রাইট শেয়ারের নামে কোম্পানিগুলোর প্রতারণা

পাঁচ বছরে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা উত্তোলন

মুস্তাফিজুর রহমান নাহিদ: পুঁজিবাজারে রাইট শেয়ার ছেড়ে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করেছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। পাঁচ বছরে ২৬ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ইস্যু করে এ অর্থ উত্তোলন করা হয়। কিন্তু আর্থিক অবস্থার উন্নতি করতে পারেনি অধিকাংশ কোম্পানি। উল্টো ‘জেড’ ক্যাটেগরিতে অবস্থান করছে তিনটি প্রতিষ্ঠান। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অধিকাংশ ১০ শতাংশ করে বোনাস শেয়ার ইস্যু করে কোনো রকম ‘এ’ ক্যাটেগরি ধরে রেখেছে।
রাইট শেয়ার ইস্যু করা কিছু প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদরের অবস্থাও নাজুক। এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর অবস্থান করছে অভিহিত দরের কাছাকাছি। আর তিনটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর অভিহিত দরের নিচে নেমে গেছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান রাইট শেয়ার ছাড়ার অনুমতি পায় কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাইট শেয়ার ইস্যু করে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান মালিকই কোম্পানির উন্নয়নের কাজে এ অর্থ ব্যবহার না করে নিজেদের ফায়দা হাসিল করেন। তাদের কোনো ব্যবসায়িক পরিকল্পনাও থাকে না। রাইটের মাধ্যমে এ অর্থ উত্তোলন সহজলভ্য বলে তারা সুযোগটি গ্রহণ করে। তবে ভালো প্রতিষ্ঠানগুলো এই অর্থ নিয়ে প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন কাজে ব্যয় করে। তারা সফলও হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারহোল্ডাররাও যার সুবিধা পান। আর বছর শেষে তারা শেয়ারহোল্ডারদের সন্তোষজনক লভ্যাংশ দেওয়ার চেষ্টা করে। পক্ষান্তরে যাদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা থাকে না কিংবা ভিন্ন উদ্দেশ্য থাকে, তাদের কোম্পানির কোনো উন্নতি হয় না। ফলে এসব কোম্পানির শেয়ার নিয়ে এক সময় বিপদে পড়তে হয় বিনিয়োগকারীদের। এটা এক ধরনের প্রতারণা।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে রাইট শেয়ারের মাধ্যমে কোম্পানিগুলো মোট চার হাজার ৫৯ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। যার মধ্যে প্রিমিয়াম ছিল এক হাজার ৪৩৫ কোটি। এর মধ্যে ২০১২-১৩ অর্থবছরে তাল্লু স্পিনিং, ফনিক্স ফাইন্যান্স, পূরবী জেনারেল ইন্স্যুরেন্স, ফাস ফাইন্যান্স ও ন্যাশনাল হাউজিং অর্থ সংগ্রহ করে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ফার্স্ট লিজিং ফাইন্যান্স (বর্তমান ফার্স্ট ফাইন্যান্স), আরামিট সিমেন্ট, জেনারেশন নেক্সট, রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স এবং ব্র্যাক ব্যাংক পুঁজিবাজার থেকে রাইটের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে। আর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ডেল্টা স্পিনার্স, মাইডাস ফাইন্যান্স, ফার্স্ট সিকিউরিটিজ ইসলামী ব্যাংক ও আইসিবি এবং ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দুটি প্রতিষ্ঠান রাইট শেয়ার ছেড়ে অর্থ উত্তোলন করে। কোম্পানি দুটি হচ্ছে সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট ও জিপিএইচ ইস্পাত। আর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রাইটের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে বিডি থাই, আইডিএলসি, সাইফ পাওয়ার টেক ও আইএফআইসি ব্যাংক। একইভাবে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে অর্থ সংগ্রহ করে ইফাদ অটোস, লংকাবাংলা ফাইন্যান্স ও আলিফ ম্যানুফ্যাকচারিং।
বিষয়টি নিয়ে কথা বললে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ শেয়ার বিজকে বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজার থেকে আইপিও কিংবা রাইটের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করে, তাদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা থাকা দরকার। যাদের পরিকল্পনা থাকে, তারা এই অর্থ নিয়ে ভালো করতে পারেন। কিন্তু যারা কোনো পরিকল্পনা করে চলেন না, তাদের সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। এই অর্থ কোথায় কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে, তা দেখার দায়িত্ব সংশ্লিষ্টদের।
২০১২-১৩ অর্থবছরে রাইটের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে তাল্লু স্পিনিং। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি তাদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি করতে পারেনি। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানের অবস্থান ‘জেড’ ক্যাটেগরিতে। প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ না থাকায় অভিহিত দরের নিচে চলে গেছে দর। বর্তমানে এ শেয়ার সর্বোচ্চ সাত টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। একই অবস্থা বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিজ ফাইন্যান্সের। ‘জেড’ ক্যাটেগরিতে নেমে গেছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে এ শেয়ার লেনদেন হচ্ছে ছয় টাকায়। একইভাবে ‘জেড’ ক্যাটেগরির ফার্স্ট ফাইন্যান্সের শেয়ারও সাত টাকায় কেনাবেচা হচ্ছে। এছাড়া অভিহিত দরের নিচে লেনদেন হচ্ছে বস্ত্র খাতের জেনারেশন নেক্সটের শেয়ার।
এদিকে রাইট শেয়ারের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করা বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশের বেশি রাইট শেয়ার ছাড়ার পর আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে পারেনি। এসব প্রতিষ্ঠান ১০ থেকে সর্বোচ্চ ১২ শতাংশ লভ্যাংশ দিয়ে কোনোরকম ক্যাটেগরি টিকিয়ে রেখেছে।