ধারাবাহিক

রফতানিতে ভারত

ঢাকার পতিত নগর পরিসরে সহসা রাজধানী জেগে ওঠায় আবাসন ও নির্মাণ খাত হয়ে উঠেছিল অনিবার্য। সেই বাতাবরণে জহুরুল ইসলামের সৃজনী পদক্ষেপ ছিল তুরুপের তাস। ক্ষুদ্র ঠিকাদারি দিয়ে শুরু। দেশের সীমানা মাড়িয়ে বিদেশ-বিভুঁইয়ে তিনি গড়েছেন আকাশচুম্বী অট্টালিকা, সড়ক-মহাসড়ক, কল-কারখানা; এমনকি দেশের আঙিনায় বুলন্দ করেছেন বিদেশি বড়-প্রসিদ্ধ বাণিজ্যিক ও শৌখিন গাড়ির সমৃদ্ধি। রাজধানী ঢাকার নির্মাণ, আবাসন ও বিস্তৃতির বিবর্তনিক ইতিহাসের ধারাক্রমে জহুরুল ইসলাম তাই এক অবিচ্ছেদ্য প্রাসঙ্গিকতা। পর্ব-৬

মিজানুর রহমান শেলী: নেপোলিয়নীয় যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত কটন পণ্য ছিল ভারতের প্রধান রফতানি পণ্য। ১৭৯৮ সালে এই হার সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠেছিল। ১৮১৩ সালেও দেশটি এই খাতে ২ মিলিয়ন পাউন্ড আয় করত। কিন্তু তারপর, অতিশিগগিরই তাদের পতন হলো। ৩০ বছর পর ম্যানচেস্টার থেকে ভারতে আমদানি পণ্যের অর্ধেকাংশ ছিল কটন টেক্সটাইল।

রফতানি খাতে ভারতের ধস নামার প্রধান কারণ ছিল কোম্পানি। তারা রুপি রেভিন্যিউকে ব্রিটেনের মুদ্রায় স্থলাভিষিক্ত করে। এরপর কোম্পানি বিশাল পরিসরে কাঁচামাল ভারত থেকে রফতানি শুরু করে। এর মধ্যে ছিল চিনি, রেশম, সোরা, নীল। তাছাড়া তারা চাইনিজ চায়ের বিপরীতে আফিম রফতানি ব্যাপকভাবে  বাড়িয়ে দেয়। ১৮৪২ সালের অ্যাংলো-চাইনিজ যুদ্ধের পর মাদক উৎপাদন প্রচেষ্টা উৎসাহিত হয়। এরপর চীনের বাজারে প্রবেশটাও ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়। উনিশ শতকের মাঝের দিকে ভারতের প্রধান রফতানি পণ্য ছিল আফিম। এই অবস্থাটি অষ্টাদশ শতাব্দীর আশির দশক পর্যন্ত চলমান ছিল। তারপর এর গুরুত্বটি আস্তে আস্তে স্তিমিত হতে থাকে। এরপর নতুন রফতানি কাঁচামালের অবস্থানে ছিল কটন। তবে ইউরোপীয় বাজার প্রতিযোগিতায় তা পিছিয়ে থাকে যেহেতু আমেরিকান ও মিসরীয় কটনের মান ছিল অনেক ভালো। তবে বাজারের এই অবস্থা ইউএস সিভিল যুদ্ধের সময় ভিন্নরূপ লাভ করে। কিন্তু ভারতীয় কটন জাপান ও চীনের বাজার ধরতে সক্ষম হয়। ১৮৩৩ সালের পর চিনি রফতানি শুরু হয়। কিন্তু ভারত তুলনামূলক হারে দীর্ঘ মেয়াদে চিনি রফতানিতে সুবিধা করে উঠতে পারেনি। নীল ১৮৯০ সালের আগ পর্যন্ত একটি ভালো রফতানি পণ্য ছিল। ১৮৯০ এর পর জার্মানির সিনথেটিক ডায়েস’র সঙ্গে ভারতের নীল আর টিকে থাকতে পারল না। পাট কারখানা ক্রিমিন যুদ্ধের পর থেকে পরবর্তী সময়ে ব্যাপকভাবে সমৃদ্ধ হতে থাকে। ফলে এ সময় রাশিয়া থেকে শন আমদানি বন্ধ করে দেয় ব্রিটেন। উপরন্তু, কাঁচা পাট ডান্ডির কারখানায় পাঠানো হতো। ভারত থেকে তখন পাটশ্রমিকও বাইরে পাঠানো হতো। রবিশস্যও তখন ব্যাপকভাবে রফতানি হতো। বিশেষ করে পাঞ্জাবের সদ্য সেচ প্রকল্পের আওতাধীন এলাকায় এ শস্য উৎপাদন হতো। চীন হতে ভারতে প্রথম চা কল পরিচিতি পায়। এই চা কারখানা উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়। চা রফতানি ১৮৬০ সালের পর থেকে গুরুত্ববাহী হয়ে ওঠে। চামড়া (ঐরফবং) ও চামড়া (ংশরহং) এবং তেলের পিঠাও (প্রাণিজ খাদ্য ও সার হিসেবে ব্যবহার হয়) ছিল কিছু গুরুত্বপূর্ণ রফতানি কাঁচামাল।

