যেভাবে বেঁচে আছেন জহুরুল ইসলাম

ঢাকার পতিত নগর পরিসরে সহসা রাজধানী জেগে ওঠায় আবাসন ও নির্মাণ খাত হয়ে উঠেছিল অনিবার্য। সেই বাতাবরণে জহুরুল ইসলামের সৃজনী পদক্ষেপ ছিল তুরুপের তাস। ক্ষুদ্র ঠিকাদারি দিয়ে শুরু। দেশের সীমানা মাড়িয়ে বিদেশ-বিভুঁইয়ে তিনি গড়েছেন আকাশচুম্বী অট্টালিকা, সড়ক-মহাসড়ক, কল-কারখানা; এমনকি দেশের আঙিনায় বুলন্দ করেছেন বিদেশি বড়-প্রসিদ্ধ বাণিজ্যিক ও শৌখিন গাড়ির সমৃদ্ধি। রাজধানী ঢাকার নির্মাণ, আবাসন ও বিস্তৃতির বিবর্তনিক ইতিহাসের ধারাক্রমে জহুরুল ইসলাম তাই এক অবিচ্ছেদ্য প্রাসঙ্গিকতা। পর্ব-৪৭

মিজানুর রহমান শেলী: মৃত্যুর পরে অনেক কীর্তিধর ব্যক্তির রেখে যাওয়া স্মৃতি বিস্মৃত হয়। পরবর্তী প্রজন্ম সেটা ধরে রাখতে পারে না। এটা একজন শ্রেষ্ঠ মানুষের মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক। অনেক ব্যবসায়ী তার ধন-সম্পদ, মিল-কারখানা গড়ে তুলেছেন। কিন্তু ভালো উত্তরসূরি গড়ে তুলতে পারেনি। ফলে তার সবকিছু সেখানেই শেষ হয়েছে। বেদখল কিংবা অপব্যবহারে তা নিঃশেষ হয়ে গেছে। এরকম অনেক রাজনীতিককে দেখা যায়, যারা তাদের গড়ে তোলা বিশাল সাম্রাজ্য ভালো কোনো উত্তর-পুরুষের কাছে রেখে যেতে পারেননি। পরিসমাপ্তি ঘটেছে সেসব শান-শওকত আর শৌর্য-বীর্যের। জহুরুল ইসলাম এ কাজটি খুব সুচারুভাবেই করেছেন। কার্যত সবাইকে নিয়ে ভালো কোনো উদ্দেশ্যে যে মহতজন ব্যক্তি সমাজের উন্নয়ন করতে চান, তার কীর্তি কখনও শেষ হয় না। জহুরুল ইসলাম তার সেবামূলক ব্যবসায় উদ্যোগ শুরু করেছিলেন এবং যখন মোটামুটি সফলতা পাওয়া শুরু করেন, তখনই তার ব্যবসায় উদ্যোগের সঙ্গে নিজ পরিবারকে জড়িয়ে নেন। ফলে তার নিজস্ব ব্যবসায় পরিবারের অন্য সদস্যরাও সম্পৃক্ত হতে পেরে নিজেদের গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। ধীরে ধীরে নিজেরাও এই বিশাল ব্যবসায় সাম্রাজ্যের ওপর দাঁড়িয়ে আরও বিস্তৃত পরিসরে জহুরুল ইসলামের কাজকে বুলন্দ করেছেন মানুষ-সমাজের কাছে। নিজ পরিবারের যত বেশি ব্যক্তিজন এ ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছে, ব্যবসা ততো পরিধি বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। আর তাতে করে ততো বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। এ ব্যাপারে নাভানার চেয়ারম্যান শফিউল ইসলাম বলেন, বৈশ্বিক অর্থনীতির দিকে তাকালে দেখা যায় একটি বড় দাগে প্রবৃদ্ধি ঘটে গেছে। আমরা এই পরিপ্রেক্ষিতে নিজেদের মানিয়ে নিতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এর কারণ, ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে যাবে। সে জন্য আমরা আরও শক্তিশালী লগ্নি করতে চাই। আর এসব কিছুর পেছনের উদ্দেশ্য হলো সমাজকে কিছু দিতে পারা। আমরা আমাদের মূল ব্যবসা লালন করছি ব্যবস্থাপনা দক্ষতা এবং বাণিজ্যিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রেখে।
