রমজানে দ্রব্যমূল্য সহনীয় থাকবে তো?

তৌহিদুর রহমান: বছর ঘুরে চলে এসেছে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের সিয়াম সাধনার মাস  পবিত্র রমজান। এ মাসে রোজা রেখে আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করেন মুসলমানরা। আর মাসজুড়েই প্রতিদিন রোজার পর সন্ধ্যায় ইফতারে কিংবা ভোরে সেহরির খাবারের তালিকায় মোটামুটি পুষ্টিকর খাবার রাখার চেষ্টা করেন তারা। ফলে কিছু নির্দিষ্ট ধরনের খাবারের চাহিদা রমজান মাসে বেড়ে যায়। বছরের পর বছর ধরে এ বিষয়টিকেই সুযোগ হিসেবে নিচ্ছে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। রমজান মাস সামনে রেখে এবং এ মাস শুরু হলেই তারা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন। আর এ বিষয়ে প্রশ্ন উঠলে তারা নানা ধরনের খোঁড়া অজুহাত সামনে নিয়ে আসেন। এবারও সে অবস্থার ব্যতিক্রম হয়নি বলেই অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে। অন্তত গণমাধ্যমের কিছু খবর সে বিষয়কেই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। আর তাই এখনই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, রমজানে দ্রব্যমূল্য শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জন্য সহনীয় পর্যায়ে থাকবে তো ?
পবিত্র রমজান মাসে ছোলা, খেজুর থেকে শুরু করে তেল, শসা, চিনি, মাছ, মাংস, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, বেগুন, টমেটো, আপেল, কমলা, আঙুরসহ বিভিন্ন ধরনের ফল ছাড়াও কিছু নির্দিষ্ট পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। এসব পণ্যের একটি বড় অংশই আমদানি করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে এগুলোর ন্যায্য দাম সম্পর্কে ক্রেতাদেরও খুব বেশি ধারণা থাকে না। ফলশ্রুতিতে ব্যবসায়ীরা পাইকারি বাজারে যে দাম নির্ধারণ করেন, সে দামেই এসব পণ্য বিক্রি হয়। আর খুচরা বাজারে গিয়ে তার দাম আরও বেড়ে যায়। সুস্পষ্ট ধারণা না থাকায় সেখানে যে দাম নির্ধারিত থাকে, সে দামেই ক্রেতারা পণ্য কিনতে বাধ্য হন। বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে দেখা যায়, এগুলো কেনা দামের তুলনায় পাইকারি ও খুচরা বাজারে কিছু ক্ষেত্রে দ্বিগুণেরও বেশি দামে বিক্রি হয়।
দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজার প্রায় প্রতি বছরই রমজান মাস সামনে রেখে অস্থির হয়ে ওঠে। ফলে এর মাসখানেক কিংবা তারও আগে থেকেই সরকারিভাবে নানা ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়। দাম বৃদ্ধি করলে নানা ধরনের শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে তা কতটা ফলপ্রসূ হয়, তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। দেখা যায়, সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে সতর্ক করে দেওয়া হলেও একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী তাতে মোটেও কর্ণপাত করেন না। রমজান এলে বিভিন্ন ধরনের পণ্যের দাম ঠিকই বাড়িয়ে দেন তারা। এবারও খুচরা বাজারে সে ধারাই লক্ষ করা যাচ্ছে।
রমজান মাস শুরু হওয়ার আগে থেকেই এবার বিভিন্ন ধরণের পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়া শুরু হয়েছে বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। রমজান মাসে চাহিদার শীর্ষে থাকা খাদ্যপণ্যের মধ্যে একটি মাংস। এবার রমজান শুরুর আগেই রাজধানী ঢাকার বাজারে গরু ও মুরগির মাংসের দাম ৩০-৫০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া মাছ, বেগুন, পেয়াজ, রসুন, চিনিসহ আরও বেশ কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে বলেও খবরে প্রকাশ পেয়েছে। এর মধ্যে শুধু বেগুনের দামই সপ্তাহের ব্যবধানে দ্বিগুণ হয়ে গেছে বলে জানা যাচ্ছে!
