দুরে কোথাও

রহস্যময় দ্বীপ নর্থ সেন্টিনেল আইল্যান্ড

চারদিকে জলবেষ্টিত দ্বীপ বা আইল্যান্ডের মতো স্থানে অনেকেরই বেড়াতে যেতে মন চায়। দ্বীপ কিংবা সমুদ্রে বসে মুরগি বা হাঁসের রোস্ট করে খেতে ইচ্ছা হয় অনেক সময়। ভ্রমণপিয়াসি মানুষেরা তাই প্রকৃতিকে উপভোগ করতে ছুটে যান পাহাড়, সমুদ্র বা জঙ্গলে। অনেকেই আছেন যারা এ তিনটি একই সঙ্গে উপভোগ করতে চান। তাদের জানিয়ে রাখি, এ তিনটির সমন্বয় পাওয়া যাবে বঙ্গোপসাগরের আন্দামান ও নিকোবর আইল্যান্ডে। এটি মূলত ভারতীয় কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। ৫৭২টি ছোট-বড় দ্বীপ নিয়ে আন্দামান ও নিকোবর আইল্যান্ড বা দ্বীপপুঞ্জ গঠিত। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যে কোনো পর্যটককে মুগ্ধ করে। তবে পর্যটকদের ভ্রমণের ক্ষেত্রে কিছু দ্বীপে সরকারি বিধিনিষেধ রয়েছে। এসব দ্বীপে অনেক রহস্য ও বিপদ দানা বেঁধে রয়েছে, যা অনেক সময় প্রাণঘাতীও হতে পারে।
এমনি একটি দ্বীপে গেলে প্রাণ নিয়ে আর ফিরে আসা যায় না। তাই ভারতের সরকার এ দ্বীপে বেড়াতে যাওয়া চিরতরে নিষিদ্ধ করেছে। আন্দামানের রাজধানী পোর্টব্লেয়ার থেকে পশ্চিম দিকে মাত্র ৫০ কিমি দূরে অতীব সুন্দর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মোড়া এ দ্বীপ। এর নাম নর্থ সেন্টিনেল আইল্যান্ড। এ দ্বীপে পর্যটকরা চাইলেও বেড়াতে যেতে পারেন না।
চৌকাকার এ দ্বীপটি দেখতে যতটা সুন্দর, ঠিক ততটাই ভয়ংকর ও বিপজ্জনক। না, এখানে কোনো বাঘ-ভাল্লুক বা হিংস্র পশুর ভয় নেই। এখানে সেন্টিনেলিস নামক প্রাচীন উপজাতিদের বসবাস। তারাই প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। এ উপজাতিরা অন্য কোনো মানুষের সংস্পর্শ একেবারেই পছন্দ করে না। বহিরাগতদের ওপর আক্রমণাত্মক মনোভাবের জন্য সেন্টিনেলবাসী বিশেষভাবে পরিচিত। উন্নত সভ্য জগতের ছোঁয়া থেকে তারা দূরে। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য যারাই সেখানে যাওয়ার চেষ্টা করেছে তারাই তীরবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে।
সেন্টিনেলিসরা প্রধানত শিকারনির্ভর জাতি। বেঁচে থাকার জন্য তারা শিকার, মাছ ধরা ও বন্য লতাপাতার খেয়ে থাকে। এখন পর্যন্ত তাদের মাঝে কৃষিকাজ করা বা আগুন ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সেন্টিনেলিসদের কাছে তাদের ৭২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দ্বীপটিই যেন পৃথিবী। ১৯৭৫ সালে ন্যাশনাল জিওগ্রাফির একজন পরিচালক একটা তথ্যচিত্র বানানোর উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন সেই দ্বীপে। কিন্তু হিংস্র উপজাতিরা তার দিকে বিষাক্ত তীর ছোঁড়ে। তীরটি তার পায়ে বিদ্ধ হয়। তিনি মারাত্মক আহত হন। তখন থেকেই সেখানে কারও প্রবেশাধিকার নেই।
