রাজস্ব বাড়াতে করব্যবস্থা দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে

সিপিডির আলোচনায় বক্তারা

নিজস্ব প্রতিবেদক: ২০৩০ সাল নাগাদ জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ও ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত দেশের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হবে। কিন্তু দেশের মানুষের মধ্যে এখনও কর অফিস সম্পর্কে ভীতি রয়েছে। এ ভীতির কারণ হয়রানি ও দুর্নীতি। এ জন্য অনেকে কর অফিস এড়িয়ে চলতে চান। তাছাড়া অনেকের মধ্যে কর ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতাও রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কর দেওয়ার উপযুক্ত সবার কাছ থেকে প্রাপ্য রাজস্ব সংগ্রহে আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ বাড়াতে হবে।
রাজধানীর গুলশানে একটি হোটেলে গতকাল বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘ক্যাটালাইজিং ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স ফর বাংলাদেশ: মবিলাইজেশন অ্যান্ড ইউটিলাইজেশন চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সেমিনারে এসব তথ্য উপস্থাপন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া। সম্মানীয় অতিথি ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। বক্তব্য রাখেন আইএমএফের বাংলাদেশ কার্যালয়ের আবাসিক প্রতিনিধি রেগন্যার গুডমুন্ডসন ও এমসিসিআইয়ের সভাপতি নিহাদ কবির। সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে দুটি কী-নোট পেপার উপস্থাপন করা হয়। ‘ব্যক্তি খাতে আয়কর আহরণে বাংলাদেশের সম্ভাবনা: জরিপ তথ্যের নিরীক্ষণ’ শীর্ষক নিবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান। ‘ক্যান বাংলাদেশ ডু উইদাউট ফরেন এইড?’ শীর্ষক নিবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।
সেমিনারে জানানো হয়, দেশে কর দিচ্ছে এমন ৬৫ শতাংশ মানুষ মনে করেন করব্যবস্থায় দুর্নীতি বিদ্যমান। ধনীদের ৬৯ শতাংশই মনে করেন দুর্নীতি রয়েছে। সামর্থ্যবানদের মাত্র ৩২ শতাংশ ২০১৭ সালে আয়কর দিয়েছেন। আর উচ্চ আয়ের ২৫ শতাংশের এক তৃতীয়াংশ আয়কর দেয়নি। ৭৫ শতাংশ ব্যক্তির ধারণা করব্যবস্থা ধনীদের পক্ষপাতদুষ্ট। আর ৫০ শতাংশ করব্যবস্থাকে জটিল বলে মনে করেন। আর গত কয়েক বছর কর দিয়েছেন এমন ৫৪ শতাংশ মানুষ মনে করে কর প্রদান ব্যবস্থা জটিল।
‘ক্যান বাংলাদেশ ডু উইদাউট ফরেন এইড’ শীর্ষক নিবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, গত কয়েক বছরে বৈদেশিক সাহয্যের পরিমাণ আকারে বাড়লেও তা জিডিপির অনুপাতে কমেছে। তবে সামষ্টিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে বৈদেশিক সহায়তার খুব বেশি প্রভাব নেই। ব্যাষ্টিক পর্যায়ে শুধু স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে প্রভাব রয়েছে। তবে বৈদেশিক সহায়তার আরও দক্ষ ব্যবহার এবং দাতাদের মধ্যে সমন্বয় দরকার। ভালো নীতি সহায়তা এবং সুশাসন ছাড়া সহায়তার পরিপূর্ণ ব্যবহার সম্ভব নয়।
অনুষ্ঠানে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে সিপিডির পক্ষ থেকে কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে কর অফিসের ভৌগলিক বিস্তৃতি ও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, কর অফিসকে দুর্নীতিমুক্ত করা ও কর ফাঁকি দেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া, নিম্ন আয়ের ব্যক্তিদের জন্য সহজভাবে রিটার্ন দাখিলের ব্যবস্থা করা, স্কুল পর্যায় থেকেই করব্যবস্থায় অংশ নেওয়ার গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার এবং সরকারি সেবার মান বাড়ানো।