অথচ রমজান শুরুর বেশ কিছুদিন আগে থেকেই এ বিষয়ে বেশ সতর্ক অবস্থানেই রয়েছে সরকার। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন এরই মধ্যে এ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের কড়া ভাষায় সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, রমজানে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করা হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর আগে গত এপ্রিলে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদও এ বিষয়ে বলেছেন, রমজানে দ্রব্যমূল্য স্বাভাবিক থাকবে। তবে ব্যবসায়ীরা সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলগুলোর এসব কথায় যে কর্ণপাত করছেন না, ইতিমধ্যে তা প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর ও সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া থেকে স্পষ্ট হচ্ছে।
কয়েক বছর ধরে আরও একটি বিষয়ে বেশ পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। তা হলো রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির আশঙ্কায় অনেক ক্রেতা আগে থেকেই কিছু পণ্য কিনে রাখতেন। এতে রমজান মাসে তাদের বাড়তি দামের ভোগান্তি থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি দিত। কিন্তু সে বিষয়টিও এখন ব্যবসায়ীদের নখদর্পণে। তারা এখন কৌশল পাল্টে রমজান শুরুর অন্তত এক মাস আগে থেকেই পণ্যের দাম বৃদ্ধি করা শুরু করছেন। ফলে খরচ কমাতে সাধারণ মানুষ অগ্রিম কিছু পণ্য কিনে রাখার ইচ্ছা করলেও তা আর হচ্ছে না। এবারও এ ধারার পরিবর্তন হয়নি বলেই অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়।
সিলেটে পেঁয়াজ-রসুনের বাজারদর নিয়ে সম্প্রতি গণমাধ্যমে একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে রমজান সামনে রেখে হঠাৎ করেই ৮ থেকে ২৫ টাকা পর্যন্ত পেঁয়াজ-রসুনের দাম বাড়ানো হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এর কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীদের সেই পুরোনো খোঁড়া যুক্তি। পথে দেরি, তীব্র গরমে বিদেশে দাম বেশি, পরিবহন খরচ বেশি প্রভৃতি কারণ দেখানো হয়েছে। অথচ বেশ কিছুদিন ধরেই গরম ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া বিরাজ করছে দেশজুড়ে, তখনও পণ্যের দাম অনেকটা নাগালের মধ্যেই ছিল। তাই এখন হঠাৎ করেই পণ্যের দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এগুলো যুক্তিসঙ্গত কারণ নিশ্চয়ই হতে পারে না। অন্য একটি খবরে দেখা যাচ্ছে, দেশের সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর বেনাপোল দিয়ে আমদানি করা পেঁয়াজ-রসুনের দামও ১৫-২০ টাকা করে বৃদ্ধি পেয়েছে।
রমজান সামনে রেখে অসাধু ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে দাম বাড়িয়ে থাকেন। এ প্রবণতা চলছে বেশ অনেক বছর ধরেই। রমজান শুরুর কয়েক মাস আগে থেকেই তারা পণ্য আমদানি করে গুদামজাত শুরু করেন। পরে সুযোগ বুঝে দাম বাড়িয়ে দেন। এ সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছে। জড়িয়ে আছে ক্ষমতাসীন নেতাকর্মী থেকে বড় বড় ব্যবসায়ীসহ আরও অনেকে। তারাই সারা দেশে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন বলে খবরে প্রকাশ। আর এর অজুহাত হিসেবে পরিবহন খরচ, রক্ষণাবেক্ষণ, পণ্যের স্বল্পতা প্রভৃতি বিষয় সামনে নিয়ে আসেন। এবারও রমজান শুরুর আগে থেকেই যা লক্ষ করা যাচ্ছে। চট্টগ্রামসহ কয়েকটি স্থানে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযানও চালিয়েছে। কিন্তু এসব অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য কমার আপাতত কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