সেন্টিনেলিসরা ভারতের অধীনে থাকলেও বাস্তবে তারা সম্পূর্ণ স্বাধীন। এখন পর্যন্ত ভারত সরকারও এ দ্বীপ সম্পর্কে তেমন তথ্য সংগ্রহ করতে পারেনি। উল্লেখ্য, ব্রিটিশদের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দ্বীপটি দখলের পাঁয়তারা করে। এ উদ্দেশ্যে তারা দ্বীপ থেকে কয়েকজন অধিবাসীকে লোকালয়ে নিয়ে আসে। অপহরণের উদ্দেশ্য ছিল তাদের ভালো খাবার ও পরিবেশ দিয়ে তাদের মন জয় করে দ্বীপের দখল নেওয়া। কিন্তু ব্রিটিশদের এ চেষ্টা গোড়াতেই শেষ হয়ে যায়। কারণ দ্বীপবাসীদের লোকালয়ে ধরে আনার পরপরই দ্বীপবাসীরা মারা যায়। ধারণা করা হয়, তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ছিল ভীষণ দুর্বল। সভ্য জগৎ থেকে অনেক কাল দূরে থাকায় তারা ভ্যাক্সিন বা কোনো ধরনের ওষুধের সংস্পর্শে আসতে পারেনি। তাই সর্দি-কাশির মতো সাধারণ রোগে ভুগে দ্রুত তারা মারা যায়।
জানা যায়, আন্দামান দ্বীপের দুই জেলে এ দ্বীপের কাছাকাছি মাছ ধরতে যায়। রাতের বেলা অত্যধিক মদ পানে ঘুমিয়ে পড়লে সমুদ্রের স্রোতে ভেসে তারা সেই দ্বীপে চলে যায়। দ্বীপবাসীরা জেলেদের নৃশংসভাবে হত্যা করে। ভারতীয় কোস্টগার্ড জেলেদের লাশ উদ্ধার করতে হেলিকপ্টার পাঠালে তারা হেলিকপ্টার লক্ষ করে তীর ছুড়তে থাকে। যদিও উদ্ধার অভিযানে আসা হেলিকপ্টার থেকে তাদের মরদেহ দেখা গিয়েছিল, কিন্তু নিরুপায় হয়ে উদ্ধারকারীরা ফিরে আসে।
এখন পর্যন্ত সঠিকভাবে সেন্টিনেলিদের জনসংখ্যার কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হয়, তাদের জনসংখ্যা সর্বনি¤œ ৩৯ থেকে সর্বোচ্চ ৫০০ পর্যন্ত হতে পারে। নৃবিজ্ঞানীরা মনে করেন, সেন্টিনেলের অধিবাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হলে তাদের জীবনধারার সম্পর্কে অনেক তথ্যাবলি উঠে আসবে, যা মানুষের বিবর্তন কীভাবে হয়েছে এবং আদিম যুগে মানুষ কীভাবে বসবাস করত এমন বিষয়। এসব বিষয় বিশেষজ্ঞদের গবেষণায় অনেক সাহায্য করতে পারত। অনেক চেষ্টা করেও এ হিংস্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে না পারায় বাধ্য হয়ে এ আইল্যান্ডকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। এ থেকেই ভারত সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, সেন্টিনেলবাসীদের জীবনযাত্রা বাইরের প্রভাবমুক্ত রাখার। তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা রক্ষার্থে দ্বীপের তিন কিলোমিটারের মধ্যে যাওয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
পাঠকদের উদ্দেশে আবারও বলা যায়, চমৎকার একটি দ্বীপ নর্থ সেন্টিনেল আইল্যান্ড। দ্বীপটি খুব সহজেই আকর্ষণ করবে যে কাউকে। তবে চাইলেই এর সৌন্দর্য উপভোগ করা সম্ভব নয়।

 

সর্বশেষ..