১৮৫০ থেকে ১৯৫০: এই ১০০ বছরে দেখা যায়, এশিয়ার আটটি দেশ থেকে পণ্য রফতানি হয়েছে। এগুলো হলো শ্রীলঙ্কা, চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, মালয়, ফিলিপাইনস ও থাইল্যান্ড। এসব দেশের মধ্যে ১৮৫০ সালে ৮৯ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি হয়; যা এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ছিল ইন্দোনেশিয়া ও চীন। উভয় দেশ ২৪ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করে। ১৯১৩ সালেও ভারত সর্বোচ্চ অবস্থানে থেকে ৭৮৬ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করে। আর দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল জাপান ৩৫৪ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করে। ১৯৩৭ সালে জাপান ১ হাজার ২০৭ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি কওে প্রথম স্থান দখল করে। আর ভারতকে দ্বিতীয় অবস্থানে ঠাঁই হয় ৭১৭ মিলিয়ন ডলারের কোঠায়। সবশেষ ১৯৫০ সালে মালয় ১ হাজার ৩১২ মিলিয়ন ডলার রফতানি করে সর্বোচ্চ স্থানে উন্নীত হয়, সেখানে ভারতের ১ হাজার ১৭৮ মিলিয়ন ডলার। আর জাপান ও চীন যথাক্রমে ৮২০ ও ৭০০ মিলিয়ন ডলার।

অষ্টাদশ শতকে পঞ্চাশের দশক থেকে তৈরি পোশাক রফতানি শুরু হয়। আর এ সময়ই প্রথম আধুনিক কারখানা এ দেশে গড়ে ওঠে। যা হোক, নব্বইয়ের দশক থেকেই জাপানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় হিমশিম খাচ্ছিল ভারত। এ সময় ভারত থেকে জাপানে সুতা রফতানির পরিমাণ ৮ হাজার ৪০০ টন থেকে ধীরে ধীরে নিচে নামতে থাকে এবং ১৮৯০ সালে এই রফতানি একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। তাছাড়া ভারত জাপানের সঙ্গেও প্রতিযোগিতায় অনেক ভোগান্তির শিকার হয়েছে। ১৮৯৪-১৮৯৫ সালের সিনো-জাপানিজ যুদ্ধের পর চীনে কিছু মিল কারখানা গড়ে তোলে জাপান। এর আগে ভারত চীনের সুতার চাহিদার ৯৬ শতাংশ পূরণ করত; আর ব্রিটেন থেকে চার শতাংশ কিন্তু জাপান থেকে কোনো সুতা চীনে রফতানি হতো না। এর পরে, তিন বছরের মধ্যে চীনের চাহিদার ২৫ শতাংশ পূরণ করতে থাকল জাপান। ফলে ১৯১৪ সালের মধ্যে চীনে সুতা রফতানিতে জাপান থেকে পিছিয়ে পড়ল ভারত।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় চীনের বাজার দখলে জাপান আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। ১৯২৪ সালের মধ্যে দেশটি চীনের মোট চাহিদার তিন শতাংশ পূরণ করতে সক্ষম হলো। ১৯২৮ সালে ভারত থেকে চীনের চাহিদার মাত্র তিন শতাংশ রফতানি হতো।