এসব বিষয়ে মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, করদাতারা এখনও কর পরিশোদের বিষয়ে ভয় পান। এ ভীতি দূর করতে কর কর্মকর্তাদের জনকল্যাণমুখী হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেটি বাস্তবায়নও করা হচ্ছে। বর্তমানে ৩৫ লাখ কর শনাক্তকরণ নম্বরধারী (টিআইএন) রয়েছেন। কিন্তু কর দিচ্ছেন ২০ লাখেরও কম। করজাল বাড়াতে উপজেলা পর্যায়ে কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। জনবলসহ নানা ক্ষেত্রে আমাদের কিছু দুর্বলতা রয়েছে। সে দুর্বলতা কাটাতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, এখনই আমরা ঘুষখোর কর্মকর্তাদের চাকরি থেকে বাদ দিতে পারছি না। তবে তাদের বাদ দেব, সময় দিতে হবে। অগ্রিম আয়করের মাধ্যমে করজাল বাড়ানো হচ্ছে। আমদানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী কিংবা যাদের সঞ্চয়পত্র আছে তারা আয়কর রিটার্ন দাখিল করছেন না। কিন্তু অগ্রিম করের মাধ্যমে যুক্ত হচ্ছে। আবার বাড়ির মালিকরা রিটার্ন দাখিল করছেন কি না সে বিষয়ে আগামী ছয় মাসের মধ্যে তথ্যভাণ্ডার করা হবে। আমাদের কাস্টম ও আয়কর বিভাগে জনবল বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। জনবল বাড়লে কার্যক্রমে আরও গতি আসবে। সামনের দিনে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশ থেকে ১৩ শতাংশে উন্নীত হবে।
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এসডিজি বাস্তবায়ন এবং ২০৪১ সালে উন্নত দেশে রূপান্তর প্রক্রিয়াতে বৈদেশিক সাহায্য দরকার রয়েছে। এটি সতর্কতার সঙ্গে দক্ষভাবে ব্যবহার করা প্রয়োজন। সমাজে এখনও নানা ধরনের বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। আয়-বৈষম্যের তুলনায় সম্পদ-বৈষম্য এখন বেশিহারে বাড়ছে। তাই আয়করের পাশাপাশি সম্পদ করের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। দেশের কর-ব্যবস্থাপনা ধনীদের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট কি নাÑতা খতিয়ে দেখতে হবে। আর কর-ব্যবস্থাপনায় সুশাসন আনার ক্ষেত্রে সামগ্রিকভাবে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ করতে হবে। দেশের অভ্যন্তরে সুশাসনের ঘাটতি রেখে কর-ব্যবস্থাপনায় সুশাসন আনা সম্ভব নয়।
ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, জিডিপি অনুপাতে দেশে রাজস্ব সংগ্রহ ও কর আহরণ কোনো ক্ষেত্রেই তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। উন্নয়নশীল দেশগুলোর তুলনায় রাজস্ব আহরণে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। নেপালের মানুষের জনপ্রতি আয় আমাদের চেয়ে অর্ধেক হলেও তারা রাজস্ব প্রদানে আমাদের চেয়ে দ্বিগুণ এগিয়ে।
তিনি বলেন, দেশে এখন শ্রম ও মূলধনবিহীন প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির। আর বাংলাদেশ এমন কোনো পর্যায়ে পৌঁছে যাইনি যে, এখনই বলতে হবে বৈদেশিক সাহায্য প্রয়োজন নেই। কেননা এখনও আমাদের দেশে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত অনেক কম। তবে বৈদেশিক সাহায্য-নির্ভর প্রকল্প আমাদের দেশের অর্থনীতিতে কতটুকু প্রভাব রাখছে সেটি গবেষণার দাবি রাখে। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন খাতে ঢালাওভাবে কর অবকাশ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এর প্রভাবও খতিয়ে দেখতে হবে। এটিতে পরিবর্তন আনা দরকার।