রমজান সামনে রেখে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির আরও একটি বড় নেতিবাচক দিক রয়েছে। দেখা যায়, রমজান সামনে রেখে যে পণ্যের দাম বাড়ানো হয়, পরে তা কমানোর আর কোনো চেষ্টা দেখা যায় না। বরং ওই দামটাই স্থায়ী হয়ে যায়। এভাবে প্রতি বছরই রমজান মাস সামনে রেখে পণ্যের দাম বৃদ্ধি করে আসছেন ব্যবসায়ীরা।
পণ্যের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে কিছু চক্র সবসময়ই নেতৃত্ব দিয়ে আসছে, এটা সবারই জানা। তাদের কাছে সাধারণ মানুষও অনেকটা জিম্মি। অসৎ পথ অবলম্বন করে তারা যেমন মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনকেও দুর্বিষহ করে তুলছে। অনেক মানুষের প্রতিদিনের খাবার জোটাতে গিয়েই যেখামে হিমশিম খেতে হয় সেখানে বাড়তি দামে পণ্য কেনাটা তাদের জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’র মতোই অবস্থা। আর মধ্যবিত্ত বিশেষ করে সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বিষয়টা মোটেও সুখকর নয়। কারণ যে বেতন তারা পান, তা দিয়ে খুব হিসেব করেই মাসের খরচ চালাতে হয়। এর উপর বাড়তি খরচের বোঝা তাদের জন্য বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে, এটাই স্বাভাবিক।
রমজান সামনে রেখে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তাদের ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রির বিষয়টি সাধারণ মানুষের কাছে বেশ গ্রহণযোগ্য হিসেবেই বিবেচিত। রমজান সামনে রেখে টিসিবির কার্যক্রম আরও বৃদ্ধি করাটা জরুরি।
রমজান মাস সামনে রেখে অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। তারা যতই ক্ষমতাধর হোন না কেন এ বিষয়ে আইনানুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। কোন ব্যবসায়ীরা এ ধরনের অসাধু কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। খুচরা পর্যায়ে পণ্যের দাম ঠিক রাখার জন্য বাজার কঠোরভাবে মনিটরিং করাটাও জরুরি। এছাড়া কোন বিষয়গুলো দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে তা চিহ্নিত করে সেগুলো প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
প্রশাসনের কর্তাব্যক্তি, প্রতাপশালী নেতা বা অন্য কেউ পেছন থেকে এর সঙ্গে জড়িত থাকলে তাদেরও শাস্তির আওতায় আনতে হবে। টিসিবির কার্যক্রম আর জোরদার করাও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে। এছাড়া সাধারণ মানুষের সচেতনতাও অসৎ ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য অনেকাংশে কমিয়ে দিতে পারে। মোটকথা, রমজান মাস সামনে রেখে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জন্য বাড়তি বোঝা হয়ে দেখা দেয়, কষ্টটাও অনেক বাড়িয়ে দেয়। এজন্য রমজানে তারা যাতে কষ্ট না পান সেদিকটা অবশ্যই সরকারকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিশ্চিত করতে হবে।
তবে আশার কথা হলো, রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে সম্প্রতি সচিবালয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বৈঠক করেছেন। সেখানে তিনি জানিয়েছেন, প্রয়োজনের তুলনায় কয়েকগুণ পণ্য মজুদ আছে। ব্যবসায়ীদের সহনীয় পর্যায়ে মুনাফা করারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। সেখানে ব্যবসায়ীরাও দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার আশ্বাস দিয়েছেন। আমরাও বাণিজ্যমন্ত্রী এবং ব্যবসায়ীদের কথায় আস্থা রাখতে চাই। তবে আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা খুব বেশি সুখকর ছিল না, এবারও পরিস্থিতি সেদিকেই যাচ্ছে বলে গণমাধ্যমের খবর বলছে। বাকিটা সময়ের হাতেই সমর্পণ করা থাকল।

গণমাধ্যমকর্মী

[email protected]