দুর্ভাগ্যক্রমে, ১৯৩০ সালের মধ্যে ভারত থেকে চীন ও জাপানে শিট কাপড়ের চালান পুরোই বন্ধ হয়ে গেল এবং তখন চীন ও জাপান উল্টো ভারতেই শিট কাপড় রফতানি করতে থাকল।

ভারতীয় রফতানি বাণিজ্য সাবলীল ধারায় দ্রুত এগিয়ে চলেছিল ১৯১৩ সাল অবধি। কিন্তু তাদের অগ্রগতি তারপর থেকে অন্য সব এশীয় দেশ অপেক্ষা মন্থর হতে থাকে। ১৯১৩ সালের আগে ভারত একটি মাথাপিছু ক্ষুদ্র বাণিজ্যিক দেশে উন্নীত হয়, এশিয়ার মধ্যে এ দিক দিয়ে চীন এগিয়ে ছিল। ইতোমধ্যে ভারতের জাতীয় আয় ১০ দশমিক সাত শতাংশে উন্নীত হয়। সম্ভবত, এই উচ্চতায় এর আগে ভারত কখনও পৌঁছতে পারেনি। ১৮৯৮ সাল পর্যন্ত, সব এশীয় দেশের মতো ভারত ছিল বাণিজ্যিকভাবে ‘সিলভার’ মানে। ১৮৭০’র দশকের মধ্যে ভারতে রুপার দাম কমতে থাকে, ফলে পাউন্ডস্টার্লিংয়ের বিপরীতে রুপির বিনিময় মূল্য পড়ে যায়। এতে আভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্যের দাম বাড়তে থাকে, কিন্তু ভারতীয় রফতানি খাত ব্রিটেনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ঝিমিয়ে পড়ে। এই চিত্রটি সবচেয়ে ভালোভাবে ফুটে ওঠে চীনের টেক্সটাইল বাজারে। ১৮৯৮ সালে ভারত স্বর্ণ লেনদেনের মানে পৌঁছে, ফলে রুপি স্টার্লিং’র মূল্যমান ১৫:১ অনুপাতে স্থির হয়। ফলে চীনের বিপরীতে প্রতিযোগিতায় ভারতের শক্তি হ্রাস হয়, কেননা চীন তখন সিলভার মুদ্রামানে স্থির ছিল। কিন্তু এই প্রতিকুল পরিস্থিতি ভারত তখন মিটিয়ে ফেলতে পেরেছিল, কেননা জাপান ওই সময়ে স্বর্ণ লেনদেনের মানে স্থির ছিল।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় পাউন্ডস্টার্লিংয়ের লেনদেন হার ভাসমান অবস্থায় ছিল। তাই রুপির জন্য এটা ছিল সুবিধাজনক। কিন্তু তারপর ১৯২৫ সালে স্টালিংয়ের মান একটি নির্দিষ্ট জায়গায় এবং উচ্চ মূল্যমানে পৌঁছে; দুর্ভাগ্যক্রমে তখন রুপির অবস্থা আবার যুদ্ধ-পূর্ববর্তী সময়ের অবস্থায় আটকে যায়। এই উচ্চ মূল্যমান সরকারে বাৎসরিক অর্থনৈতিক সংকট নিরসন করেছিল। কিন্তু এর ফলে  দেশজ অর্থনৈতিক নীতিতে সংকোচন আনতে হয়েছিল। তাছাড়া ভারতীয় রফতানি খাত ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়; বিশেষ করে, যেসব পণ্য চীন ও জাপানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করত।

১৯১৩ থেকে ১৯৩৭ সালের মধ্যে ফলে ভারতীয় রফতানি খাতে এক বিশাল ধস নামে। এটি তখন যে কোনো দেশের তুলনায় এক নগণ্য দশায় পরিণত হয়। রফতানি খাত থেকে তখন মাত্র ৫ শতাংশ জাতীয় আয়ে অন্তর্ভুক্ত হতে থাকে। যদি আমরা ১৮৫০ থেকে ১৯৫০ এই একশ বছরের ভারতীয় রফতানি খাতের দিকে তাকাই, তাহলে তা এশিয়ার যে কোনো দেশের তুলনায় অতি খারাপ পরিস্থিতিই দেখতে পাব।

 

গবেষক, শেয়ার বিজ।

 

সর্বশেষ..