রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বিদায় আবিরে মলিন রঙিন ভুবন

সুমি আর নিঝুমের প্রতিদিনের চেয়ে ভিন্ন বিদায়ের দিনটি। তাদের মলিন মুখের ভাষা বলে দিচ্ছে ক্যাম্পাসের রঙিন ভুবনে তাদের স্থায়িত্ব আর বেশিদিন নেই। দীর্ঘ পাঁচ বছরের ভালোবাসার সম্পর্ককে আনুষ্ঠানিক বিদায় দিতে তারা নানা আয়োজন করলেও সেখানে ছিল বাঁধন ছিন্ন হওয়ার শূন্যতা। ছিল আপন রক্তের না হয়েও বিচ্ছেদের জ্বালা। হবেই না বা কেন? বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৮ বিভাগের বান্ধবীদের সঙ্গে একই ছাদের নিচে থেকে জমেছে কত স্মৃতি। একরাশ হাসি, আড্ডা, তামাশা, মান-অভিমান, ছিল পাঁচ বছরের আবেগ আর ভালোবাসা। এসব যে ছেড়ে যেতে হবে! তাই তাদের মনে পড়ে যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষের কবিতার কয়েকটি লাইন:
‘ফিরিবার পথ নাহি;
দূর হতে যদি দেখ চাহি
পারিবে না চিনিতে আমায়
হে বন্ধু বিদায়।’
বিদায় উপলক্ষে তারা ক্যাম্পাসে ভ্যানগাড়িতে সাউন্ড বক্স বাজিয়ে আবির মাখামাখি করছিল হয়তো। কিন্তু মনের কোণে কি এক শূন্যতা বারবার তাদের ধাক্কা দিচ্ছিল! বিদায়ী শিক্ষার্থী ইফফাত মিতুর পা সেদিন পিচঢালা রাস্তায় বারবার আটকে যাচ্ছিল। তার মতো হয়তো আরও অনেকের। কে জানে, হয়তো তারা ভেতরে ভেতরে ডুকরে কেঁদেছে তখন। তাদের মনে হচ্ছিল, ক্যাম্পাস থেকে তাদের বিদায় যেন গাছের সবুজ পাতারাও মেনে নিতে পারছে না। বিদায় মলিনতায় পাতার রং হয়ে উঠছিল ধূসর।
বিদায়ী ছাত্রী নুসরাত জাহান এশা বলছিলেন, রাজশাহীতে যখন প্রথম আসি, তখন এর আবহাওয়া ও পরিবেশ দিয়েছিল তিক্ত ও মিশ্র এক অভিজ্ঞতা। কিন্তু এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে মনে হয় নিজ পরিবারের কেউ। এত সুন্দর জীবন ছেড়ে যেতে হবে ভাবতে পারছি না।
অনেকের মনেই উঁকি দিচ্ছে সাবাশ বাংলাদেশ মাঠ, ইবলিশ চত্বর, টুকিটাকিতে বসে আড্ডা দেওয়ার স্মৃতি। প্যারিস রোডে বান্ধবীরা মিলে হাত ধরে হাঁটা আর জমিয়ে আড্ডা দেওয়ার ছলে কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে বিভিন্ন অনুষ্ঠান দেখা। হয়তো আর হবে না পয়লা বৈশাখে লাল শাড়িতে বন্ধুদের সঙ্গে পান্তা-ইলিশ খাওয়া, হবে না তীব্র ঝালে রাজশাহীর কালাইরুটি খাওয়া, হবে না হলের খালাদের সঙ্গে তিক্ত-মধুর ঝগড়া। আহ্, কী জীবন! এরই নাম শিক্ষাজীবন। মানুষ কি আর সাধে বলে ‘ছাত্রজীবন সুখের জীবন’।
বলতে গেলে জীবনের শেষ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পরিসমাপ্তি এটি। এর পরের জীবন ভাবলেই পথ আটকে যায়। পড়াশোনা শেষে পরিবার একটি আবদার নিয়ে বসে থাকে। চাকরি করো, বিয়ে করো। শুরু হয় জীবনের দায়িত্বের গুরুভার, অন্যের আশা-আকাক্সক্ষা ও চাহিদা পূরণের এক অবিসংবাদিত পথ।
