রড সিমেন্টের দাম এবং অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক

রিয়াজুল হক: আবদুল মজিদ (ছদ্মনাম) একজন অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক। সারা জীবনের ইচ্ছা চাকরিকালীন স্বল্প সঞ্চয়, অবসর ভাতা, কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা দিয়ে নিজের জমিতে একতলা একটি বাড়ি করবেন। সেই অনুযায়ী প্ল্যান পাস করিয়ে কন্ট্রাক্টরের সঙ্গে আলোচনাও করে রেখেছিলেন। ছাত্র সিভিল ইঞ্জিনিয়ার থাকায় তার কাছ থেকে খরচের একটা ধারণা নিয়ে রেখেছিলেন ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসের দিকে। তবে ২০১৮ সালে ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে কাজ শুরু করতে যাওয়ার আগেই স্যারের মাথায় হাত। নির্মাণসামগ্রীর কোনো কিছুর বর্তমান মূল্যের সঙ্গেই তার আগের বাজেটের মিল হচ্ছে না। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের মতে, রড লাগবে ১০ টন এবং খরচ পড়বে টনপ্রতি ৫০ হাজার টাকা। সেই হিসাবে রডের মোট খরচ লাগার কথা পাঁচ লাখ টাকা। কিন্তু এখন বাজারে গিয়ে জানতে পারলেন রডের দাম টনপ্রতি ৭৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ ১০ টন রডের দাম পড়বে সাত লাখ ৫০ হাজার টাকা। শুধু রডের জন্য অতিরিক্ত দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা বেশি লাগবে। সিমেন্টের দাম তার বাজেট অনুযায়ী ছিল ৩৫০ টাকা এবং তার প্রয়োজন ছিল ৭০০ ব্যাগ সিমেন্ট। সেখানে বর্তমানে বাজারদর ব্যাগপ্রতি ৪৫০ টাকা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সিমেন্টের ব্যাগের মূল্য তার চেয়েও বেশি। অর্থাৎ সিমেন্ট কিনতে আগের বাজেট থেকে ৭০ হাজার টাকা বেশি লাগবে। নির্মাণসামগ্রীর দাম বেশি হওয়ায় কন্ট্রাক্টরও স্কয়ার ফিট প্রতি রেট বাড়িয়ে দিয়েছেন। মজিদ স্যার হিসাব করে দেখলেন, একতলা একটি বাড়ি করতে তার আগের বাজেটের চেয়ে ছয় থেকে সাত লাখ টাকা বেশি লাগবে। টাকার আর কোনো সংস্থান না থাকায় বাড়ির কাজ শুরু করাই সম্ভব হয়নি। স্বপ্নের বাড়ি আদৌ তৈরি করা হবে কি না, মজিদ স্যারের জানা নেই।

মজিদ স্যারের মতো অনেকেই আছেন যারা মূল্য বৃদ্ধির কারণে বাড়ি তৈরির কাজে হাত দিতে পারেননি। আবার অনেকেই কাজ শুরু করে মাঝপথে আটকে রয়েছেন। স্বল্প আয়ের সাধারণ মানুষ যদি বাড়ির কাজ শুরু করে কাজ শেষ করতে না পারে এবং টাকার জন্য কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়, তবে সেটা অবশ্যই হতাশাজনক। রড, সিমেন্টের মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব শুধু যে ব্যক্তিগত বাড়ি, ঘর তৈরির ওপর প্রভাব ফেলবে, বিষয়টি কিন্তু তা নয়। অর্থবছরের শেষার্ধ্বে (জানুয়ারি-জুন) বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয়। এ সময়ে নির্মাণসামগ্রীর ব্যয় বেড়ে গেলে সরকারি উন্নয়নকাজ বাধাগ্রস্ত হবে। খরচের পরিমাণও অনেক বেড়ে যাবে।

