রাজধানীতে জীবনযাত্রা কঠিন হচ্ছে

হাসান সাইদুল: ৩০ বছর ধরে রহিম মিয়া ঢাকায় বাস করছেন। লেখাপড়ার জন্য ঢাকায় আসেন। স্নাতকোত্তর পাস করার পর আর গ্রামে ফেরেননি। রাজধানীতেই চাকরি নিয়ে জীবনযাপন শুরু করেন। গ্রামে তার বয়োবৃদ্ধ মা-বাবা রয়েছেন। তাদের খরচ পাঠাতে হয় প্রতি মাসে। রহিম মিয়ার আক্ষেপ নিজের পরিবারের খরচসহ যাবতীয় ব্যয় মেটাতে মাসে কমপক্ষে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা আয় করতে পারলে মোটামুটি সম্মানজনকভাবে ঢাকায় বাস করা যেত পরিবার-পরিজন নিয়ে। কিন্তু সে তুলনায় তার বেতন অনেক কম হওয়ায় বাধ্য হয়ে কম খরচের ছোট বাসায় বাস করছেন কষ্ট করে। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ায় ভালো করার জন্য প্রয়োজনীয় খরচ করতে পারেন না। এর মধ্যে ছোট দুই ছেলেমেয়ের প্রায়ই অসুখ-বিসুখ লেগে থাকে। বাড়ি ভাড়া প্রতিবছরই বাড়ে, আর বাড়িওয়ালাও বেপরোয়া। রহিম মিয়া ভাবেন, ঢাকায় নিজের একটু জমি থাকলে টিনের ঘর বানিয়েও থাকতে পারতেন। কিন্তু ২০ বছর ধরে চাকরি আর ১৬ বছর ধরে সংসার করেও কোনো টাকা-পয়সা জমাতে পারেননি।
কুমিল্লার বাসিন্দা করিম শেখ। দিলকুশার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অফিস সহকারী। তার এক ছেলে, এক মেয়ে। কোনোভাবে সংসার চলে। গ্রামের বাড়িতে মাকে নিয়মিত টাকা পাঠাতে হয়। পাশাপাশি বড় ভাইয়ের সংসারেও সাহায্য করতে হয়। বড় ভাই অসুখে মারা গেছেন চার সন্তান রেখে। তিনি নিজের সংসারসহ যাবতীয় খরচ চালাতে চাকরির পাশাপাশি একটি ফার্নিচার দোকান দিয়েছেন। পুরোনো ফার্নিচার কেনাবেচা করেন। নতুন ফার্নিচারও বানান অর্ডার পেলে। তবে সারা দিন দোকান খোলা রাখতে পারেন না। অফিস থেকে এসে বিকালে দোকান খোলেন। রাত ১১টা-১২টা পর্যন্ত খোলা থাকে। আগে তার পরিবার ঢাকায় ছিল। মাঝেমধ্যে বৃদ্ধ মাও পরিবারের সঙ্গে থাকতেন। মা বৃদ্ধ হওয়ায় তার পরিবার এখন গ্রামে থাকে। তাছাড়া ঢাকায় জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেশি।
উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় সাধারণ মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে পাড়ি জমাচ্ছে দিনের পর দিন। রাজধানীতে সত্যিকার অর্থে মানুষের জীবন কতটা সহজ হচ্ছে, তা-ই এখন মৌলিক প্রশ্ন। এ শহর দিনে দিনে সম্প্রসারিত ও সমৃদ্ধ হচ্ছে। এ নগরীতে এমন বহু লোক বাস করে, যাদের জীবনযাত্রার মান বিশ্বের যে কোনো উন্নত দেশের নাগরিকের সঙ্গে তুলনা করা যায়। এটাই এ শহরের একমাত্র চেহারা নয়, অন্য দৃশ্য অত্যন্ত করুণ। সম্পদ ও শ্রেণিবৈষম্যের কারণে এ দৃশ্য দিনে দিনে প্রকট হচ্ছে। তাই স্বল্প আয়ের মানুষের জীবন ক্রমে কঠিন হয়ে উঠছে রাজধানী শহরে। জীবনযাপনের ব্যয় যেভাবে দ্রুত বাড়ছে, সে তুলনায় আয় বাড়ছে না অনেকের। দিন দিন জীবনমান নি¤œ থেকে নি¤œতর হচ্ছে এক শ্রেণির মানুষের। রাজধানীতে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে গ্রামে বসবাসরত মা-বাবা ও ভাইবোনদের খরচও অনেককে বহন করতে হয়। সে সঙ্গে শহরে বসবাসরত সাধারণ মানুষের পরিবার-সন্তানদের খরচ মেটানো হয়ে উঠছে অত্যন্ত কষ্টের।
রাজধানীতে সীমিত আয়ের মানুষের পরিবারে প্রতিনিয়ত চলছে নানা ধরনের টানাপড়েন। অর্থনৈতিক সংকট থেকে পরিবার ও সমাজে তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের অশান্তি আর বিশৃঙ্খলা। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজধানীতে জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় অনেকের জীবন বিষিয়ে উঠছে। দীর্ঘদিন ঢাকায় বসবাসের কারণে, সন্তানের লেখাপড়াসহ নানা কারণে অনেকে চাইলেও আর গ্রামে ফিরতে পারছেন না।
ঢাকা শহরে বসবাসরত স্বল্প আয়ের মানুষের প্রধান সমস্যা বাড়ি ভাড়া। জিনিসপত্রের সঙ্গে সঙ্গে প্রতি বছর লাফিয়ে বাড়ছে বাড়ি ভাড়া। এর মধ্যে শিশুদের প্রায়ই লেগে থাকে জ্বর, নিউমোনিয়া, টাইফয়েডসহ নানা ধরনের অসুখ। এসব খরচ মেটাতে সীমিত আয়ের মানুষ প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছে। অনেকেরই মাস শেষের আগেই হাত শূন্য হয়ে যায়। এটি ঘটছে অনেকের নিয়মিত। অনেকের বাকি পড়ছে বাড়ি ভাড়া। অনেকে অসুখ-বিসুখে সঠিক চিকিৎসা করাতে পারছেন না। জীবনযাত্রার খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় অনেকে জীবন থেকে বাদ দিয়েছেন অনেক খরচ, স্বাদ-আহ্লাদ। পরিবার-পরিজন নিয়ে কোথাও বেড়ানো, মাঝেমধ্যে বিশেষ খাবারের আয়োজনের কথা আর ভাবতে পারছেন না অনেকেই। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সংকুলান করতে না পেরে কেউ কেউ পরিবার-পরিজন পাঠিয়ে দিচ্ছেন গ্রামের বাড়ি। আবার অনেকে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ঢাকায় পরিবার নিয়ে আসতে পারছেন না। ঢাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে পরিবারসহ বসবাসের সামর্থ্য নেই অনেকের। যদিও চাকরি বা ব্যবসা উপলক্ষে বছরের পর বছর অনেকে বাস করছেন ঢাকায়। অনেকে পরিবারের চাহিদা মেটাতে দিনরাত কাজ করেও অভাব আর টানাটানি থেকে মুক্ত হতে পারছেন না। ক্রমশ বাড়ছে শহুরে জীবনের কষ্ট। এ থেকে নিস্তার পেতে প্রহর গুনছে মফস্বল থেকে আসা উন্নত জীবনের প্রত্যাশিত মানুষগুলো।

গণমাধ্যমকর্মী