যুদ্ধের প্রথম প্রহরে রণদা

অনাথ শিশুর মতো যার জীবনখানি নিস্তরঙ্গে নিথর হতে পারতো নিযুত জীবনের নিঠুর নিয়তিপাশে তিনি জুগিয়েছেন হৃৎস্পন্দনের খোরাক। দেশের জন্য লড়েছেন। শূন্য জমিনে গড়েছেন ব্যবসায় কাঠামো। জীবনের সব অর্জন লিখে দিয়েছেন মানুষের নামে। তিনিই দেশের সবচেয়ে সফল ট্রাস্টি প্রতিষ্ঠান ‘কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট’-এর জনক রণদা প্রসাদ সাহা। নারীশিক্ষা ও চিকিৎসায় নারী-পুরুষ কিংবা ধনী-গরিবের ভেদ ভেঙেছেন। তার জীবনেই রয়েছে সসীমকে ডিঙিয়ে অসীমে শক্তি সঞ্চারের কথামালা। এ জীবন ও কেতন যেন রোমাঞ্চিত হৃদয়েরই উদ্দীপ্ত প্রেরণা।  পর্ব-২৬

মিজানুর রহমান শেলী: যুদ্ধজীবনের প্রশিক্ষণ পর্বটা উৎসাহ-উদ্দীপনা আর সাহস সঞ্চারের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যায়। এ পর্বে রণদা নিজেকে প্রস্তুত করে তুলেছেন। কিন্তু চ‚ড়ান্ত যুদ্ধের ময়দান সে রকম নয়। এখানে অভিজ্ঞতা, সাহস, উপস্থিত বুদ্ধি আর অবিচলতাও অনিবার্য হয়ে পড়ে। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা রণদার কখনোই ছিল না। এমনকি তার জীবনের অতীত দেখলে বোঝা যায়, তিনি ছিলেন দুরন্ত, বন্ধুসুলভ এবং দলপ্রিয় দামাল ছেলে। দলবেঁধে দুঃসাধ্য সাধন করতে বাধা মানেননি কখনও। কিন্তু মারামারি, কাটাকাটি বা গণ্ডগোল করে বেড়ানোর মতো ছেলে ছিলেন না তিনি। অথচ অল্প দিনের মধ্যেই তিনি যুদ্ধের ময়দানের কর্তব্য-কাজ রপ্ত করে নিলেন। প্রস্তুতিটা ছিল পাকাপাকি। এ প্রস্তুতি পর্বে মুগ্ধ হয়ে ভারতের ভাইসরয় প্রশংসা করে বলেন, মাত্র তিন মাসের প্রশিক্ষণে তোমরা যা করতে পেরেছো এবং আমি যা দেখলাম তাতে আমি খুব  কৌত‚হল ও আনন্দবোধ করছি। এ প্রশংসা সেদিন অ্যাম্বুলেন্স কোরের সবার জন্যই ছিল। কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে শুরু থেকেই রণদার একটু একটু করে বিশেষ অবদান সবার মাঝে মাথা তুলে দাঁড় করিয়ে দেয়। তিনি সবাইকে ছেড়ে অনন্য হয়ে উঠলেন। যুদ্ধের ময়দানের এ প্রথম প্রহরে রণদা সেবা ও সহযোগিতার অসামান্য নজির দেখালেন।