সবাই জানে এ পথে সবারই আসতে হবে। তবু তাদের মনে হয়, দূর কোনো গন্তব্যে পৌঁছাতে তারা যেন কয়েকজন যাত্রী একটি ট্রেনে চড়েছে। যাত্রাপথে গল্প, আড্ডা, হাসি-তামাশায় তাদের মধ্যে গড়ে উঠছিল মিথ্যা এক সম্পর্ক। যে সম্পর্কের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। আছে কেবল রিক্ততা, শূন্যতা! যাত্রা শেষে শেষ স্টেশনে যে যেদিকে পারবে চলে যাবে স্বপ্ন পূরণ করতে। তাদের জায়গা দখল করবে অন্য কেউ, নতুনরা। দেখা হবে না, কথা হবে না। জমবে না আড্ডা, হবে না উদাসী হয়ে গন্তব্যহীন, উদ্দেশ্যহীন ছুটে চলা। হয়তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকজনের সঙ্গে হাই-হ্যালো হবে। এই আর কি! অনুভূতিটা খর্ব হয়ে যাবে। আর যাদের সঙ্গে দেখাও হবে না, কথাও হবে নাÑতারা কেমন থাকবে? কেউ কেউ হয়তো অনেক ভালো থাকবে, কেউবা মন্দ। আবার কেউবা রাতের আকাশের তারা হয়ে মিটমিট করে জ্বলবে। নস্টালজিক এ জীবনে কেউ হয়তো কারও কথা ভাববে না; কিন্তু বয়সের ভারে সবাই যেদিন দূরে ঠেলে দেবে, সেদিন হয়তো দুরন্ত যৌবনের এসব স্মৃতিই হবে তাদের পরবর্তী প্রজšে§র রূপকথার গল্পকাহিনি। এমন ভাবনাই ভাবছিল
তাপসী রাবেয়া হলের ২০১৩-১৪ সালের বিদায়ী সব ছাত্রী।
গত ৭-১৩ অক্টোবর পর্যন্ত চলছিল তাপসী রাবেয়া হলের ২০১৩-১৪ সেশনের বিদায় সমাপনীর নানা আয়োজন। এসব আয়োজনে ছিল হলুদ সন্ধ্যা, রং খেলা, সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা ও নৈশভোজ। তাদের বিদায়কে ঘিরে তাপসী রাবেয়া হল সেজেছিল বিয়েবাড়ির আলপনায়। ‘আমরা প্রজ্বলিত শিখা, তারুণ্যের অগ্রদূত’ এ সেøাগান সামনে রেখে চলে তাদের বিদায় সমাপনী। সাংস্কৃতিক সন্ধ্যাকে আরও রঙিন করে তোলেন অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে আসা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. এম আবদুস সোবহান। ছিলেন জনসংযোগ দফতরের প্রশাসক প্রফেসর ড. প্রভাষ কুমার কর্মকারসহ প্রশাসনিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
তাদের বিদায়ের আনুষ্ঠানিক ঘোষণাটা দেন উপাচার্য। সেদিন বিদায়ীদের সজল নয়নে ভাসছিল রঙিন ভুবন পেছনে ফেলার ব্যাকুলতা। আলোর ভুবন থেকে এক চিলতে আলো নিয়ে অন্ধকারে আলো জ্বালাবার অনিশ্চিত মশাল হাতে ছড়িয়ে পড়া। কে জানে কতটুকু আলো তারা দিতে পারবে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে। কঠিন, তবুও তারা জানে অতীতকে পেছনে ফেলেই চলতে হবে সামনে। বন্ধুত্বের বন্ধনকে ছিন্ন করে ছড়িয়ে পড়তে হবে জীবনযুদ্ধে। শুধু বিদায়বেলায় মনে পড়বে কাজী নজরুল ইসলামের গানের কলি:
‘আমার যাবার সময় হলো দাও বিদায়
মোছ আঁখি দুয়ার খোল দাও বিদায়…’