিন। কয়েক মিনিটের মধ্যে সেগুলো ইউরোপের শহরগুলোয় আঘাত হানতে সক্ষম। ইউরোপে ভূমি থেকে নিক্ষেপযোগ্য মিসাইল মোতায়েনের কোনো পরিকল্পনা ন্যাটোর নেই। কিন্তু প্রচলিত আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, নতুন কৌশল ও প্রস্তুতি এবং নতুন অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ সার্বিকভাবেই করা হবে।
চীন ও অন্যান্য দেশের জন্য কী বার্তা দেওয়া হবে? অনেকে বলছেন, আইএনএফ চুক্তিটি স্বাক্ষর করার পরবর্তী প্রেক্ষাপটে বিশ্বের পরিস্থিতি অনেক বদলে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, হয়তো ওয়াশিংটন আর মস্কোকে নিয়ে দ্বিপক্ষীয় অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের যুগ শেষ হতে চলেছে। চীন এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া ছাড়াও আরও অন্তত দশটি দেশের আন্তঃমহাদেশীয় পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। এসব দেশ কখনোই অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তিতে পক্ষ হয়নি, ফলে তারা এ-জাতীয় অস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
২০০২ সালে অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক মিসাইল ট্রিটি (এবিএম) থেকে বেরিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র। তখন তারা যুক্তি দিয়েছিল, ইরান বা উত্তর কোরিয়া দূরপাল্লার মিসাইল তৈরি করছে। কয়েক দিন আগে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে তিনবার নতুন ধরনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে উত্তর কোরিয়া। অথচ তাদের পরমাণু অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়েই বেশি কথা হচ্ছে। সব মিলিয়ে নতুন নতুন দেশকে এ ধরনের চুক্তিতে যুক্ত করার সময় এসেছে কি না, সে বিষয়গুলোও ভেবে দেখতে হবে।

বিবিসি অবলম্বনে

সর্বশেষ..