রমজানের মর্যাদাপূর্ণ আমল ইতিকাফ

হাফেজ মাওলানা নাসির উদ্দিন: ‘ইতিকাফ’ আরবি শব্দ। আবিধানিক অর্থে ইতিকাফ হলো অবস্থান করা। কোনো স্থানে নিজেকে আবদ্ধ করে রাখা। শরিয়তের পরিভাষায় ইতিকাফ হলো ইবাদত ও সওয়াবের উদ্দেশ্যে, পুরুষদের জন্য মসজিদে এবং নারীদের জন্য স্বীয় ঘরে নামাজের জায়গায় অবস্থান করা। ইতিকাফ এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যার প্রচলন ইসলামের শুরু থেকেই ছিল। হজরত ইবরাহিম (আ.) ও হজরত ইসমাইল (আ.)-কে ইতিকাফকারীদের জন্য বাইতুল্লাহকে পবিত্র করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘এবং আমি ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.)-কে আদেশ করলামÑতোমরা আমার ঘরকে তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী ও রুকু-সিজদাকারিদের জন্য পবিত্র রাখ’। (সুরা বাকারাহ, আয়াত ১২৫)
রমজানের ইতিকাফ ও এর ফজিলত
রমজানের ২০ তারিখের সূর্যাস্ত থেকে ঈদের চাঁদ ওঠা পর্যন্ত ইতিকাফ করাকে ইতিকাফে মাসনুন বলা হয়। হাদিস শরিফে আছে, নবী করিম (সা.) রমজানের শেষ ১০ দিন ইতিকাফ করতেন। (বুখারি শরিফ, ২০২১; মুসলিম শরিফ ১১৭১)। পবিত্র রমজানে ইতিকাফ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। রমজানের বরকত এবং লাইলাতুল কদরের বরকত পাওয়ার জন্য ইতিকাফের গুরুত্ব অপরিসীম। নবীজী (সা.) তাঁর মাদানি জীবনে মাত্র একটি রমজানে জিহাদের সফরের কারণে ইতিকাফ করতে পারেননি। তবে পরবর্তী বছর ২০ দিন ইতিকাফ করে তা পূরণ করে নিয়েছেন। এছাড়া তিনি সবকটি ইতিকাফ করেছেন। সাহাবিগণও তাঁর সঙ্গে ইতিকাফে শরিক হতেন। তাই ইতিকাফ একটি মর্যাদাপূর্ণ সুন্নাহ, যা ইসলামের একটি অংশও বটে। এমনকি কোনো মসজিদে ইতিকাফশূন্য থাকলে পুরো এলাকাবাসী সুন্নতে মুয়াক্কাদা বর্জনের কারণে গুনাহগার হবে। নবী করিম (সা.) প্রত্যেক রমজানে ১০ দিন ইতিকাফ করতেন। তবে ওফাতের বছর ২০ দিন ইতিকাফ করেছেন। (বুখারি শরিফ ২০৪৪)।
ইতিকাফের ফজিলত সম্পর্কে নবী করিম (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একদিন ইতিকাফ করবে, আল্লাহতায়ালা তার এবং জাহান্নামের মধ্যে তিন খন্দক দূরত্ব সৃষ্টি করে দেবেন। অর্থাৎ আসমান ও জমিনের মাঝে যত দূরত্ব আছে, তার চেয়েও বেশি দূরত্ব সৃষ্টি করে দেবেন।’ (শুআবুল ঈমান ৩৯৬৫)। ইতিকাফ হলো শবে কদর অন্বেষণের অন্যতম মাধ্যম। হাদিস শরিফে আছে, ‘নবী করিম (সা.) রমজানের মাঝের ১০ দিন ইতিকাফ করতেন। এক বছর এভাবে ইতিকাফ শেষ করার পর যখন রমজানের ২১তম রাত এলো, (অর্থাৎ যে রাত গিয়ে সকালে তিনি ইতিকাফ থেকে বের হবেন) তিনি ঘোষণা করলেনÑযে ব্যক্তি আমার সঙ্গে ইতিকাফ করেছে, সে যেন শেষ দশকে ইতিকাফ করে। কারণ, আমাকে শবে কদর সম্পর্কে অবগত করা হয়েছিল যে, তা শেষ দশকের অমুক রাত)। এরপর তা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। সুতরাং তোমরা শবেকদর শেষ দশকে খোঁজ করো’। (বুখারি শরিফ ২০২৭)
ইতিকাফের মাসয়ালা
রমজানের ২০ তারিখ সূর্যাস্তের আগেই ইতিকাফের নিয়তে মসজিদে পৌঁছে যাওয়া জরুরি। (আদ্দুররুল মুখতার ২/৪৪২)। ইতিকাফের দিনগুলোতে তিলাওয়াত, তাসবিহ-তাহলিল ও ইবাদত-বন্দেগিতে কাটানো উত্তম। (ফাতওয়ায়ে আলমগীরী ১/২১২)। পুরুষরা শুধু মসজিদে ইতিকাফ করবে। (আদ্দুররুল মুখতার ২/৪৪০-৪৪১)। ইতিকাফকারী ব্যক্তির জন্য অন্যান্য রোজাদারের মতো রাতের বেলায় খাওয়া-দাওয়া ও চা-পান করা সবকিছুই জায়েজ। (ফাতওয়ায়ে আলমগীরী ১/২১২)। ইতিকাফকারীর জন্য জরুরি চিঠিপত্র লেখা ও ধর্মীয় বইপত্র লেখা জায়েজ। (আদ্দুররুল মুখতার ২/৪৫০)। মসজিদে ইতিকাফ অবস্থায় শুধু প্রয়োজনীয় বেচাকেনার কথাবার্তা বলা জায়েজ। তবে পণ্য মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করানো যাবে না। (ফাতওয়ায়ে আলমগীরী)। মলমূত্র ত্যাগ, অজু, ফরজ গোসল ও সুন্নত গোসলের জন্য মসজিদ থেকে বের হওয়া জায়েজ। (ফাতওয়ায়ে আলমগীরী ১/২১২)
নারীদের ইতিকাফ
নারীরা নিজের ঘরে নামাজের স্থানে ইতিকাফ করবেন। নামাজের জন্য পূর্ব থেকে কোনো নির্দিষ্ট স্থান না থাকলে তা নির্দিষ্ট করে নেবেন। এরপর সেখানে ইতিকাফ করবেন। (ফাতওয়ায়ে আলমগীরী ১/২১১)। মাসিক (ঋতুস্রাব) অবস্থায় ইতিকাফ করা সহিহ নয়। কারণ এ অবস্থায় রোজাই রাখা যায় না। আর সুন্নত ইতিকাফের জন্য রোজা রাখা জরুরি। (ফাতওয়ায়ে আলমগীরী ১/২১১)। ইতিকাফ করতে হলে স্বামীর অনুমতি নিয়েই ইতিকাফ করতে হবে। স্বামীর নিষেধ থাকা সত্ত্বেও ইতিকাফ করলে ইতিকাফ সহিহ হবে না। (ফাতওয়ায়ে আলমগীরী ১/২১১)।