রণদা প্রসাদসহ বেঙ্গল অ্যাম্বুলেন্স কোরের সদস্যরা প্রথম থেকেই যুদ্ধের ময়দানে সেবা দিতে উগগ্র্রীব ছিলেন। তারা অধিনায়ক এ এইচ নটের মাধ্যমে জিওসি মেজর জেনারেল টাউনসেন্ডের কাছে আবেদন করেন: তারা যুদ্ধের ময়দানে অংশ নেবেন। জিওসি আবেদন মঞ্জুর করেন। বেঙ্গল অ্যাম্বুলেন্স কোর তথা বেঙ্গল স্টেশনারি হসপিটালের ৩৭ জন সদস্যকে হাবিলদার এ সি চম্পটির নেতৃত্বে ২ ফিল্ড অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে সংযুক্ত করেন। এ দলে রণদা প্রসাদ সাহা ছিলেন। ২ ফিল্ড অ্যাম্বুলেন্স বাগদাদ দখলের জন্য ১৯১৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর কুট আল আমারার উদ্দেশে রওনা হলো। কুট আল আমারা পর্যন্ত তারা স্টিমারে পৌঁছালেন। এখানে তখন বসরার ষষ্ঠ ডিভিশন কাজ করছিল। তাদের ১৯১৫ সালের অক্টোবরে বাগদাদ অভিমুখে অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এখানে আসার পরে তারা আক্রমণ বাহিনীর সঙ্গে মার্চ শুরু করে। কুট দখল হলো। এরপর ১৯১৫ সালের ৬ অক্টোবর, ২ ফিল্ড অ্যাম্বুলেন্স বাগদাদ অভিমুখে রওনা হয়। এ অভিযানে রণদা প্রসাদ সাহা থাকলেন। তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন কর্নেল জে হেনসি। তারা ৭৫ মাইল হেঁটে ৯ অক্টোবর আজিজিয়া পৌঁছান। এখানে প্রতিদিন জনপ্রতি রান্নার জন্য মাত্র এক পাউন্ড খড়ি বরাদ্দ ছিল। কিন্তু খোলা মরুভ‚মি। সব সময় বয়ে চলে বাতাস। আবার কখনও বা সাইমুম ঝড়। এ বাতাসের কারণে খুব দ্রæত খড়ি পুড়ে যেত। ফলে স্বল্প পরিমাণে বরাদ্দ করা খড়ি দিয়ে রান্না শেষ হতো না। মজার ব্যাপার হলো, অন্যান্য ট্রুপের রান্না অসম্পূর্ণ থাকলেও, বেঙ্গল অ্যাম্বুলেন্স কোরে ঠিকই রান্না সম্পন্ন হতো। এর পেছনে কারণ ছিল ওই রণদা প্রসাদ সাহা। তিনি নিজে অল্প বয়সী কিছু সহযোগী নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন মাঠে। কুড়িয়ে আনতেন কাটা ঝোপঝাড়। ফলে জ্বালানির কোনো অভাবই তাদের ছিল না। কুট থেকে বাগদাদের পথে টেসিফনের কাছে একজন বেঙ্গল অ্যাম্বুলেন্স কোরের সদস্য অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে পেছনে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। বাগদাদের পথে যাত্রাকালে বেঙ্গল অ্যাম্বুলেন্স কোরের সদস্যরা সৈনিকদের সেবা-শুশ্রƒষা দিত। অবস্থা বেশি খারাপ হলে তাদের অ্যাম্বুলেন্স কিংবা হাসপাতালে পৌঁছানোর কাজ করতেন। যা হোক, এ আজিজিয়া ছিল টেসিফোনের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ২৫ বা ৩০ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে। তারা টেসিফোনে মূল বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিলেন।

ব্রিটিশ বাহিনীর বাগদাদে পৌঁছা সম্ভব হচ্ছিল না। কেননা কুট থেকে মাত্র ১০০ মাইল অতিক্রম করার পরে এ টেসিফনেই তাদের থামতে হয়েছিল। নভেম্বরের আগে থেকেই তুর্কিরা ব্রিটিশদের এখানে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ২ নভেম্বর থেকে চ‚ড়ান্ত যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। ধীরে ধীরে বেধে গেল তুমুল লড়াই। এ টেসিফোন থেকে বাগদাদ পৌঁছাতে তাদের আরও ১৫-২০ মাইল অতিক্রম করতে হতো। যা হোক, তারিখটা ২২ ও ২৩ নভেম্বর। ব্রিটিশ সেনারা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। বেঙ্গল অ্যাম্বুলেন্স কোরের সদস্যরাও এ সময় যুদ্ধে অংশ নেন। তখন রণদা তাদের সেবা দিতে থাকেন। রণদা নিজেই বলেছেন, টেসিফনের যুদ্ধে হাবিলদার চম্পটির নেতৃত্বে ফণিভ‚ষণ ঘোষ, শিশির প্রসাদ, সর্বাধিকারীর ভাই ড. এস পি সর্বাধিকারী ও আমি নিজে রিয়ার গার্ডের সঙ্গেই ছিলাম। | [At the battle of ctesiphone Phanihbusan ‡hose, Sisir Prosad Sarbadhikari brother Dr. S.P Sarbadhikari and myself under havildar Champati were With the rear guard.] টেসিফোনের এ যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনী পরাস্ত হলো। রণদার কঠোর পরিশ্রম আর অসাধ্য সাধন করার প্রচেষ্টা টেসিফনের যুদ্ধে লক্ষ করা যায়। তিনি তার উপস্থিত বুদ্ধিও সমভাবে কাজে লাগিয়েছেন। রণদার সহযোদ্ধা হাবিলদার পি. সি সেন এ ব্যাপারে বর্ণনা করেন, ৭৬ পাঞ্জাবির সুবেদার মেজর ছিলেন একজন হাসিখুশি মানুষ। বয়সে জ্যেষ্ঠ। তার পেলভিসে একটি বুলেট লাগে। হাঁটতে পারছিলেন না। প্রাইভেট আর পি সাহা (রণদা প্রসাদ সাহা) তাকে উদ্ধারে গেলেন। নিজের পিঠে চড়িয়ে রণদা তাকে তুলে আনছিলেন। এ সময় রণদা চিৎকার করে বলতে থাকল, ওহ! এ যেন আড়াই মাউন্ড। ছয়েরও বেশি বার তিনি বলেছিলেন। (আড়াই জনমানুষের ওজন হিন্দিতে ধাই বলা হয়)। )| The subedar major of the 76 punjabis was a jolly old man. He had a bullet in his pelvis and could not walk. When private RP Saha went to lift him on his back he shouted for six more like him saying he was 2 mounds and a half (Dhai man)। ঘটনাটি বর্ণনা করেন শিশির প্রধান সর্বাধিকারী তার ‘অভি লে বাগদাদী’ বইতে। ঘটনাটি ১৯১৫ সালের ২৪ নভেম্বর ঘটেছিল বলে তিনি বর্ণনা করেন। সামরিক বিশেষজ্ঞ মুহাম্মদ লুৎফুল হক এটাকে হিউমার অব ইউনিফর্মের (মিলিটারিদের হাস্যরস) জীবন্ত উদাহরণ বলেছেন।