জহুরুল ইসলামের মৃত্যুর পরে এই বিশাল ব্যবসায় সাম্রাজ্য তিন ভাগে ভাগ হয়ে যায়। নিজের ভাইয়েরা ও পুত্র এই তিনটি অংশকে আরও সামনে এগিয়ে নিতে ইতোমধ্যে সক্ষম হয়েছেন। তারা সবাই জহুরুল ইসলামের দেখানো, শেখানো ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায় সাম্রাজ্যকে এখনও নিজেদের মধ্যে লালন করে এবং কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেন। এমনকি প্রতিটি পদক্ষেপে জহুরুল ইসলামের রেখে যাওয়া ব্যবসায় ঐতিহ্যকেই অনুসরণ করেন। শফিউল ইসলাম বলেন, আমাদের এ ব্যবসায় রয়েছে গভীরে গ্রথিত শেকড়। এমনকি প্রাসঙ্গিক সব ধরনের অভিজ্ঞতা হলো আমাদের সম্পদ। কার্যত জহুরুল ইসলামের মতো সবারই দেশ ও সমাজের সেবামূলক ব্যবসায় চিন্তন লালন করার অভ্যাস সবার মাঝে এখনও স্পষ্ট। শফিউল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের মতো একটি দেশ, যার রয়েছে ডিজিটালি সমৃদ্ধ হওয়ার লক্ষ্য। অথচ এর অর্থনৈতিক অবস্থা অস্থিতিশীল। আবার সেকেলে অর্থনৈতিক ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। এসবের মধ্যেও নাভানা এগিয়ে চলেছে দ্রুতগতিতে। আমাদের উদ্দেশ্য, প্রতিটি শিল্পের ক্ষুরধার প্রান্তে অবস্থান করা। আমরা আমাদের প্রতিটি স্টেকহোল্ডার, সংশ্লিষ্ট কমিউনিটিকে সর্বোচ্চ ভালো মানের সেবা দিতে বদ্ধপরিকর।
২০ শতক থেকে শুরু আফতাব গ্রুপ ইতোমধ্যে একটি নামকরা ব্র্যান্ডে পরিণত হতে পেরেছে। ১৯৬১ সাল থেকে শুরু হওয়া ব্যবসায় ঐতিহ্যকেই তারা তাদের পরিচয় পর্বে উল্লেখ করে গর্বিত হন। এমনকি স্বাচ্ছন্দ্য লাভ করেন। এই অনুভূতির পেছনে রয়েছে জহুরুল ইসলামের অমরত্ব। জহুরুল ইসলামের পথ ধরে আফতাব গ্রুপ তাদের ব্যবসায় পরিসরকে আরও বিস্তর করেছেন। ফলে তাদের ব্যবসায় ইতিহাসে একটি বড় সমৃদ্ধ এসেছে। ব্যবসায় পরিসরের এই বিস্তৃত পরিপ্রেক্ষিতে রয়েছে সবখানেই সফলতা। এটা আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কাঠামোকে সমৃদ্ধ করেছে। আফতাব গ্লোবাল টেক্সটাইল লি., মিলনার্স পাম্প লি., সি ট্রেড ফার্টিলাইজার লি., আফতাব ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যালস লি., আফতাব হোল্ডিংস লি., আফতাব প্রোপার্টিজ লি., আফতাব গ্লোবাল ফাউন্ডেশন লি. ও এজি নামে কোম্পানিগুলো বিভিন্ন আঞ্চলিক ব্যবসায় পরিপ্রেক্ষিতের সঙ্গে নিজেদের ছড়িয়ে দিয়েছেন। আবার আলিব গ্রুপ নামে আন্তর্জাতিক বড় ব্যবসায় পরিচিতি ও পরিকাঠামো নির্মাণে সক্ষম হয়েছে। আবার উত্তরা ব্যাংকে রয়েছে এদের বড় শেয়ার। দেশ ও বিদেশের বাজার অর্থনীতিতেও রয়েছে এদের ভালো অবস্থান। এই গ্রুপের প্রতিটি কোম্পানির রয়েছে আলাদা ব্যবস্থাপনা কাঠামো। গ্রুপটি বৈশ্বিক বাজার ব্যবস্থার প্রতিযোগিতাকে অনুসরণ করে আসছে।
এই গ্রুপে প্রায় ৫০০ কর্মকর্তা ও ২০০০ কর্মচারী রয়েছেন। চেয়ারম্যান হিসেবে আজহারুল ইসলাম এবং ভাইস চেয়ারম্যান ও এমডি পদে ইফতেখারুল ইসলাম দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
বিভিন্ন বাজার ব্যবস্থায় কাজ করছে নাভানা গ্রুপ। তারা বিস্তারধর্মী বৈশিষ্ট্য ধারণ করে জহুরুল ইসলামের দেখানো পথে নিজস্ব স্বকীয়তা একটি টেকসই ব্যবসায় কাঠামো দাঁড় করাতে চায়। এর ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের বেড়ে ওঠা সমাজ ব্যবস্থার চাহিদা পূরণ করাই এদের উদ্দেশ্য। ব্যবসায় নীতিবোধ, উন্নত ও কল্যাণকর আচার ব্যবহার ও দৃষ্টিভঙ্গি হলো এদের আন্তর্জাতিক শক্তি।
