রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে ব্যাংক খাতে দুরবস্থা

বিআইবিএমের পর্যবেক্ষণ

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে ব্যাংক খাতে চরম দুরবস্থা বিরাজ করছে। আর এ কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। দেশের ৭২ শতাংশ ব্যাংক কর্মকর্তা মনে করেন, বর্তমানে দেশে যে পরিমাণ ব্যাংক রয়েছে, তা কমাতে হবে। সরকার যদি মনে করে আর্থিক খাতকে রাজনীতির বাইরে রাখবে, তাহলে ৮০ শতাংশ সমস্যার সমাধান হবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) অডিটোরিয়ামে ‘এক্সপ্লোরিং মার্জার অ্যান্ড অ্যাকুইজিশন ইন দ্য কনটেক্স অব দ্য ব্যাংকিং সেক্টর অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক কর্মশালায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

বক্তারা বলেন, গত পাঁচ বছরে দেশের ব্যাংকিং খাত অনেক পেছনে চলে গেছে। এর অন্যতম কারণ হলো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। আর এ কারণেই ব্যাংকগুলো এখন মুদির দোকানে পরিণত হয়েছে। ব্যাংক কোম্পানি আইনে নতুনভাবে একই পরিবার থেকে চারজন পরিচালক থাকার নিয়ম পাস করা হলে এ অবস্থা আরও খারাপের দিকে চলে যাবে। মালিকদের অযাচিত হস্তক্ষেপ বাড়বে এবং ব্যাংকাররা পেশাগত দায়িত্ব পালনে আরও বেশি সমস্যার সম্মুখীন হবেন।

বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধূরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরী। এছাড়া প্যানেল আলোচক হিসেবে ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ, বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ইয়াছিন আলি এবং বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক ও পূবালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক হেলাল আহমেদ চৌধুরী।

কর্মশালায় ‘এক্সপ্লোরিং মার্জার অ্যান্ড অ্যাকুইজিশন ইন দ্য কনটেক্স অব দ্য ব্যাংকিং সেক্টর অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদন উপস্থাপন করে বিআইবিএমের অধ্যাপক এবং পরিচালক মো. মহিউদ্দিন সিদ্দিকের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ৭২ শতাংশ ব্যাংক কর্মকর্তা মনে করেন, বর্তমানে দেশে যে পরিমাণ ব্যাংক রয়েছে, তা কমাতে হবে। তবে ১১ শতাংশ ব্যাংকার মনে করেন, ব্যাংকের সংখ্যা ঠিক আছে। আর ১৭ শতাংশ ব্যাংকার কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এছাড়া মার্জারের ক্ষেত্রে যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো সুশাসনের অভাব, বোর্ডের গোপন সুবিধা, রাজনৈতিক দুর্বলতা, মানসিকতার পরিবর্তন, পরিচালকদের দুর্বলতা, নেতৃত্ব এবং কৌশলগত চ্যালেঞ্জ ইত্যাদি।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরী  বলেন, ‘মার্জার অর্থনীতির জন্য ভালো কিছু নয়, তবে এটাকে আমরা বাদ দিতে পারি না। মার্জারের জন্য যেকোনো সময় আমরা প্রস্তুত আছি। এ বিষয়ে আমরা একটা গাইডলাইন করেছি।’

কর্মশালায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, আমাদের দেশের এত উন্নয়ন হচ্ছে, জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, কিন্তু খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩০ শতাংশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।’

ব্যাংক কোম্পানি আইনে এক পরিবার থেকে চারজন পরিচালক থাকার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘ব্যাংক কোম্পানি আইনে বর্তমানে একই পরিবার থেকে দুজন পরিচালক থাকার আইন রয়েছে। তবে ব্যাংক কোম্পানি আইনে নতুনভাবে একই পরিবার থেকে চারজন পরিচালক রেখে আইন পাস হতে যাচ্ছে। এই আইন পাস হলে ভালো ব্যাংক কর্মকর্তারা এই ব্যাংক নামক মুদির দোকানে কাজ করতে পারবেন না।’

নতুন এই ব্যাংক কোম্পানি আইনের বিরুদ্ধে সবাইকে রুখে দাঁড়ানোর আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এই আইন পাস হতে দেওয়া যাবে না। তাই আমাদের সবাইকে এটি নিয়ে হইচই করতে হবে। এই আইন নিয়ে আমরা লেখালেখি করবো, সেমিনার করবো। সবাই আমাদের সঙ্গে যোগ দেন।’

ব্যাংকের মার্জার সম্পর্কে খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ‘বিদেশে ব্যাপকহারে মার্জার হচ্ছে। সেখানকার প্রতিষ্ঠানগুলো আরও বড় হওয়ার জন্য মার্জার করে থাকে। তবে আমাদের দেশে ছোট ব্যাংকগুলোর ধারণা বড়দের সঙ্গে মার্জার হলে বড়রা তাদের খেয়ে ফেলবে।’ মার্জারের ফলে ভালো কিছু নাও হতে পারে এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘বিডিবিএলের ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে, সেটা হলো দুটো খারাপ প্রতিষ্ঠান মিলে নতুন একটি খারাপ প্রতিষ্ঠানের জন্ম দিয়েছে।’

বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ইয়াছিন আলি বলেন, ‘ব্যাংক খাতের খেলাপির জন্য শুধু ব্যাংক কর্মকর্তারাই দায়ী নন, এর জন্য সরকারের মন্ত্রীও দায়ী। সরকার তাদের ধরছে না কেন? সরকার যদি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো চালাতে না পারে, তাহলে এগুলো প্রাইভেট সেক্টরে ছেড়ে দিচ্ছে না কেন? শুধু সোনালী ব্যাংক রেখে অন্য ব্যাংকগুলোকে প্রাইভেট খাতে ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। সরকার ইচ্ছুক থাকলেই সবকিছু সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে মার্জার একটি বার্নিং ইস্যু। শেয়ারহোল্ডার ভ্যালু পরিবর্তন হওয়ার কারণেই মার্জার হয়ে থাকে। দুর্বল ব্যাংকগুলোর শেয়ার ভ্যালু কম হওয়ার কারণে অনেক দুর্বল ব্যাংক ভালো ব্যাংকের সঙ্গে মার্জার হতে চায়।’

বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক ও পূবালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক হেলাল আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘মার্জার সব সময় খারাপ হয় না। এর ইতিবাচক দিকগুলো দেখতে হবে। আমাদের বিশ্বায়নের অংশ হতে হলে মার্জারে যেতে হবে।’

কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী ব্যাংক কর্মকর্তারা বলেন, দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলো মার্জারের মাধ্যমে বেঁচে যায় কি না সেটা দেখতে হবে। মার্জারের মাধ্যমে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমবে না, কেননা মার্জার হলেও ম্যানেজমেন্ট পরিবর্তন হয় না। এসব বিষয়গুলোর প্রতি লক্ষ্য রেখে মার্জারের গাইডলাইন করা উচিত।