রাজবাড়ীতে পদ্মায় ভয়াবহ ভাঙন

চঞ্চল সরদার, রাজবাড়ী: রাজবাড়ীতে গত দুই সপ্তাহে পদ্মার ভাঙন তীব্র হয়েছে। পাংশা, কালুখালী, গোয়ালন্দ ও সদর উপজেলার প্রায় ৮৫ কিলোমিটার অংশের বেশ কয়েকটি এলাকায় ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়েছে। ভাঙনের মুখে রয়েছে নদীতীরে অবস্থিত সরকারি-বেসরকারি নানা স্থাপনা; এমনকি শহর রক্ষা বাঁধও রয়েছে হুমকিতে। এতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন পদ্মার তীরবর্তী বাসিন্দারা। ক্ষতিগ্রস্ত অসংখ্য পরিবার আশ্রয় নিয়েছেন বাঁধে। ভাঙন ঠেকাতে জরুরি ভিত্তিতে বালিভর্তি জিও ব্যাগ ফেলছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
সদর উপজেলার মিজানপুর, পাংশার হাবাসপুর, কালুখালীর রতনদিয়া, গোয়ালন্দের ছোট ভাকলা, দেবগ্রাম ও দৌলতদিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে ভাঙন শুরু হয়েছে। এতে বসতবাড়ি, ফসলি জমি, বিভিন্ন স্থাপনা বিলীন হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙন এলাকায় বালির বস্তা ফেললেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে অভিযোগ করেন ক্ষতিগ্রস্তরা। এদিকে গত এক সপ্তাহের ভাঙনে গোয়ালন্দের ছোট ভাকলা ও দেবগ্রাম ইউনিয়নের কয়েক হাজার বিঘা ফসলি জমি ও অসংখ্য বসতবাড়ি বিলীন হলেও ভাঙন ঠেকাতে নেওয়া হয়নি কোনো ব্যবস্থা।
নদীভাঙনের শিকার হওয়া একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, বেস কিছু দিন যাবৎ নদীতে ভাঙন শুরু হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা ভাঙন ঠেকানোর নামে লোক দেখানোর জন্য জরুরি ভিত্তিতে কিছু বালির বস্তা ফেলেন। এতে হয়তো তাৎক্ষণিক ভাঙন রোধ হয় কিন্তু পরবর্তীতে আবারও শুরু হয় ভাঙন। এভাবে ভাঙন অব্যাহত থাকলে নদী তীরবর্তী মানুষগুলোকে ভিক্কার থালা নিয়ে রাস্তায় নামতে হবে। গত কয়েক বছর ধরে শুনে আসছি স্থায়ীভাবে নদী বাধা হবে কিন্তু তা কবে হবে কেউ জানে না। বসতবাড়ি, জমি সব প্রতিনিয়তই নদী নিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মাদরাসা, কবরস্থান, হাট-বাজারসহ বিভিন্ন স্থাপনা নদীতে যাওয়ার পথে। এখনি ভাঙন রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা না নিলে রাজবাড়ীর মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে কয়েকটি ইউনিয়ন।
এদিকে রাজবাড়ী শহর থেকে এক কিলোমিটার দূরে গোদার বাজার এলাকায় সিসি ব্লক দিয়ে নির্মিত স্থায়ী বাঁধেও ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত ২৭ আগস্ট থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গোদার বাজার এলাকায় বাঁধের প্রায় ৪০০ মিটার বিলীন হয়েছে। ভাঙন রোধে এখনই ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।
স্থানীয় মো. রাহাত জানান, গত চার-পাঁচ বছর অন্য ইউনিয়নে ভাঙন দেখা দিলেও শহর রক্ষা বাঁধের গোদারবাজার এলাকায় কোনো ভাঙন ছিল না। কিন্তু শুকনো মৌসুমে নদীতে ড্রেজিং করার কারণেই এ অঞ্চলে ভাঙন শুরু হয়েছে। গত দুই সপ্তাহে বাঁধের গোদার বাজার এলাকায় কয়েকবার ভয়বহ ভাঙন দেখা দেয়।
চর ধুঞ্চি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দোলেনা শুলতানা জানান, স্কুলটি নদীর অতি নিকটে তাই এ স্কুলটি মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ভাঙন শুরুর হয়েছে এমন খবর পেয়ে ছাত্রছাত্রীরা স্কুলে আসছে না। অভিভাবকরাও বাচাদের স্কুলে আসতে দিচ্ছে না।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি জিয়াউর রহমান জানান, এ স্কুলটি আগেও দুবার ভাঙনের কবলে পড়েছে। সেখান থেকে এ স্থানে হস্তান্তর করা হয়েছে। এবার ভেঙে গেলে অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়ার জায়গা নেই। আর স্কুলটি বিলীন হলে কয়েকশ’ ছাত্রছাত্রীর লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
মিজানপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আতিয়ার রহমান জানান, জেলার সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন মিজানপুর। নদীভাঙনের কারণে তা দিন দিন ছোট হয়ে যাচ্ছে। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমেই বিলিন হচ্ছে দু’একটি গ্রাম। এভাবে ভাঙতে থাকলে এক সময় রাজবাড়ীর মানচিত্র থেকে মিজানপুর ইউনিয়ন হারিয়ে যাবে।
রাজবাড়ীর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকাশ কৃঞ্চ সরকার জানান, পদ্মায় পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তীব্র স্রোতের ফলে শুরু হয়েছে ভাঙন। গত ৯ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা থেকে ধুঞ্চি সোনাকান্দর এলাকায় হাঠৎ করেইে ভাঙন দেখা দেয়। তাৎক্ষণিকভাবে জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে। তাছাড় যেখানে ভাঙবে সেখানেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তাছাড়া পাংশার হাবাসপুর, কালুখালীর রতনদিয়া, গোয়ালন্দের ছোট ভাকলা, দেবগ্রাম, দৌলতদিয়া ও সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়নে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে গোদার বাজার ও দেবগ্রাম ইউনিয়নের ভাঙন বেশি। ভাঙনকবলিত স্থানগুলো ঊর্ধŸতন কর্মকর্তাসহ পরিদর্শন করেছেন। জরুরি ভিত্তিতে কিছু স্থানে বালির বস্তা ফেলার কাজ চলছে।