জনসাধারণের জীবনমানের সমৃদ্ধি ও নিশ্চয়তা আনয়নের প্রচেষ্টা নিয়েই কাজ করে যাচ্ছে বলে তারা জোর দাবি করে আসছে। এ জন্য তারা দায়িত্ববোধ সম্পন্ন জ্ঞান-অভিজ্ঞতাকে, দক্ষতা ও প্রযুক্তি কাজে লাগায়। পণ্য আর সেবার অভিজ্ঞতাই এখানে মুখ্য। বাজার ব্যবস্থায় তারা সম্ভাবনা নির্মাণ করা তাদের লক্ষ্য।
এই সাহসী বক্তব্যের পেছনে হলো তাদের ব্যবসায় ইতিহাস। জহুরুল ইসলাম নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন, তার ইসলাম গ্রুপকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। এরপর তার রেখে যাওয়া ব্যবসায় কাঠামো আজ দেশ ও সমাজের দায়িত্ববোধে উজ্জীবিত ব্যবসায় কাঠামোর নির্মাণের সাহসী ও স্পর্ধিত ভবিষ্যতের কথা বলতে পারে নির্দ্বিধায়।
তারা আজ ১৫টি ব্যবসায় খাতে কাজ করে যাচ্ছে। এগুলো হলো অটোমোবাইল, শিল্প উপকরণ, ব্যাটারি, রিয়েল স্টেট, নির্মাণ, মেডিক্যাল সরঞ্জাম, পেট্রোলিয়াম পণ্য, আন্তর্জাতিক মালবাহন, তেল ও গ্যাস, প্লাস্টিক, রিনিউঅ্যাবল এনার্জি, সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রটেকশন, ইলেট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিকস, ফার্নিচার ও খাদ্য। এসব খাতে তাদের কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে টয়োটা ভেহিকলস, টয়োটা আফটার সেলস সার্ভিস, হিনো কমার্শিয়াল ভেহিকলস, আফতাব অটোমোবাইলস লি. অ্যাসেম্বলি ইউনিট, নাভানা লিমিটেড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকুইপমেন্ট, হিনো কমার্শিয়াল ভেহিকল সার্ভিস সেন্টার, নাভানা রিয়েল এস্টেট লি., নাভানা কনস্ট্রাকশন লি., আফতাব অটোমোবাইলস লি., ইন্টারলিংকস জেনারেটর ইউনিট, ইন্টারলিংক বিল্ডিং সলিউশন ইউনিট, নাভানা ইলেকট্রনিক্স, নাভানা ফার্নিচার, নাভান ব্যাটারি, নাভানা সিএনজি, নাভানা লজিস্টিক লি., নাভানা পেট্রোলিয়াম লি., নাভানা রিনিউঅ্যাবল এনার্জি লি., নাভানা বিল্ডিং প্রডাক্টস লি., নাভানা ইঞ্জিনিয়ারিংস লি., নাভানা ওয়েল্ডিং ইলেকট্রোড, নাভান এলপিজি, নাভানা ফুডস, আফতাব অটোমোবাইলস লি., মাহিন্দ্র টু হুইলস, বিপণন লি., নাভানা ডিজিটাল ইকুইপমেন্ট লি. ও ল্যা টার্টে।
এদিকে পুত্র মঞ্জুরুল ইসলাম ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের চেয়ালম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ইসলাম গ্রুপের কর্ণধর হিসেবে তিনি আফতাব বহুমুখী ফার্মস লিমিটেডের চেয়ারম্যান। একাধারে তিনি আফতাব ফিডস প্রা. লি., আফতাব হ্যাচারি লি., বিডিসি, ইসলাম ব্রাদার্স প্রপার্টিজ লি., জহুরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ, নাভানা হেলথ কেয়ার লি. এবং নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের চেয়ারম্যান। তাছাড়া তিনি লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট লিমিটেডের বোর্ড অব ডিরেক্টরসের পদাধিকারী। একসময় আইএফআইসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন।
এভাবেই জহুরুল ইসলাম তার মৃত্যুর পরেও ভাই ও পুত্রের ব্যবসায় কর্মযজ্ঞের ভেতর বেঁচে আছেন। বেঁচে আছেন এই বিশাল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিপুল মানুষের হৃদয়ে। দেশ, মানুষ ও সমাজের উন্নয়নের একটি সৃজনশীল পুরুষ হিসেবে তিনি বেঁচে আছেন। বেঁচে আছেন পরবর্তী ব্যবসায় শিক্ষার্থী ও ব্যবসায় উদ্যোক্তাদের শিক্ষণীয় মডেল হিসেবে।

লেখক: গবেষক, শেয়ার বিজ