যা হোক, এ ২৪ নভেম্বরেই তুর্কিরা টেসিফোন দখল করে নেন। ব্রিটিশ বাহিনীর পরাজিত হয়ে কুটে ফিরে আসতে হলো। ষষ্ঠ ডিভিশনের জিওসি চার্লস টাউনসেন্ড তার দলবল নিয়ে ২৫ নভেম্বর থেকেই কুটের পথে ফিরলেন। ফেরত আসার সময় ছয়জন বেঙ্গল অ্যাম্বুলেন্স কোরের অসুস্থ সদস্য বন্দি হলো তুর্কিদের হাতে। আবার কুটে ফেরত আসার পথে ধকল সহ্য করতে না পেরে বেঙ্গল অ্যাম্বুলেন্স কোরের ১২ সদস্য কুটে এসে অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাদের কুট থেকে পেছনে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। বেঙ্গল অ্যাম্বুলেন্স কোরের বাকি ১৮ জন সদস্য ২ ফিল্ড অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের জন্য কুটে থেকে যান। রণদা প্রসাদ সাহাও থাকলেন। ব্রিটিশ বাহিনী কুটে ফিরে আসে ৩ ডিসেম্বর। এ সময় তুর্কি বাহিনী টাউনশেন্ডকে ধাওয়া করে কুটেই তাদের অবরুদ্ধ করে রাখে। তখন ব্রিটিশ অ্যাম্বুলেন্স কোরের সদস্যরা বিভিন্ন হাসপাতালে যেমন ব্রিটিশ জেনারেল হসপিটাল, ইন্ডিয়ান জেনারেল হসপিটাল ইত্যাদি স্থাপনায় ভাগ হয়ে যায়। রণদা ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতে ইন্ডিয়ান জেনারেল হসপিটালে যোগ দেন।

যুদ্ধের ময়দান থেকে দূরে কেবল হাসপাতালের মধ্যে থেকেই বাঙালি যুবারা যে নিজেদের সক্ষমতা উপস্থাপন করতে পারবেন না, তা তারা বুঝে নিয়েছিলেন। তাই তারা সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে কাজ করার আবেদন করলেন। এমনকি খুব স্বাভাবিকভাবে তারা যুদ্ধের ময়দানে নিজেদের যোগ্যতা মেলে ধরতে সক্ষম হলেন। যুদ্ধের তীব্রতা যত বাড়ল, কাজের নৈপুণ্য প্রদর্শনের সুযোগও তাদের বেড়ে গেল। একই সঙ্গে ব্রিটিশ বাহিনীও যুদ্ধেও সংকটময় পরিবেশে যতই আটকে পড়ছিল ততই বেশি সহযোগিতা আশা করছিলেন। অন্যদিকে বেঙ্গল অ্যাম্বুলেন্স কোরের কাছ থেকে তারা অনাকাক্সিক্ষত সহযোগিতা পাচ্ছিলেন। এই মুহূর্তগুলোয় তারা ম্যাকুলাইয়ের যোদ্ধা জাতি আর অযোদ্ধা জাতির তত্ত¡ ভুলে যেতেও বাধ্য হলেন। বাঙালি যুবারা ধীরে ধীরে প্রমাণ করতে সক্ষম হলেন, বাঙালি অযোদ্ধা নয় বরং যোদ্ধা জাতি।

 

গবেষক, শেয়ার বিজ

mshelleyjuÑgmail.com