প্রচ্ছদ শেষ পাতা

রাজস্ব পরিশোধে বিপিসির ‘অজুহাত’

রহমত রহমান: ভ্যাট কর্তৃপক্ষ ‘যথাসময়ে’ ভ্যাট ও এটিভি দাবি করেনি এমন অজুহাতে বকেয়া প্রায় দুই হাজার ৩৮৮ কোটি টাকার ভ্যাট-এটিভি পরিশোধ করছে না বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। আবার ফার্নেল অয়েল আমদানির বিপরীতে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজে প্রায় তিন হাজার ৬০০ কোটি টাকার ভ্যাট-এটিভি অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে এমন অজুহাতও দিয়ে সময়ক্ষেপণ করছে রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি। এছাড়া ফার্নেস অয়েল আমদানিতে শুল্ককর অব্যাহতি দেওয়া এনবিআরের আদেশ সংশোধন না করায় বিষয়টি অনিষ্পন্ন রয়ে গেছে।
সম্প্রতি বিপিসির ঢাকা লিয়াজোঁ অফিস ও এনবিআরে পৃথক সভায় বিপিসির পক্ষ থেকে এমন ‘অজুহাত’ তুলে ধরা হয়। তবে এনবিআরের আদেশ সংশোধনযোগ্য কি না, তা যাচাই, চট্টগ্রাম ভ্যাট কমিশনারেটকে দ্রুত এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া এবং চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ অতিরিক্ত ভ্যাট-এটিভি নিয়ে থাকলে সে বিষয়ে এনবিআরকে লিখিতভাবে জানাতে বলা হয়েছে। এনবিআর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এনবিআর সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া সভাপতিত্ব করেন। সভায় এনবিআর সদস্য সৈয়দ গোলাম কিবরীয়া বলেন, বিপিসির কাছে বকেয়া ভ্যাট-এটিভি দুই হাজার ৩৮৮ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। এ ভ্যাট পরিশোধে বিপিসিকে অনুরোধ করেন তিনি।
সভায় বিপিসির পরিচালক (অর্থ) মো. আলতাফ হোসেন চৌধুরী জানান, বিপিসি ফার্নেস অয়েল আমদানির বিপরীতে ভুলবশত চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজে প্রায় তিন হাজার ৬০০ কোটি টাকার ভ্যাট ও এটিভি অতিরিক্ত প্রদান করেছে; যা ফেরতযোগ্য। এ টাকা চট্টগ্রাম ভ্যাট কাস্টমস হাউজের সঙ্গে সমন্বয় করে নিতে পারে।
এ বিষয়ে এনবিআর সদস্য (মূসক বাস্তবায়ন ও আইটি) শাহনাজ পারভীন বলেন, কাস্টমস হাউজের ফেরতের পাওনার সঙ্গে ভ্যাট কমিশনারেটের বকেয়া পাওনা সমন্বয়ের সুযোগ নেই। কারণ দুটি প্রতিষ্ঠানের হিসাবের কোড ভিন্ন। তাছাড়া কর ফেরতের বিষয়টি কাস্টমস হাউজে আবেদন করলে তা যাচাই-বাছাই করে বিবেচনা করবে। যদি পাওনা হয় তাহলে আলাদা বাজেটের মাধ্যমে তা ফেরত প্রদান করা হয়। বকেয়া ভ্যাট-এটিভি পরিশোধ না করলে তা আদায়ের জন্য আইনানুগ কার্যক্রম চলমান থাকবে। সভায় এনবিআর চেয়ারম্যান চট্টগ্রাম ভ্যাট কমিশনারেটকে পাওনা পরিশোধে ব্যবস্থা গ্রহণ, বিপিসি কর্তৃক ভুলবশত কাস্টমস হাউজে অতিরিক্ত ভ্যাট ও এটিভি প্রদান করে থাকলে সে বিষয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে এনবিআরে আবেদন করার নির্দেশ দেন।