রড সিমেন্টের ব্যবসায়ীরা মূল্য বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণ দেখাচ্ছেন, যেগুলো হচ্ছেÑ১. ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্যমান হ্রাস পেয়েছে। ২. রডের মূল কাঁচামাল স্ক্র্যাপ লোহার আমদানি মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। ৩. সিমেন্টের মূল কাঁচামাল ক্লিংকারের আমদানি খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। ৪. পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। ৫. চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসে দেরি হওয়ায় জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব কারণে মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে প্রতি টন রডের দাম বেড়েছে ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা। অন্যদিকে প্রতি বস্তা সিমেন্টে বেড়েছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা। কয়েক মাস আগে ৫০ কেজি সিমেন্ট পাওয়া যেত ৩৫০ টাকায়, এখন সেই একই পরিমাণ সিমেন্টের মূল্য গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৪৪০-৪৫০ টাকার ওপরে। সব কারণ মিলিয়ে রড-সিমেন্টের মূল্য আদৌ এত টাকা মূল্য বৃদ্ধি পাবে কিনা, সেটা অবশ্যই বিবেচনা করা উচিত। রিহ্যাবের মতে, মিল মালিকদের বিভিন্ন দাবি অনুযায়ী টনপ্রতি রডের দাম বাড়তে পারে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা এবং সিমেন্টের দাম বাড়তে পারে ব্যাগপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা। হঠাৎ করে নির্মাণসামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক আবাসন ব্যবসায়ী নির্মাণকাজ সাময়িক বন্ধ করে দিতে চাইছেন। ফলে নির্দিষ্ট সময়ে ফ্ল্যাট হস্তান্তর অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে। দুর্ভোগে পড়বেন ক্রেতারা। বড় ক্ষতির মুখে পড়বে আবাসন খাত।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কনস্ট্রাকশন ইন্ডাস্ট্রির (বাসি) তথ্য মতে, দেশের জিডিপিতে নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের অবদান প্রায় ৯ শতাংশ। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে অব্যাহত শিল্পসংশ্লিষ্ট সামগ্রীর দাম বেড়েছে। এতে সারা দেশের নির্মাণকাজ ধীরগতিতে সম্পন্ন হচ্ছে, এমনকি বন্ধ হয়েও গেছে। এতে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি ব্যাহত হচ্ছে; যা জিডিপিতে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। দেশের রড প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এককভাবে কোনো নিয়মনীতি না মেনে মূল্য বৃদ্ধি করে চলেছে। যদিও কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি, ডলারের দাম বৃদ্ধি, ব্যাংকের সুদের হার বৃদ্ধি এবং চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাস বিলম্বের কারণগুলোকে মূল্য বৃদ্ধির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, তবে বাস্তবে এগুলো সঠিক নয়। কারণ প্রকৃতপক্ষে এসব কারণে সর্বোচ্চ সাত থেকে আট শতাংশ রডের মূল্য বৃদ্ধি পেতে পারে, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই ৫০ শতাংশ নয়। এছাড়া তথ্য মতে, যারা নিজেরা বাড়ি নির্মাণ করেন তারাই সিমেন্টের সবচেয়ে বড় গ্রাহক। প্রায় ৬০ শতাংশ সিমেন্ট যায় এই খাতে। ফলে দাম বাড়ার কারণে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছে সাধারণ মানুষ।

দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য মূল্যের স্থিতিশীলতা অত্যন্ত কাম্য। স্বল্প আয়ের মানুষের স্বপ্ন থাকে শেষ জীবনে একটি বাড়ি করবে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় জমা করে তারা কিছু করার চেষ্টা করে। আবদুল মজিদ স্যার স্বপ্ন দেখতেন অবসরকালীন সময়ে নিজের বাড়ির বারান্দায় খবরের কাগজ পড়বেন। কিন্তু বর্তমান নির্মাণসামগ্রীর বাজার পরিস্থিতি সেই স্বপ্ন পূরণে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে যদি মূল্য বৃদ্ধি করা হয়ে থাকে, তবে তা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। ইতোমধ্যে রডের দাম কেন অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে, সেজন্য রড ব্যবসায়ীদের কাছে লিখিতভাবে জানতে চেয়েছে এফবিসিসিআই। বাণিজ্যমন্ত্রীও কৃত্রিম সংকট যেন তৈরি না হয়, সে বিষয়ে নজরদারির কথা বলেছেন। এগুলো অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। সবাই সোচ্চার রড-সিমেন্টের মূল্য বৃদ্ধির বিষয়ে। সাধারণ মানুষ আশা করছে, খুব দ্রুত নির্মাণসামগ্রীর মূল্য সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসবে। সাধারণ মানুষ তাদের নির্মাণকাজ স্বস্তিতে শুরু করে শেষ করতে পারবে। আর মজিদ স্যারের মতো মানুষরা তাদের স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে যাবে।

 

উপপরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

[email protected]