গত ১০ এপ্রিল বিপিসির লিয়াজোঁ অফিসে অনুষ্ঠিত সভায় সংস্থাটির চেয়ারম্যান মো. সামছুর রহমান সভাপতিত্ব করেন। সভায় বলা হয়, গেজেট অনুযায়ী (বিক্রয় পর্যায়ে) লিটারপ্রতি মোট ভ্যাট ও এটিভি থেকে আমদানি পর্যায়ের মোট ভ্যাট ও এটিভি বাদ দিয়ে অবশিষ্ট অর্থ চট্টগ্রাম ভ্যাট কমিশনারেটকে পরিশোধ করে বিপিসি। ১৯৯১ সালে ভ্যাট আইন কার্যকর হলেও ২০১৫ সালে ভ্যাট কর্তৃপক্ষ ২০১৩-১৪ ও ২০১৪-১৫ অর্থবছরের জন্য দুই হাজার ৬০৪ কোটি ৩৩ লাখ টাকার ভ্যাট-এটিভি (এর মধ্যে পদ্মা অয়েল কোম্পানি ৮০৪ কোটি ৭৬ লাখ ৩৩ হাজার, যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড ৮০৪ কোটি ৩২ লাখ ১০ হাজার ১৫৫ টাকা, মেঘনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড ৯৭৯ কোটি ৬৩ লাখ চার হাজার ৯৩০ টাকা ও স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি লিমিটেড ১৫ কোটি ৬১ লাখ ৮৫ হাজার ৬৭৩ টাকা) দাবি করা হয়। চট্টগ্রাম ভ্যাট কর্তৃপক্ষ যথাসময়ে দাবি উপস্থাপন না করায় ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সরকার হতে ভর্তুকি আদায় করার ক্ষেত্রে তা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
আরও বলা হয়, এনবিআরের ২০১১ সালের ২৫ জানুয়ারির প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ফার্নেস অয়েল আমদানিতে শুল্ক ও ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়। ফার্নেল অয়েল আমদানির বিপরীতে ২০১১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৭ সালের মে পর্যন্ত তিন হাজার ৬১৪ কোটি ২৫ লাখ টাকার রাজস্ব পরিশোধ করেছে; যা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ফেরতযোগ্য। এ রাজস্বের মধ্যে শুল্ক ও অগ্রিম আয়কর (এআইটি) বাদ দিলে ভ্যাট ও এটিভি দাঁড়ায় দুই হাজার ৩৮৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা। বিপিসি ভ্যাট কর্তৃপক্ষের কাছে দুই হাজার ৩৮৮ কোটি ৫০ লাখ পাওনা বলে দাবি করছে। আর ভ্যাট কর্তৃপক্ষের দাবি করা দুই হাজার ৬০৪ কোটি ৩৩ লাখ টাকা থেকে বিপিসির পাওনা দুই হাজার ৩৮৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা বাদ দিলে বাকি থাকে ২১৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। এ ২১৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা ভ্যাট কর্তৃপক্ষ পাবে বলে বিপিসি দাবি করে (যদিও ২০১৮ সালের ২৭ জুন বিপিসি ২১৫ কোটি ৮৩ লাখ ৭০ হাজার ২০ টাকা ভ্যাট-এটিভি হিসেবে পরিশোধ করেছে)। তবে ২০১১ সালের ২৫ জানুয়ারি আদেশ সংশোধন না করায় বিপিসির পাওনা অনিষ্পন্ন রয়ে গেছে।
সভায় এনবিআর সদস্য শাহনাজ পারভীন বলেন, কাস্টমসের সঙ্গে ভ্যাট ও এটিভি সমন্বয়ের সুযোগ নেই। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ কমিশনার কাজী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ফার্নেল অয়েল আমদানির বিপরীতে বিপিসি শুল্ককর অব্যাহতি পাবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। এনবিআর সদস্য সৈয়দ গোলাম কিবরীয়া বলেন, বিপিসির তহবিল থেকে বকেয়া ভ্যাট-এটিভি পরিশোধ করতে হবে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। বিপিসি প্রয়োজনে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ছাড়করণের মাধ্যমে বকেয়া সমন্বয় করলে এনবিআরের কোনো আপত্তি থাকবে না। বিষয়টি নিষ্পত্তিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা চাওয়া হবে বলে সভায় সিদ্ধান্ত হয়।

সর্বশেষ..